রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সিলেটে ফুটপাতে জুড়ে পুলিশের বানিজ্য



DSC_1493সিলেটের যে সকল সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে, ‘হকার’। ঈদকে সামনে রেখে এই সমস্যা আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। সিটি করপোরেশনের (বরখাস্তকৃত) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচিত হওয়ার পর নগরীকে হকারমুক্ত করতে বেশ কয়েকবার অভিযানও চালান তিনি। এমনকি হকারকে পুনর্বাসন করতে নিয়েছিলেন নানা ধরনের উদ্যোগ। কিন্তু পরবর্তীতে সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারান্তরীণ হওয়ার পর ভেস্তে যায় সেই উদ্যোগটি। এরপর নগরবাসীর দায়িত্ব নেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী এনামুল হাবীব।

তিনিও অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে বলেছিলেন- সিলেট নগরী থেকে অবৈধ স্থাপনা ও হকারদের সরিয়ে দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে তিনি নিজেও কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেছেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পর হকাররা আবারও ফুটপাতে বসে যান।

এদিকে, সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়ির এসআই নজরুল ইসলাম হচ্ছেন কোতোয়ালি পুলিশের ‘টাকার খনি’। হকারদের কাছ থেকে নজরুল ফাঁড়ি এলাকা থেকে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে প্রতিমাসে মাসে ৩-৪ লাখ টাকা আদায় করে থাকেন। এমনকি বন্দরবাজার এলাকার ছিনতাইকারী, মোটরসাইকেল চোরচক্র, পতিতা সর্দারসহ সবাই টাকা দেয় নজরুলকে। টাকার জোর বেশি থাকায় বন্দরবাজার ফাঁড়ি থেকে সরছে না নজরুল। কারণ তার সাথে রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গোপন সখ্যতা। যখনই তাকে বদলির জন্য বড় কর্তারা উদ্যোগ নেন তখনই টাকা নিয়ে হাজির হয়ে যান নজরুল।

বড় কর্তাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার কথা ইতিমধ্যে বহুবার সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন নজরুল। ফলে সিলেটের বন্দরবাজার এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন ফাঁড়ির ইনচার্জ নজরুলও। এ কারণে রমজানের আগে দুই দফা অভিযান চালালেও হকারমুক্ত হয়নি সিলেটের ফুটপাথ। সরকারদলীয় রাজনীতিক ও পুলিশের স্বার্থে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে এই বাণিজ্য চলতে পারে না। এই কায়েমি স্বার্থের কারণে মনে শঙ্কা সৃষ্টি হয়, হকারদের রাস্তা থেকে ওঠানো আদৌ সম্ভব হবে কি? এমন প্রশ্ন সচেতন নগর10বাসীর।

এ প্রসঙ্গে বন্দবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন- আমার বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা লেখেন কোন সমস্যা নেই। অতীতেও অনেক লেখালেখি হয়েছে কোন লাভ নেই?

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়- নগরের ২৭টি ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন ১৫ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। এর মধ্যে ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার ফুটপাত হকাররা দখল করে রেখেছেন। ফুটপাত ছাড়া আরও অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকার মূল সড়ক দখল করে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছেন। তবে সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন ফুটপাত ছাড়া আরও প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফুটপাত রয়েছে।

জানা যায়- সিলেটের দক্ষিণ সুরমার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ সবক’টি উপ-সড়ক পুরোটাই হকারদের দখলে। কয়েক হাজার হকার অবৈধ দখলে রেখেছে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা। একই অবস্থা সিলেটের উত্তর সুরমায়। প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে সিলেট নগরীর সুরমা মার্কেটের সামনে থেকে একদিকে ধোপাদিঘীরপাড়, অপরদিকে সুরমা মার্কেট থেকে চৌহাট্টা এয়ারপোর্ট রোড পর্যন্ত কয়েক হাজার হকার সড়কগুলো দখলে রেখেছে। এসব সড়কের প্রধান দুইপাশে রীতিমতো অস্থায়ী দোকান বানিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে।

সিলেটের জেলা পরিষদ, আদালতপাড়া, জেলা প্রশাসকের অফিস ও বাসভবন, এসপি অফিস, প্রধান ডাকঘরের সামনে পর্যন্তই কয়েক হাজার হকার। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে তারা টাকার বিনিময়ে বিদ্যুৎ এনে ব্যবসা করছেন। স্বল্প পুঁজিতেই খোদ রাস্তা দখল করে ব্যবসা চালানোর কারণে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ করে যারা অত্যাধুনিক মার্কেটে ব্যবসা করছেন তারা পড়েছেন বিপাকে। আর ওদিকে, হকারলীগ নামে আব্দুর রকিবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট রাজপথ থেকেই প্রতিদিন লোপাট করছে লাখ লাখ টাকা। মাত্র ২০ গজ ফুটপাতে হকার বসিয়ে ওই সব নেতারা মাসে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশও আলাদাভাবে টাকা আদায় করছে।

নামমাত্র এসব অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের মধুবন ও হাসান মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন- পুলিশ ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের কারণে ফুটপাত দখলমুক্ত হচ্ছে না।

এদিকে, সিলেটের রেজিস্ট্রারি মাঠ এখন পুরোটাই হকারদের দখলে। হকাররা দখল করে রেজিস্ট্রারি মাঠকে হকার মার্কেট হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স ও সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন- সিলেটের হকার সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থমন্ত্রী আন্তরিক রয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা সিলেটের ফুটপাথ নিয়ে হকার রাজনীতি করছেন। ভোটের ফ্যাক্টর বলে মনে রাজনৈতিকভাবে কেউ অ্যাকশনে যাচ্ছেন না। আবার হকার উচ্ছেদে প্রশাসন আগ্রহী হয়ে উঠলে রাজপথে রাজনৈতিক ছায়ায় আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।