বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০ ২০
সম্পাদকীয় ডেস্ক
১০ অক্টোবর ২০ ২০
৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ
ধর্ষকের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করা জরুরি

কামরুল হাসান দর্পণ:: দেশজুড়ে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় আবারও ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবীতে সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করেছে। ধর্ষণ এবং ধর্ষকের সর্বোচ্চ বিচারের দাবীতে গত সপ্তাহে দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। ‘আবারও’ শব্দটি বলছি এ কারণে যে, ধর্ষণের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এটা নীরবে-সরবে চলছে। থেমে নেই। এসব ঘটনার একটি দুটি যখন প্রবল আকারে প্রকাশিত হয়, তখন এ নিয়ে সচেতন মহল সরব হয়ে উঠে। তার আগে সরব হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেখান থেকেই মূলত ঘটনার বিস্ফোরণ ঘটে। তখন সচেতন মহলের টনক নড়ে এবং তারা প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠে। তারপর ধীরে ধীরে প্রতিবাদ থেমে যায়। অবশ্য দিনের পর দিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ প্রতিবাদ আবার জেগে উঠে আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর। বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে ধারাবাহিক প্রতিবাদের প্রয়োজন পড়ত না, যদি ঘটনা ঘটার পর দায়ীদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যেত। আমাদের দেশে ধর্ষণকারীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দেয়ার ঘটনা খুব কমই ঘটে। দুয়েকটি শাস্তি হলেও তা ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনার ওপর প্রভাব পড়ে না। এই প্রভাব না পড়ার কারণ হচ্ছে, সাধারণত ধর্ষণের সাথে যারা জড়িত তারা কোনো না কোনোভাবে হয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, না হয় তাদের পেছনে ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। ধর্ষণকারীর মধ্যে এমন প্রবণতা প্রবল যে, সে যেকোনো অপরাধ করলে, তার কিছু হবে না। ক্ষমতার জোরে এবং প্রভাবশালী নেতাদের দিয়ে পুলিশসহ অন্যদের ম্যানেজ করে পার পেয়ে যাবে। ঘটেও তাই। ভিকটিম মামলা করলেও পুলিশি তদন্ত করতে করতে সময় যেমন চলে যায়, তেমনি ধর্ষণকারির বিরুদ্ধে দেয়া প্রতিবেদনও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে আসামী ধরা পড়লেও সহজে জামিনে বের হয়ে যায়। তার শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। জামিনে বের হয়েই সে ভিকটিম ও তার পরিবারকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। এতে দুর্বল হয়ে পড়া ভিকটিম ও তার পরিবার ভয়ে মামলা চালাতে পারে না, কিংবা আদালতে গরহাজির থাকে। একসময় মামলা তামাদি হয়ে যায়, অপরাধীরাও পার পেয়ে যায়। অর্থাৎ ধর্ষণের ঘটনার সাথে জড়িতরা ক্ষমতাসীন দলের বা প্রভাবশালীদের প্রশ্রয় পাওয়ায় তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না।

