বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০ , ২০ ২০
লেখালেখি ডেস্ক
৮ সেপ্টেম্বর ২০ ২০
১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ
বন্দী জীবন---এস ডি সুব্রত

এমনি তে অফিস ছুটি হলে সবাই যেমন খুশী হয়, গ্রামের বাড়ি,বৃদ্ধ বাবা মা আত্মীয় স্বজন কে  দেখার একটা বড় সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণে তেমনি স্বপ্নদীপের মনেও আনন্দের জোয়ার বয়ে যেতো। কিন্তু এবারের ছুটি স্বপ্নদীপের মনে সে আনন্দ দিতে পারে নি। স্বপ্নদীপের  মনে অন্যরকম কোন অনুভূতি জন্ম দিতে পারে নি,অন্য সময় হলে যেমন টা হতো।যেন এক অজানা বিষাদের রাজ্যে হারিয়ে যায় স্বপ্নদীপের স্বপ্ন আর সহজ আবেগ।

           পূজো বা ঈদ ছাড়া সাধারণত এত লম্বা ছুটি হয় না। প্রতিটা ছুটির পেছনে কোন না কোন আনন্দ বা ত্যাগের বারতা থাকে। কিন্তু এবারের ছুটি তে তেমন কোন কিছু নেই। একেবারেই উল্টো। কোথাও যাওয়া যাবে না, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না।শহর ছেড়ে অন্য শহরে বা গ্রামে যাওয়া যাবে না। গণপরিবহন বন্ধ। পাঠাগার বন্ধ। পত্রিকাও পাওয়া যাবে না। কোথাও গিয়ে সময় কাটানো যাবে না।

 

                 বাড়িতে যেতে পারবেনা, পাঠাগারে যেতে পারবেনা, পত্রিকা অফিসে যেতে পারবেনা,আলী সিদ্দিক এর কাছে যেতে পারবে না সেসব কারনে যেমন স্বপ্নদীপের মন খারাপ ঠিক তেমনি আরেকটি বিশেষ কারণে স্বপ্নদীপের মন খারাপ।

                স্বপ্নদীপ এমনি তে চাপা স্বভাবের।কারো সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে পছন্দ করে না।বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এটা হয়ে  থাকে। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে করো সাথে কথা বলে না। এমনকি  অফিসেও প্রয়োজন না হলে কারো সাথে তেমন কোন কথা বলে না। কিন্তু একটা জায়গায় এসে স্বপ্নদীপের  নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যেন স্বকীয়তা হারিয়েছে নিদারুণ ভাবে। ইদানিং স্বপ্নদীপ একজন ভালো বন্ধু পেয়েছে যাকে ইচ্ছে করেও ভুলে যেতে পারে না। যার ছোঁয়ায় স্বপ্নদীপ অনেক কষ্ট ভুলে যায়।যার কথা শুনে অন্যরকম অনুভূতি জাগে মনের গহীন কোণে।

 

     স্বপ্নদীপ শুনে আসছে প্রত্যেক শতাব্দীতে নাকি একটা মহামারী দেখা যায় আমাদের এই আদর্শে গ্রহে । বাস্তবতার সাথে এর মিল পাওয়া যাচ্ছে অনেকটাই। নোভেল করোনা ভাইরাস কি তাহলে এরই ধারাবাহিকতা,এরই পূর্বাভাস। চীনের উহান প্রদেশে উৎপত্তি হওয়া করোনা সারা বিশ্ব ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এর থাবা থেকে বাদ যায় নি।

