বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০ ২০
লেখালেখি ডেস্ক
২৬ জুন ২০ ২০
৩:০ ৪ অপরাহ্ণ
সনাতন ধর্ম; গুরু শিষ্য -- এস ডি সুব্রত

ধর্ম বলতে সাধারণ ভাবে কোন প্রাণী বা বস্তুর বৈশিষ্ট্য কে বুঝায়। মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু বা  প্রাণীর স্ব স্ব ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু সমাজে বেড়ে উঠা হোমো স্যাপিয়েন্স এর ভাবের আদান-প্রদান করার জন্য ভাষা জ্ঞান, সামাজিকতা,পঞ্চ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা,, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধির ক্ষমতা, বোধশক্তি, ইচ্ছা শক্তি,আবেগে, মমতা, বিবেক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা হয়।

 

       অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী ...." অতি মানবিক নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি বিশেষত ব্যাক্তিগত ঈশ্বর বা ঈশ্বরসমুহে বিশ্বাস ও উপাসনা করাকে ধর্ম বলে।"

 

        সনাতন ধর্মের কোন একক প্রতিষ্ঠাতা নেই। অনাদি কাল থেকে পরম্পরা চলে আসছে।সনাতন ধর্ম হচ্ছে বিভিন্ন ভারতীয় সংস্কৃতির আর ঐতিহ্যের সংমিশ্রন  যা হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিত।

         "ধর্মং ততু সাক্ষাৎ ভগবান প্রণীতম"

       ....... অর্থাৎ ধর্ম হল স্বয়ং ভগবানের প্রণীত আইন। সেই আইন মান্য করা মানুষের কর্তব্য।ধর্ম বলতে কোন বিশ্বাস কে বুঝায়। 

 

            সনাতন শব্দের অর্থ চিরন্তন।যার আদি নেই,অন্ত নেই। সনাতন ধর্মের সূত্রপাতের কোন ইতিহাস নেই।কারন সনাতন ধর্ম সনাতন জীবের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।কোন জীবই অপর কোন জীবের সেবা না করে থাকতে পারে না। প্রত্যেককে ই কোন না কোনভাবে  অন্য কে সেবা দিচ্ছে বা সেবা নিচ্ছে বা গ্রহন করছে। এই সেবাকর্মই হচ্ছে জীবের সনাতন ধর্ম। সেবা করাই হচ্ছে সনাতন  ধর্ম।  ভগবানের সাথে আমাদের সম্পর্ক হচ্ছে সেবার সম্পর্ক।পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন পরম ভোক্তা আর আমরা জীবেরা হচ্ছি সেবক। ভগবানের মঙ্গলবিধানেই আমাদের সৃষ্টি এবং ভগবান কে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে আমরা সুখী হতে পারি সত্যিকার ভাবে। অন্য কোন পথে আমাদের সুখী হওয়া সম্ভব নয়। ভগবান স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভগবান সাকার এবং নিরাকার উভয়ই।

             গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন...............

     " আমিই নির্বিশেষে ব্রহ্মের, প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়,অব্যয় অমৃতের ,শ্বাশত ধর্মের এবং ঐকান্তিক সুখের আমি আশ্রয়।"

           আত্মা ভগবানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ,এই আমরা ভগবানের কাছেই ছিলাম এবং সেখান থেকেই এসেছি, আবার সেখানেই ফিরে যাব।

        গুরুদেব বা গুরু হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধি। তিনি সর্বদাই ভগবানের কথা বলেন। ভগবানের কথা ছাড়া তিনি কিছু ভাবেন না এবং বলেন না।জড়জগতের প্রতি, জাগতিক বিষয়ের প্রতি গুরুদেবের কোন আকর্ষণ থাকে না।গুরুদেবের আকর্ষণ শুধু

ভগবানের প্রতি। গুরু ভগবানের প্রতিনিধিত্ব করেন।এম্বাসডর বা হাই কমিশনার বা রাষ্টদুত যেমন রাষ্টৈর রাজার প্রতিনিধিত্ব করেন তেমনি গুরুদেব ভগবানের প্রতিনিধিত্ব করেন। গুরুদেব সকলকে স্বয়ং ভগবানের ভক্ত হয়ে অনুপ্রাণিত করেন।।এটিই গুরুর কাজ। 