দুই.
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্বীকার করে বলেছেন, ‘ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ধর্ষণসহ অব্যাহত নারী নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনার দায় এড়াতে পারে না।’ তার এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট, সরকার ধর্ষণ প্রতিরোধ, প্রতিকার এবং ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে সরকারের দুর্বলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এটা ভাবাও অমূলক নয়, অধিকাংশ ঘটনার সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী জড়িত থাকায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার কুণ্ঠিত কিংবা তার মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তি দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। গত কয়েক দিনে পত্র-পত্রিকায় যেসব ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী জড়িত। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল, যতই দিন যাবে এবং ঘটনা ম্রিয়মান হতে থাকবে, এসব অপরাধীও ক্ষমতার দাপটে কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাবে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, অতীতে ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের যেসব নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছে, তাদের অনেকেই জামিনে বের হয়ে দোর্দন্ড প্রতাপে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই যে এমসি কলেজে গৃহবধূর গণধর্ষণের শিকার এবং নোয়াখালির বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে ধর্ষণের পর বিবস্ত্র করে নির্যাতন করার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী হওয়ায় এক সময় যদি তারা জামিনে বের হয়ে যায়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিষয়টি ক্ষমতাসীন দলের লোকজন বা প্রশ্রয়প্রাপ্তদের কাছে ‘সাত খুন মাফ হয়ে যাওয়া’র মতো অপসংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, তোলপাড় হয়ে যাওয়া এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা-কর্মীর কাছে কিছুই মনে হচ্ছে না। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে না। যেমন এমসি কলেজের ধর্ষণের ঘটনার পর গত কয়েক দিনে সিলেটে পাঁচটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই পাঁচটি ঘটনার দুটি ঘটনার সাথে ছাত্রলীগের কর্মী জড়িত। অর্থাৎ এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মীর গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে কোনো ধরনের সচেতনতা বা অনুতাপ সৃষ্টি করেনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ ঘটনায় তারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে কিংবা তারা জানে এমসি কলেজের ধর্ষণের ঘটনার সাথে জড়িত তাদের ভাই-ব্রাদারদের কিছু হবে না, কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে বের হয়ে আসবে। সিলেটের ঘটনা শুধু সিলেটের ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের যেমন টনক নড়াতে পারেনি, তেমনি দেশজুড়ে ক্ষমতাসীন দলের অন্য নেতা-কর্মীদেরও সচেতন করতে পারেনি। যদি তাই হতো, তবে ঐ ঘটনার পর যেসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তার সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা জড়িত হতো না। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বেগমগঞ্জের গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে ভিডিও করার দৃশ্য ৩২ দিন পর ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে এর সাথে জড়িতরাই। অর্থাৎ অপরাধ করে অপরাধীরাই সদর্পে তাদের অপরাধের জানান দিয়েছে। তারা যদি জানান না দিত, তাহলে এ ঘটনা কোনো দিনই প্রকাশিত হতো না এবং এত প্রতিবাদও হতো না। আদালতও বলেছেন, ‘এই বর্বর ঘটনা যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে না আসত, তাহলে এত বড় অপরাধের কথা গোপনই থেকে যেত।’ এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হয়, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা মনে করে, তারা অপরাধ করলে কিছুই হবে না এবং তাদের টিকিটি কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। বাস্তবেও তাই ঘটছে। এ ঘটনার মূল হোতা দেলোয়ার ক্ষমতাসীন দলের কর্মী এবং স্থানীয় এমপির ডান হাত হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে নানা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। দেশে চলমান করোনা মহামারির মধ্যেও ধর্ষণ, খুন, বিভিন্ন ধরনের অপরাধ যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের নৈতিক বোধোদয় ঘটেনি। তারা অবলীলায় অপরাধ করেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ মাসে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি। এর মধ্যে গণধর্ষণ ২০৮টি। এ হিসেবে, প্রতি মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০০ জনের বেশি এবং প্রতিদিন ঘটেছে ৩টির বেশি। এর বাইরে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৬২৭টি। ধর্ষণকারীরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি ৪৩ জনকে খুনও করেছে। ধর্ষণকারীরা এতটাই বেপরোয়া যে, তাদের কাছ থেকে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। তবে এ পরিসংখ্যানের বাইরে যে আরও অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। সেসব ঘটনা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এর কারণ, ক্ষমতার দাপটের কাছে ভিকটিম অসহায় এবং লোকলজ্জার ভয়ে তা প্রকাশ করে না।

তিন.
দেশজুড়ে ধর্ষণের যে বীভৎস ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কেউই তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিরাপদ বোধ করছে না। এখন রাস্তা-ঘাটে পিতা তার সন্তানকে নিয়ে, স্বামী তার স্ত্রীকে নিয়ে নিশ্চিন্তে চলাচল বা কোথাও ঘুরে-বেড়াতেও শঙ্কিত বোধ করছে। কারণ, যে কেউ যে কোনো স্থানে যে কোনো সময়ে ধর্ষণের শিকার হতে পারে। আবার ঘরেও নিরাপদবোধ করছে না। ধর্ষকরা এতটাই দুর্বিনীত যে ঘরের দরজা ভেঙ্গে ধর্ষণ করছে। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে গণধর্ষণের মহোৎসব চালাচ্ছে। এ এক ভয়ানক পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতির নিরসন এবং লাগাম টেনে ধরার যেন কেউ নেই। বলা বাহুল্য, ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীই যখন অকপটে স্বীকার করেন, ধর্ষণের দায় সরকার এড়াতে পারে না, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, এক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ক্ষমতাসীন দল তার নেতা-কর্মীদের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ফলে যেখানে-সেখানে এবং ঘরের ভেতর তার নেতা-কর্মীর দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এসব নেতা-কর্মীর কাছে এখন দলের ইমেজ বা মান-সম্মান ক্ষুন্ন হওয়ার বিষয়টি বড় নয়, বড় হয়ে উঠেছে দলের একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং এ ক্ষমতাই তাদের মধ্যে যা খুশি তা করা ও যাকে খুশি তাকে ধর্ষণ, খুন ও নির্যাতন থেকে দায়মুক্তির মনোভাব সৃষ্টি করেছে। তারা একবারও ভাবে না, তার পরিবারের কেউ যদি ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে কেমন লাগবে? ধর্ষণের পর ভিকটিমের অবস্থা কি দাঁড়ায়? সম্ভ্রম হারিয়ে সে যে সামাজিক মর্যাদা হারায়, এমনকি অনেক সময় পরিবারের কাছেও অচ্ছুৎ ও অপাংক্তেয় হয়ে পড়ার কারণে তা সহ্য করার মতো অবস্থা কি তার থাকে? থাকে না। ফলে ধর্ষণের শিকার অনেকের কাছে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আমাদের সমাজে ধর্ষিতাকে যেমন নীচু চোখে বা কলঙ্কিত হিসেবে দেখার মানসিকতা রয়েছে, তেমনি ধর্ষণকে মামুলি বিষয় হিসেবে নেয়ার মানসিকতাও রয়েছে। ধর্ষণকারীকে ঘৃণা বা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার পরিবর্তে কেউ কেউ বাহবা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। বিশেষ করে ধর্ষণকারীর পরিবারের মধ্যে এমন মনোভাব দেখা যায়। তাদের মধ্যে এ ধারণা কাজ করে, ছেলেমানুষ একটা ভুল করে ফেলেছে। তাদের এ মনোভাবের পেছনে কাজ করে নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং ক্ষমতার দাপট। ন্যূনতম মনুষত্ববোধ এবং নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকলে এ মনোভাব থাকত না। গ্রামে-গঞ্জে এমন অনেক ঘটনার নজির রয়েছে, ধর্ষণের ঘটনার পর ধর্ষণকারীর বিচার না করে ধর্ষিতার বিচার করা হয়। দোষ চাপিয়ে তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণার মাধ্যমে একঘরে করা হয়। এর কারণ, ধর্ষণকারী ও বিচারকরা প্রভাবশালী এবং তারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত। দেশের বিশিষ্টজনরা তোলপাড় করা ধর্ষণের ঘটনার পর যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তাতেও এই বিষয় উঠে এসেছে। ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যাওয়া, পেছনে রাজনৈতিক শক্তি, ন্যায়বিচার না পাওয়া, আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকা ইত্যাদি মন্তব্য তারা করেছেন। তাদের এসব বক্তব্য যেমন সত্য তেমনি এ কথাও বলা দরকার, দেশে যখন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধের অভাব ঘটে তখন এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে পারিবারিক ও ধর্মীয় শাসন-বারণের অভাব ঘটলে বা না থাকলে সন্তানরা বিপথে চলে যায়। আবার তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এর উপকারিতার সাথে অপকারিতাও জড়িত। ইন্টারনেট সহজ হয়ে যাওয়ায় তরুণ থেকে শুরু করে অনেক ম্যাচিউরড লোকজনও পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং পড়ছে। ধর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানীরা মাদককে দায়ী করছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশ সংঘটিত প্রায় আশি ভাগ ধর্ষণের ঘটনা ঘটাচ্ছে মাদকাসক্তরা। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেয়ার পরও মাদকের অবাধ প্রবাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর থেকে কঠোরতর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। মাদক বন্ধ করতে পারলে ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধমূলক ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তবে এ প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরা। একজন প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ কখনোই অশ্লীল কাজ এবং কথাবার্তায় জড়িত হতে পারে না।