বাংলাদেশে এই সংক্রমন ছড়ায় সাধারনত বিদেশ ফেরত যাত্রীদের মাধ্যমে। যদিও এখনো বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস চীন, ইতালি ,স্প্যানের মতো ভয়াবহ রূপ নেয় নি তথাপি আমরা শংকা মুক্ত নই। নিশ্চিত থাকার কোন অবকাশ নেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারতে লকডাউন চলছে। বাংলাদেশ লকডাউন এ এখনো যায়নি। দু-তিন টা জায়গা আংশিকভাবে লক ডাউন দেয়া হয়েছে। তবে সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা হিসেবে সারাদেশে স্কুল কলেজ বন্ধের পাশাপাশি অফিস আদালত মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য। সাধারণ জনগন এই ধরনের ঘোষণায় স্বস্তি ফিরে পেয়েছে।এই ধরনের ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল জণগন। সরকারের এই ঘোষণা সাধারণ জণগন ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে।

 

      কিন্তু স্বপ্নদীপের মনে কেন যেন স্বস্তি নেই।এক অব্যক্ত অস্বস্তি ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছে। একরাশ বেদনা জমা হয় বুকের ভেতর। বিষন্নতা ঘাপটি মারে স্বপ্নদীপের স্বপ্নীল আকাশ টাতে।

      রুমকির সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না যখন তখন। স্বপ্নদীপ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সতর্ক করে রুমকি কে। স্বপ্নদীপ যেন স্বস্তির পাচ্ছিল না।

         রূমকি কে মেসেজ পাঠায়- 'জরুরী আলাপ আছে'

    ঘন্টা খানেক পর রুমকি র জবাব আসে।

   কী কথা, বলেন।

       শোন , রুমকি মাস্ক ছাড়া  ঘর থেকে বের হবে না। আমি তোমাকে যে মাস্ক  তোমাকে পাঠিয়েছিলাম সেগুলো আরো কিনে নিবে‌।

 

     আমার এখানে মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও, রুমকি জবাব পাঠায়।

      ঠিক আছে, আমার কাছে আছে,আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি আজ বিকালে। আগামী পরশু দিন পেয়ে যাবে। স্বপ্নদীপ মেসেজ পাঠায়।

      ঠিক আছে। কিন্তু আপনার প্রয়োজন হলে কোথায় পাবেন, রুমকি জিজ্ঞাসা করে?

       আমার আছে। আমার জন্য ভেবো না , স্বপ্নদীপ জানায়।

      রুমকি, সাবধানে থেকো। জ্বর সর্দি কাশি হলে অবহেলা করবে না। বেশী জ্বর হলে অবশ্যই তাপমাত্রা মেপে দেখবে।সব সময় গরম  পানি দিয়ে গোসল করবে। ঠান্ডা লাগাবে না কোনভাবেই।

     শুধু উপদেশ আর উপদেশ। আমাকে নিয়ে এত ভাবছেন কেন  আপনি?

     জানি না ,রুমকি।

    আচ্ছা, ঠিক আছে। নিজের প্রতি খেয়াল রাখবেন। শুধু অন্যকে উপদেশ দিলে হবে না।বুঝলেন মশাই। রুমকি স্বপ্নদীপ কে সতর্ক করে।

      রুমকি,শোন।

     কী বলেন।

      বিদেশ ফেরত  কারো সংস্পর্শে আপাতত যেয়ো না। আমাদের দেশে করোনা সংক্রমনের প্রধান মাধ্যম কিন্তু বিদেশ ফেরত লোকজন। বিদেশ ফেরত যাত্রীদের কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।হোম কোয়ারেন্টিন এর পাশাপাশি বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা বলা হয়েছে।

         তোমার এখানে তো দেখলাম বিদেশ ফেরত লোক সবচেয়ে বেশী।তাই বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

      হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমার এখানে বিদেশ ফেরত লোক বেশী ‌কিন্তু বিদেশ ফেরত রা তো কোয়ারন্টিন মানছে না।তারা অবাধে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে স্বাধীনভাবে।হাটে বাজারে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে। শ্বশুর বাড়িতে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে অবাধে। এমনকি কেউ কেউ বিয়ে পর্যন্ত করছে। প্রশাসনের লোকজন গিয়ে বিয়ে ভেঙে দিতে দেখা যাচ্ছে। খুব আতঙ্কে আছি।রুমকি জানায়।

     ভয় নয়,এ বিপর্যয়ের সময় সতর্ক হতে হবে।ভয়কে জয় করে করোনা মোকাবেলা করতে হবে, রুমকি। স্বপ্নদীপ সাহস দেয়।

৪থ অংশ

 

 কিন্তু  জনগন তো ঠিকভাবে  সচেতন হচ্ছে না।কোয়ারেন্টিন  মানছে না লোকজন। রুমকি জানায়।

     সত্যিকার অর্থে  আমাদের দেশপ্রেম কম। আমরা বাঙালি নিজে থেকে সচেতন হতে চাই না। আমাদের কে জোর করে সচেতন করতে হয়।শোন , পৃথিবীর অনেক দেশেই কিন্তু রদলক ডাউন  দেয়া হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে লকডাউন চলছে। আমাদের দেশে এখনো লক ডাউন হয়নি। প্রয়োজনে লকডাউন হতে পারে। কিছু ভালো লাগছে না।

কেন? রুমকি জানতে চায়।

বাসায় বন্দী থাকব। ঠিক মতো তোমার সাথে যোগাযোগ হবে না। স্বপ্নদীপ জানায়।

       ভালই হয়েছে। আমার ভালই লাগছে। একদিকে করোনা প্রতিরোধে হবে। অন্যদিকে আমার সেলাই কাজ গুলো করতে পারব । কয়েক টা থ্রি পিস সেলাই বাকি আছে। এগুলো সেলাই করব। অফিস খোলা থাকলে করতে পারি না। রুমকি সাবলীল ভাবে বলে চলে।

     তুমি   শুধু  তোমার দিকটা ভাবছ। আমার দিকটা ভাবলেনা। স্বপ্নদীপ রাগ করে।

       কেন। পরিবারে সময় দিবেন। সারাদিন একসঙ্গে থাকবেন। কবি মানুষ, বসে বসে কবিতা লিখবেন। রুমকি যুক্তি দাঁড় করায়।

   মন ফ্রেশ না থাকলে লেখা যায় না। লিখতে গেলে ফ্রেশনেশ লাগে, অনুপ্রেরণা লাগে। অনুপ্রেরণার মানুষ লাগে।

     ও, তাই বুঝি? রুমকি র প্রশ্ন।

    ঝোঁক  করছ, কোনদিনই তুমি আমাকে বুঝতে চাওনা। কোনদিন বুঝলে না কিছু আমকে। স্বপ্নদীপ দেশলাই কাঠির মতো যেন জ্বলে উঠে।

   রেগে যাচ্ছেন কেন? আরে বাবা, এক্ষেত্রে আমার কী করার আছে বলেন।ছুটি তো সরকার দিয়েছে সবার ভালোর জন্য। ঘরে থাকার জন্য। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য।সবার মঙ্গলের জন্য বৃহৎ স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করা  ছাড়া আর কি করার আছে।

    রুমকির যৌক্তিক কথা শুনে স্বপ্নদীপ এর রাগ কিছু টা কমে।রুমকি সব সময় যৌক্তিক কথাবার্তা বলে। খুব ই বাস্তববাদী।ওর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছে স্বপ্নদীপ। অসাধারণ সব বৈশিষ্ট্যের জন্য স্বপ্নদীপ রুমকি কে এত বেশি পছন্দ করে।

      রুমকি , বেশি প্রয়োজন না হলে বাইরে যাবে না।এক সপ্তাহের বাজার করে রাখতে পার। তবে কেনার দরকার নাই।কারন এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হতে পারে। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ তখন সমস্যয় পড়বে। তারাতো একসাথে বেশি বাজার করতে পারবে না।

     ঠিক আছে, আপনিও ভালো থাকবেন, সতর্ক থাকবেন, রুমকি   একথা বলে স্বপ্নদীপ কে সাবধান করে দেয়।

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য