গুরু বলেন আমি ভগবানের কৃতদাস । আমি আমার শিষ্যকে ভগবানের প্রকৃত সেবকে পরিনত করার চেষ্টা করি। গুরু ভগবান নয়, ভগবান হতে পারেন না। গুরুদেব হচ্ছেন ভগবানের সেবক। তিনি ভগবানের বাণী প্রচার করেন। ভগবান তর বাণী প্রচারের জন্য শক্তি প্রদান করেন গুরুদেব কে।তাই ভগবান কে সম্মান করার পাশাপাশি গুরুদেব কে সম্মান করতে হয়।কারন তিনি সম্মান বা সেবা লাভের যোগ্য।

.......  "গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু , গুরু মহেশ্বর"

       এ কথার অর্থ হচ্ছে গূরুদেব ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বরের মতো সম্মানীয়  ,পূজনীয়। কিন্তু গুরুদেব ব্রহ্মা বিষ্ণু বা মহেশ্বর নন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে যিনি তার কাজকর্ম ও আচরন পরিচালনা করেন এবং ভগবানের শিক্ষা মানুষের কাছে তুলে দেন তিনিই গুরু। গুরুদেব হচ্ছেন ভগবানের প্রিয়জন , কিন্তু তিনি ভগবান নন।

        " গুরু ছেড়ে গোবিন্দ ভজে,সে পাপী নরকে মজে

           গুরু কৃষ্ণ অভেদ হয় শাস্ত্রের  প্রমাণে "

      শাস্ত্রে বলা হয়েছে গুরদেবের পাদপাদ্মে আশ্রয় নিয়ে গোবিন্দ ভজন কর। গুরুদেব কৃষ্ণের ভক্ত। যে কৃষ্ণের ভক্ত নয়,সে গুরুই নয়।

         আমাদের জীবনের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি নিজেদের বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন জনের শরনাপন্ন হতে হয় আমাদের। প্রয়োজনে ক্ষেত্র অনুযায়ী যেখানে গেলে ফল পাওয়া যায় মানুষ সেখানেই যায়।।যেমন কেউ যদি ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় তাহলে তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে।কেউ যদি ডাক্তার হতে চায় তাকে যেতে হবে মেডিকেল কলেজে।কেউ যদি গান শিখতে চায় তাকে যেতে হবে গানের শিক্ষকের কাছে। ঠিক তেমনি ভগবান কে জানতে হলে ,ভগবদ ধামে ফিরে যেতে হলে আমাদের একজন সদ গুরুর নিকট যেতে হয়।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  গীতায় বলেছেন.........

      "সদ্গুরুর শরনাপন্ন হয়ে তত্ত্ব জ্ঞান লাভ করার চেষ্টা কর, বিনম্র চিত্তে জিজ্ঞাসা কর এবং অকৃত্রিম সেবার দ্বারা তাকে সন্তুষ্ট কর। তাহলে সে তত্ত্ব দ্রষ্টা পুরুষ তোমাকে জ্ঞান উপদেশ দান করবেন।"

 

    শিষ্যের উচিত গুরুদেবের কথা শোনা।কারন গুরুদেব মনগড়া কথা বলেন না। ভগবানের কথাই তিনি শিষ্যদের মাঝে প্রচার ও প্রকাশ করেন।কেউ কেউ গুরুকে ভগবানের সমতুল্য বানানোর চেষ্টা করেন যা মোটেই ঠিক নয়। প্রকৃত গুরু চান তার শিষ্য ভগবান কে স্মরন করুক এবং নাম প্রচার করুক। গুরুদেব কখনো নিজেকে ভগবান ভাবেন না, ভাবতে পারেন না।শিষ্য গুরুদেবের মাধ্যমে ভগবানের নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন।

 

লেখক: কবি ও কলামিস্ট।

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য