চার.
সাধারণ মানুষের ধারণা হচ্ছে, দেশে প্রত্যেক অপরাধ দমনের আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হয় না। অপরাধের সাথে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জড়িত থাকলে ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যায়। আবার তদন্ত এবং মামলার রিপোর্ট দেয়ার ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর তদন্তকারী কর্মকর্তার দুর্নীতি এবং অনিয়মের পাশাপাশি ক্ষমতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রকৃত রিপোর্ট দেয় না। আদালতে রিপোর্ট দুর্বল আকারে উপস্থাপন করার কারণে আসামীরা সহজে জামিনে বের হয়ে আসে এবং মামলাও এক সময় তামাদি হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ওবায়দুল কাদের ‘সরকারের দায় রয়েছে’ বলে যে কথা বলেছেন তা নিরেট সত্য কথা। তবে সরকারের এই দায় বা দুর্বলতার কথা স্বীকার করলেই হবে না, সরকারকে খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধ দমন করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। অপরাধের সাথে যদি ক্ষমতাসীন দলের কেউ জড়িত থাকে, তাকে ‘বিশেষ দৃষ্টিতে’ না দেখে বা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ না করে অন্যান্য গুরুতর অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত অপরাধী ও অপরাধের মতোই দেখতে হবে। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সংশোধন করে মৃৃৃৃৃৃৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ আইন দ্রুত প্রণয়ন করা দরকার। এসিড সন্ত্রাস দমনে সরকার মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করায় তার সুফল পাওয়া গেছে। এসিড সন্ত্রাস কমে গেছে। তবে এ কথা মনে রাখা দরকার, আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চত করতে হবে। আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এর বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে তার সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখন সকলেরই জানা। ফলে ক্ষমতাসীন দলকে আগে নিজের ঘর থেকেই অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেয়ার নজির সৃষ্টি করতে হবে। গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত নিজের দলের লোকজনকে গ্রেফতার করে ‘রেহাই দেই নাই’ বলে আত্মতৃপ্তি লাভ না করে শাস্তি নিশ্চিত করে দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে গ্রেফতার করে পরে দায়মুক্তি দেয়ার মতো নাটকীয়তা পরিহার করতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে, শুধু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করলেই চলবে না, মানুষের নিরাপত্তা এবং নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। মানুষের জানমালের নিরাপত্তাই যদি না থাকে, তাহলে এ উন্নয়ন কার জন্য এবং তা দিয়ে কি হবে? উন্নয়নকে সফল করতে হলে এবং এর সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার আগে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে, তার সুফল ক্ষমতাসীন দলের কিছু বেপরোয়া নেতা-কর্মীর কারণে যে মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, সরকারকে তা বুঝতে হবে। তা নাহলে, সাধারণ মানুষের জীবন অরক্ষিত রেখে যতই উন্নয়ন করা হোক না কেন, তা কোনো কাজে আসবে না।

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য