শনিবার, ডিসেম্বর ৫, ২০ ২০
লেখালেখি ডেস্ক
২৫ অক্টোবর ২০ ২০
৬:৪১ পূর্বাহ্ণ
শারদীয় দুর্গা পূজার ইতিহাস ও মাহাত্ম্য

এস ডি সুব্রত:: অন্য বছরের তুলনায় এবার শারদীয় দুর্গোৎসবের জাঁক ঝমক বেশ কমই হবে। করোনার থাবায় বিশ্ব থমকে গেছে, মানুষের জীবনের লক্ষ্য অনেক টা পাল্টে গেছে। জনজীবনে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। এ প্রভাব পূজা মন্ডপেও পড়বে। এবার পূজার আনুষ্ঠানিকতা ভোগবিতরণ ও লোক সমাগম  সীমিত করা হয়েছে। এ বছর সঙ্গত কারণেই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই এবং সামাজিক সুরক্ষা বজায় রেখে পূজা উদযাপন করা হবে। করোনা আবহে পূজার নতুন নিয়ম বিধি মেনেই এবার পালিত হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। করোনা কালীন সময়ে সামাজিক দূরত্ব ছাড়াও পূজা মন্ডপে স্যানিটাইজার প্যানেলের ব্যবস্থা থাকবে ।

দেবী দুর্গা হলেন দূর্গতিনাশিনী অর্থাৎ সকল দূঃখ দূর্দশার বিনাশকারী। পুরাকালে দেবতারা মহিষাশুর এর অত্যাচারে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। তখন ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর এর শরীর থেকে আগুনের মতো তেজোরশ্মি একত্রিত হয়ে বিশাল আলোকপুঞ্জে পরিনত হয়। ঐ আলোকপুঞ্জ থেকেই আবির্ভূত হলেন দেবী দুর্গা। দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত দেবী দুর্গা অসুরকুলকে বধ করে স্বর্গ তথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি স্থাপন করেন। দেবী দুর্গা মহামায়া,মহাকালী , মহালক্ষ্মী, মহা সরস্বতী,শ্রীচন্ডী প্রভৃতি নামেও পরিচিত। সর্ব শক্তি র আধার আদ্যশক্তি হলেন মা দুর্গা। মা দুর্গা নামের মধ্যেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি দূর্গমাসুর  নামক এক দৈত্য কে বধ করে দুর্গা নামে খ্যাত হন। মা দুর্গা শত্রুর কাছে,পাপীর কাছে যেমন ভয়ংকর তেমনি সন্তানের কাছে তিনি স্নেহময়ী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ভাষায়...........
"ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে
বা হাত করে শঙ্কা হরন
দুই নয়নে স্নেহের হাসি
ললাটনেত্র আগুনবরণ।"

দুর্গা পূজা কেবলমাত্র পুষ্প বিল্বপত্রের এবং ঢাক ঢোলের পূজা নয়। এ পূজা মানবতার এক বিরাট মিলন উৎসব।মাতৃ আরাধনায় যারা রত থাকেন তাদের উদ্দেশ্যে শ্রী শ্রী ঠাকুর বলেন......
" মা সবার মা , কাউকে ছেড়ে দিয়ে নয়। কাউকে বাদ দিয়ে নয়, কাউকে পরিত্যাগ করে নয়"। তিনি জীবজগতের একত্ব বিধানের এক রুপ। যুগে যুগে দেবী দুর্গা অসুরদের বিনাশ করেন।

দুর্গা   পূজা কবে কখন শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় নি। দুর্গা পূজার শুরু নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে।ভারতে দ্রাবিড় সভ্যতার দ্রাবিড়  জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। আর্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবতাদের। অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের।দেবীরা পূজিত হতেন আদ্যাশক্তির প্রতীক রুপে। প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বে ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী থেকে দেবী পূজার প্রচলন।হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় তা আরো গ্রহনযোগ্য ও বিস্তৃত হয়ে উঠে। মাতৃপ্রধান পরিবার মায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়,এই মতানুসারে দেবী হলেন শক্তির রুপ।শাক্ত মতে কালী বিশ্বসৃষ্টির আদিকারন। মহাভারত অনুসারে দুর্গা বিবেচিত হন কালী শক্তির আরেক রুপে।বৃহদ্ধর্ম পূরাণ ও কালিকা পূরাণ মতে রাম রাবনের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গা কে পূজা করা হয়েছিল।সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময় পূজার যথাযথ সময় নয়।এই দুই পূরাণ অনুসারে রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন।মারকেন্দিয়   পূরাণ মতে চেদী রাজবংশের রাজা সুবায়া খ্রীষ্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে উড়িষ্যায় দুশেরা নামে দুর্গা পূজা প্রচলন করেছিলেন। 

মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গা পূজার  অস্তিত্ব পাওয়া যায়।মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গা ভক্তি তরঙ্গিনীতে দুর্গা বন্দনা পাওয়া যায়।১৫১০ সালে কুচবংশের রাজা বিশ্বসিংহ কুচবিহারে দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন।১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন বলে ধারনা করা হয়।ওড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমলে থেকে  দুর্গা পূজা হয়ে  আসছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই পূজা ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারী বা কমিউনিটি পূজা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় এটাকে শরৎকালের বার্ষিক মহাউৎসব  হিসাবে ধরা হয় বলে ইহাকে শারদীয় উৎসবও  বলা হয় ।

বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা ব্যাপক আয়োজনে র মধ্য দিয়ে পালিত হয়। বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ১৮ শতকে মঠবাড়িয়া নবরত্ন মন্দির এ ১৭৬৭ সালে প্রথম দুর্গা পূজা হয় বলে লোকমুখে শোনা যায়। ইতিহাসবিদ দানীর মতে  পাঁচশ বছর আগে রমনার কালী মন্দির নির্মিত হয়েছিল এবং সেখানে কালী পূজার সাথে দুর্গা পূজাও হতো।কারো মতে রাজশাহীতে তাহেরপুরে রাজা কংস নারায়ন  প্রথম দুর্গা পূজা করেন ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌এদেশে।

ব্রহ্ম বৈবর্ত পূরাণ মতে দুর্গা পূজার প্রথম প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ। দ্বিতীয় বার দুর্গা পূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা।তয় বার দুর্গা পূজা আয়োজন করেন মহাদেব।বিংশ শতকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে দুর্গা পূজা সমাজের বিত্তবান এবং অভিজাত হিন্দু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান শতাব্দীর শুরুর দিকে দুর্গা পূজা তার সার্বজনীনতা পায়।১৯৪৭ এর দেশবিভাগের পর এককভাবে দুর্গা পূজা ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠে। বাংলাদেশে বিত্তশালী হিন্দু দের প্রভাব প্রতিপত্তি কমতে থাকে। ফলে একক দুর্গা পূজা থেকে প্রথমে বারোয়ারী বা কমিউনিটি দুর্গা পূজা এবং পরে সার্বজনীন দূর্গা পূজার প্রচলন শুরু হয়। সার্বজনীন দূর্গা পূজার প্রচলন হওয়ার পর থেকে এই পূজা জনপ্রিয়তা   লাভ করে। 

বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের দুর্গা পূজায় সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। সমাজের সব মানুষের অংশগ্রহণে যে পূজা করা হয় তাই সার্বজনীন পূজা। দুর্গা পূজা এখন মুলত সার্বজনীন পূজা। এখন এ পূজা আর বিত্তশালী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রদায়ের  সীমানা ছাড়িয়ে পূজা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দূর্গা পূজা ঘিরে গড়ে উঠে মৈত্রীর  বন্ধন। ঈশ্বরের মাতৃরূপের নাম  দুর্গা। মহিষাসুর কে বধ করে দেবী দুর্গা সমাজে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন। মহাদেবের  বাসগৃহ কৈলাস হতে দে বী দুর্গা  প্রতি বছর পিত্রালয়ে বেড়াতে আসেন। আশ্বিন  মাসের পঞ্চমী  তিথি তে। দুর্গা পূজা হলো অন্যায় কে প্রতিহত করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন।বিজয়া দশমী ঐক্যের প্রতীক।  

প্রতিমা বিসর্জনের পর অনেকে পূর্ব শত্রুতা ভুলে পরস্পর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়। আমাদের সমাজে যেভাবে অন্যায় অবিচার অনাচার অনৈতিকতা দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এ দুর্গতি থেকে পরিত্রাণের জন্য মা দুর্গার আশীর্বাদ আজ বড় প্রয়োজন।মা দুর্গা যেন আমাদের সমাজে বিরাজমান অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি ও মহামারী করোনা থেকে মুক্ত করে সুস্থ , সুন্দর  ধরনী উপহার দেন ক্রান্তিকালে এই প্রার্থনা। একদিকে করোনার থাবায় বিপর্যস্ত বিশ্ব অন্যদিকে মহা মন্দা। তাই এবারের পূজায় নান্দনিকতার চেয়ে বেশী জোর দেয়া হবে সামাজিক দূরত্ব বিধিতে। করোনা মুক্ত সুন্দর ও সুস্থ ধরনীর প্রার্থনা থাকবে মন্ডপে মন্ডপে।
 

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য