রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বর্ষবরণে নানা আয়োজন



ফারহান আহমদ চৌধুরী:: আসছে পয়লা বৈশাখ। বাঙালির দ্বারে আরো একটি নতুন বছর। পয়লা বৈশাখকে বরণ করতে আনন্দে মেতে উঠে বাঙালি জাতি। নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। তারই ধারাবাহিকতায় সিলেটের গ্রামীণ জনপদের মানুষজনের মাঝে বইছে প্রাণের ছোঁয়া। বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ বরণ ও উদযাপনে অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে মেলা।
পয়লা বৈশাখ আর বৈশাখি মেলা যেন এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে প্রাণের স্পন্দন হয়ে আছে। বাঙালির কৃষ্টি কালচার আর ঐতিহ্য নিয়ে বর্ণিল সাজে মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন ও গ্রামে-গ্রামে বৈশাখি মেলা আয়োজনের মাধ্যমে এখানে চলে বর্ষবরণ। আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য এই মেলা

। গ্রাম্য বা শহরের মেলাতে দেখা যায় থাকে নানা রকম পিঠাপুলির বাহারি উৎসব। মেলায় নানা স্বাদের মুড়িমুড়কি আর পিঠা-পুলি তো রয়েছেই, সেই আদিকাল থেকে জনপ্রিয় পুতুল নাচের আসরও এই সব হলো মেলার অন্যতম আকর্ষণ। অনেক স্থানে দেখা যায় ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া ব্যবস্থা থাকে। এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটির শিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী। নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণি।

দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যের। এ মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক, আবহমান বাংলা ও বাংলাদেশের প্রতিমূর্তি। সময়ের প্রবাহে মোগল প্রবর্তিত বাংলা নববর্ষের উদযাপন-আয়োজনে এসেছে পরিবর্তন। পরিবর্তন এসেছে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখি মেলায়ও। চৈত্রসংক্রান্তি থেকে পুরো বৈশাখ মাসজুড়ে বিভিন্ন স্থানে বসে বৈশাখি মেলা। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে নববর্ষের বৈশাখি মেলা। সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে অর্ধশত মেলা আসর জমবে নববর্ষে।
পয়লা বৈশাখ উদযাপনে আমাদের জাতীয় চেতনা ও ঐতিহ্যের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবির দেখা মেলে। একদিকে যেমন উৎসবে মেতে ওঠে নবীন-প্রবীণ, শিশু এবং কিশোররাও অন্যদিকে নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের নতুন প্রজন্মও পরিমার্জিত ধারণা লাভ করতে পারে। আবার দেখা যায় গ্রাম বাংলায় পয়লা বৈশাখ মানে হালখাতা, মেলা আর নানান আনুষ্ঠানিকতা।

হালখাতা মূলত ব্যবসায়ীদের একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। মেলা এবং মেলাকেন্দ্রিক বিনোদন সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে হয়ে ওঠে প্রাণবস্ত। আর নাগরদোলায় হাওয়ায় ভেসে নববর্ষের নতুন মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করার অনুভ‚তি যেন একেবারেই ভিন্ন।
বর্ষবরণকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কয়েকজন সংস্কৃতিসাধক নিরস্তর কাজ করে চলেছেন। তারই ধারাবাহিকতার ফসল বর্ষবরণে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এবং চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে পয়লা বৈশাখের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

এই দু’টি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ ঘটে। গ্রামের বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও সেবা সংঘের উদ্যোগেও বর্ণাঢ্যভাবে বর্ষবরণ করা হয়। তা ছাড়া মেলা, যাত্রাপালা, সার্কাস, ঘোড়দৌড়, লাঠিখেলা এ সব নির্মল আনন্দ আয়োজনের মধ্য দিয়েই প্রাণবস্ত হয়ে ওঠে বর্ষবরণের আয়োজন।
শুভ নববর্ষে ঐতিহ্যগতভাবে বৈশাখি মেলা, খেলাধুলা, হালখাতা, ঘোড়দৌড়, ভূমিকর্ষণ, রকমারি স্বাদের খাবার, নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ, নৃত্য, যাত্রা ইত্যাদির আয়োজন হয়।

এছাড়াও রকমারি খাদ্যসামগ্রী, যেমন, চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা ও বিভিন্ন প্রকার মিষ্টির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। এছারাও থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণী, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত শুটকি ভর্তা খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। যেমন নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা হাড়িভাঙা কিংবা কলা গাছ বেয়ে উঠা। আমাদের প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ।