বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কুক্ষিগত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন চাই : মো.নাঈমুল ইসলাম



ইকরা ইসলামের প্রথম আপাত বাক্য। হে নবী আপনি পড়ুন। এর পর থেকেই শিক্ষা ধীরে ধীরে শুরু হয়ে যায় এবং এক বিস্তার রূপ নিতে থাকে। শিক্ষাকেই কেন্দ্র করে আমাদের বেড়ে উঠা। একটি শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর সে যখন তার জননীর মুখ থেকে ভাষা শিখে নিজেকে উৎকৃষ্ট করে এটি তার পারিবারিক শিক্ষার এক পর্যায় শুরু হয়।

যখন সে মায়ের কোল থেকে মাটির সংস্পর্শে আসে অর্থাৎ সে যখন তার কচি পা দিয়ে টুক টুক হাটঁতে শুরু করে এবং অল্প অল্প কথা বলতে শেখে তখন তাকে দেখে নিজে অনেক আনন্দিত হই।

তাকে আমরা যা বলি সে সেই কথাগুলোই অনুরূপ বলার চেষ্টা করে এবং আমরা যা ভাবভঙ্গি করি তাও অনুকরণ করার চেষ্টা করে। কিছু বলতে এবং করে ফেললেও পুরোটা স্পষ্ট করে নয়।

তার বাক যখন প্রথম শব্দটা মা বলে ডাকে তখন মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ এখানেই নিহিত। বয়স যখন বাড়তে থাকে তখন শুরু হয় তাকে শিক্ষা দান করার পর্যায়। তাকে প্রতিদিন খাওয়ানো, ঘুম, খেলাধুলা সবকিছুই নিয়মমাফিক করতে হয়।

পর্যায়ক্রমিকভাবে ধাপে ধাপে তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে নিজের সন্তানাদির ক্ষেত্রে আমরা সবসময় তাদেরকে ভালো শিক্ষাটা দেয়ার জন্য একটু বেশী উদ্যোমী হয়ে উঠি। আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যেকটি পরিবারে দেখতে পাই মা-বাবা-দাদা-দাদি-নানা-নানি-চাচা-চাচি সবাই পরিবারের ছোট সদস্যকে (বয়স যখন ৩ থেকে ৬) সকালবেলা ফজরের নামাজের পরে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষকদের নিকট অথবা নিজে সাথে নিয়ে শিক্ষা দেন। প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের পর কখনো মা কখনো বাবা বই পুস্তকসহ তাকে সাথে নিয়ে বসে পড়েন।

শুরু হয় জীবনের প্রথম শিক্ষা অ,আ, ই, ঈ; A,B,C,D ইত্যাদির খেল। পরিবারের সবাই তার পেছনে ছুঁটে পড়েন তাকে শিষ্টাচার, নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা, নীতিশিক্ষা ইত্যাদি দেয়ার জন্য। জীবনের প্রত্যেকটি মূহুর্ত তাকে সুযোগ দিবে এই শিক্ষাগুলো অর্জন করার জন্য। বয়স ৬ হয়ে গেলে তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় তার জীবনের প্রাথমিক শিক্ষার পর্যায়। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ করে তার উপর সেই দিকটাই বেশি চাপানো হয় সে যেনো সবসময় সত্য কথা বলে, বড়দের সম্মান করে, ছোটদের স্নেহ করে এবং সবার সাথে ভালো হয়ে চলে। ধীরে ধীরে যখন ক্লাস বাড়তে থাকে তখন তাকে সময়ের সাথে মূল্যবোধ সম্পর্কেও জ্ঞান দেয়া হয়।

তাকে কিছু কিছু বোধশক্তির অনুভব করিয়ে দেয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ের গন্ডি অতিক্রম করে সে যখন মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নিত হয় তখন সে পড়ালেখার পাশাপাশি চিন্তা করার বোধশক্তিও অর্জন করে নেয়। সে বুঝতে শিখে পরিবারের কষ্টের সময় কিভাবে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। সে তখন পৃথিবী ও জগত সম্পর্কে ধারণা নিতে থাকে। সে প্রতিনিয়ত প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরণের মানুষের সাথে মিলেমিশে করতে শিখে। সে চেষ্টা করে পড়ালেখায় ভালো করে জ্ঞান অর্জন করতে।

সে চেষ্টা করে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতে। সে ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বুঝার চেষ্টা করে। সে এই শিক্ষা নিয়ে বড় হতে থাকে যে কোনোদিন কোনো ক্ষেত্রে কোনোভাবেই দুর্নীতি করা যাবে না। সে এই শিক্ষা নিয়ে বড় হতে থাকে দুর্নীতি করা মহাপাপ। ক্লাস ও বয়স বাড়ার সাথে সাথে শেষ হয় তার মাধ্যমিক পর্যায়। উন্নিত হয় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে। তখন তার সুপ্ত প্রতিভাগুলো বিকশিত হতে থাকে। সে পড়ালেখার পাশাপাশি চেষ্টা করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও মানব উন্নয়ণে কাজ করে কিভাবে একটু হলেও গরিবের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া যায়, কিভাবে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফুটানো যায়, কিভাবে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়, কিভাবে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের ভালো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায়। এইসব বিষয় নিয়েও তার মধ্যে চিন্তার এক বিশাল পাহাড় গড়ে উঠে।

আপাতত শিক্ষার স্তর এখানেই শেষ করি। কেননা জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত প্রত্যেকটি জায়গাই হচ্ছে শিক্ষা অর্জনের স্থর। যা বলে শেষ করা যাবে না। শিক্ষা অর্জন করা সহজ কিন্তু তাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞান অর্জন করা কঠিন। শিক্ষা নামক শব্দটিকে অন্ধকারের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে একমাত্র মানুষই পারবে। কেননা এটিকে অন্ধাকারাচ্ছন্ন করার মূল হেতু কিন্তু মানুষই। বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে অন্যায় এবং দুর্নীতি রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্টানে ভর্তি, পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, ব্যাংক এবং বিভিন্ন সরকারি চাকুরীতে যোগ দিতে গেলে যোগ্যতা নয় টাকাই সবকিছু বলে আমার মনে হয়। আমরা সেই উদাহরণটা দুটি বিত্তবান ও সম্বলহীন পরিবারকে দেখলে বুঝতে পারি। একটি গরিব পরিবারের ছেলে খেয়ে না খেয়ে, পরিবারের সবার ভরণ-পোষণ করে, সেলুনে নাপিতের কাজ করে, রিক্সা চালিয়ে অনেক দূর পড়ালেখা করে ভালো ফলাফল নিয়ে যখন সে চাকুরিতে যোগ দিবে তখন যদি তাকে শুনতে হয় আপনাকে চাকুরি দিয়ে দিবো ১০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। তখন সেই ছেলেকে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

সে আত্মহত্যা করেছে এটি অনেকে খারাপ মনে করতে পারেন। সমাজব্যবস্থার বিরূপ এক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তবে সে আত্মহত্যা করে এটি শিক্ষা দিয়ে গেছে অন্যায়ের কাছে কখনো মাথা নত করতে নেই। সে শিক্ষা দিয়ে গেছে কীভাবে বীরপুরুষ হয়ে অমর হতে হয়। সেই একই চাকুরী একজন ধনী পরিবারের ছেলে খারাপ ফলাফল নিয়েও যখন ১০লক্ষ টাকা দিয়ে যোগ দেয় তখন সে শিক্ষা দিলো কিভাবে দুর্নীতি করতে হয়। চারিদিক থেকে আশেপাশের লোকজনসহ সবাই খবর পেয়ে মিষ্টি নিয়ে ছুঁটে আসলেন, তাকে সাবাসি দিলেন ছেলেটি চাকুরি পেয়েছে কিন্তু তারা এটা জানতেন না যে সে অবৈধভাবে এটি অর্জন করেছে।

সে যে এতোদূর পড়ালেখা করেছে তাও ছিলো হযবরল। শিক্ষিত সার্টিফিকেটগুলোও ছিলো টাকা দিয়ে কেনা। শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় আমাদের মনুষ্যত্ববোধ, সততা এবং ন্যায়ের বিসর্জন দিয়ে দেই। আমি পরিলক্ষিত করলাম যে একজন অশিক্ষিত লোকের চরিত্র একজন শিক্ষিত লোকের চরিত্রের চাইতে একশ গুণ ভালো। রাজনৈতিক পরিবেশে শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে দেখা যায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট এবং চাপের মুখে পড়তে হয়। ক্লাস থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সবকিছুই পর্যবসিত হয়ে যায় খারাপ রাজনীতির প্রভাবে।

আফসোস করে বলতে হয় কলেজের যে দেয়ালে গুণি ব্যক্তিবর্গের কিছু দৃষ্টান্তমূলক বাণী ছিলো সেখানেও নেতাদের ফেস্টুন ও ব্যানার পরিলক্ষিত হয়। ছোটবেলায় পরীক্ষার হলে যেদিন বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পরীক্ষা চলছিলো তখন বেশিসময়ই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখতে হয়েছে। এরকম কোনো প্রশ্ন ছিলো না যে বাংলার বীর নায়ক মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, স্বাধীন বাংলার নায়ক শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক তাদের নামটাও লিখতে পারি। আজ উপলব্ধি করতে পারলাম বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা। কারণ উনারা মনে করেন ৭১ ও বঙ্গবন্ধু-কে জানলেই বাংলাদেশ সম্পর্কে জানা হয়ে যাবে। কিন্তু কিভাবে..? এই বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে ৪৭-এ। বাংলাদেশ সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে জানাতে হলে ৪৭ থেকেই শুরু করতে হবে। বর্তমান বাংলাদেশে মানুষ রাজনীতি নামক শব্দটাকে অনেক ঘৃণ্য মনে করেন। আমার প্রশ্ন হলো কিন্তু কেনো..? উত্তর খুঁজি: এটা সৃষ্টি করার মূল হেতু হলো বর্তমান বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি। ছাত্র রাজনীতির প্রকৃত অর্থ হলো ছাত্র অধিকার আদায়। কিন্তু তারা এটা থেকে দূরে সরে গিয়ে ছাত্র রাজনীতিকে ব্যবহার করে জ¦ালাও-পোড়াও ভাঙচুরের জন্য।

কলেজের বেতন বৃদ্ধি হলে সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে মোটা অঙ্কের টাকা বহন করে পড়ালেখার খরচ চালানো। কিন্তু একজন ছাত্রও সেটার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ জানাবে না। সাধারণ ছাত্ররা করতে চাইলেও ক্ষমতাসীনদের ভয়ে তাদের পক্ষে সেটি আর সম্ভব হয় না। কিছু সংখ্যক ছাত্রদের জন্য আজ ছাত্ররাজনীতির এই করুণ দশা। এটিই কি ছাত্ররাজনীতির সঠিক অর্থ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, উচ্চ মাধ্যমিক বা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে যখন কোনো ছাত্র কোনো ভার্সিটিতে, মেডিকেলে ভর্তি হবে তার ক্ষেত্রে যোগ্যতার মূল্যায়ণ কমই হয়।

হাজার সিট থাকলে তার ৩০০টি চলে যায় টাকায়, ২০০টি চলে যায় বাংলাদেশের সুনামধন্য মন্ত্রী, এমপিদের জন্য এবং বাকি যে ৫০০টি সিট রয়েছে যারা মেধাতালিকায় সুযোগ করে নেয় তাদেরকে কিছু হলেও টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হয়। আমরা কি কখনো এটি চিন্তা করে দেখেছি আমাদের দেশের শিক্ষিত ছেলেরা চাকুরি করার জন্য বাহিরে কেনো চলে যায়। কারণ এদেশে সুশিক্ষিতদের কোনো মূূল্যায়ণ নেই। আর যারা ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত, মেধাবী তাদেরকে সঠিক সম্মান দেই না বলে, তাদের প্রতি সঠিক মূল্যবোধ নেই বলে তারা বাহিরের দেশে গিয়ে অন্যদের গোলামী করে। এসব পরিস্থিতি দেখে নিজেকে তখন অসহায় মনে হয়।

আসলে আমরা হুজুগে চলি। যখন শিক্ষার্থীদের অবহেলাভাবে দেখা হয় তখন তাদের পড়ালেখার যে মনমানসিকতা থাকে সেটিও নষ্ট হয়ে যায়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দেই। যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক প্রয়োজন ১৪০জন সেখানে ৭০জন শিক্ষক দিয়েই ক্লাস চালানো হয়। যখন সকালের শিফট শেষ হয়ে বিকেলের শিফটে ক্লাশ শুরু হয় তখন শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে উদ্যোমী হলেও শিক্ষকরা হাঁপিয়ে পড়েন। কারণ একজন শিক্ষক তার যতটুকু আয়ত্ত আছে তিনি ততোটুকুই করতে পারবেন। তার বাহিরে করতে পারবেন না।

তাহলে কিভাবে একজন শিক্ষককে দিয়ে দুবেলা ক্লাস করানো হয়। তখন সেই শিক্ষার্থী মন থেকে চিন্তা করতে থাকে আসলে আমরা মনে হয় খারাপ স্টুডেন্ট তাই আমাদেরকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। সেই শিক্ষার্থীরা তখন এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগে। আমরা ইন্টারনেটকে দোষারোপ করি প্রশ্নফাসেঁর জন্য। ইউরোপের দেশগুলোর দিকে যদি খেয়াল করি যারা ইন্টারনেটের জন্ম দেয় তাদের দেশে কেনো প্রশ্নফাঁস হয় না। কারণ তাদের দেশে এরকম মানুষ নেই যারা শিক্ষায় অসুদুপায় অবলম্বন করে টাকা অর্জনের চিন্তা করেন।

আগে নিজেকে ঠিক করুন ইন্টারনেটের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ মানুষ বই না পড়ে গুগল এবং ইউটিউব থেকে অধিক পরিমাণ শিক্ষা অর্জন করতে পারে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে একটি শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। কারণ এই শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন নেই যারা জিপিএ ৫ পেয়ে তার সঠিক ইংলিশ বলতে পারে না। আফসোসের সাথে বলতে হচ্ছে আগামী ১০ বছর পর বাংলাদেশের ইংলিশ গিয়ে কোথায় দাড়াবে। ১০ বছর পর যদি ছেলেরা ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট নিয়ে যায় এবং তাকে যদি ইমিগ্রেশন অফিসার বলে ‘সোউ ইউর পাসপোর্ট (তুমার পাসপোর্ট দেখাও)’ তখন সে পাসপোর্ট না দেখিয়ে পাসপোর্ট বুকে সই করে দিবে। ওই যে তাকে সোউ বলছিলো পাসপোর্ট দেখানোর জন্য কিন্তু ছেলেটি ইংলিশ ভালো করে বুঝতেই পারলো না তাই পাসপোর্ট না দেখিয়ে সই করে দিল। এই হলো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের সন্তানের কু-শিক্ষা অর্জনের পিছনে শুধু সরকারকেই দোষারোপ না করে অনেকাংশে আমরাও দায়ী।

অনেক ক্ষেত্রে পরিবারই সেই সমস্যার মূখ্য হেতু হয়ে দাড়ায়। আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ি। আমরা বিশেষ করে তাদের সেই দিকটা খেয়াল রাখি তারা যেনো কোনোভাবেও মিথ্যা কথা না বলে। আমরা চেষ্টা করি আমাদের সন্তানদেরকে একটি রুটিনের মধ্য দিয়ে পরিচালনা করতে এবং বিশেষ করে মা-বাবা এক্ষেত্রে একটু বেশীই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কারণ তাদের একটাই আশা আমি আমার সন্তানকে পড়ালেখায় সবার চাইতে ভালো করে তুলবো। পড়ালেখায় ভালো হলেই সে সমাজে মূল্যায়ণ পাবে তার একটি ভুলভ্রান্তি আমাদের মনের মধ্যে চলে আসে। আমি পড়ালেখায় ভালো ফলাফল অর্জন করার বিরোধিতাও করছি না।

তবে আমাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা অর্জনের পেছনে মিথ্যা কথা শিখাতে মূলত আমরাই দায়ী। কেননা আপনারা খেয়াল করে দেখবেন বাবা ছেলের সামনে ঘরে বসে যখন ফোনে কথা বলেন তখন তিনি নিজেকে কোনো একটা বিপদ থেকে বাঁচাতে গিয়ে ফোনে মিথ্যা বলেন আমি তো বাসায় নেই আমি তো জিন্দাবাজারে (উদাহরণস্বরূপ) আছি। আমাদের সন্তান কি শিক্ষা অর্জন করবে বাবার কাছ থেকে। সেও বড় হওয়ার সাথে সাথে কিভাবে অন্যায় করলে মিথ্যা বলে বাঁচা যায় সে কৌশল অবলম্বন করবে এবং মিথ্যার প্রতি এক ধরনের আসক্তি জন্মাবে এবং তার প্রবণতা বেশী মাত্রায় দেখা যাবে তার আচরণ এবং কথা-বার্তার মধ্যে।

পরিবারে, বাহিরে এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। একটি পরিবার হয়তো ভালো অথবা কাল হয়ে দাড়াতে পারে তাদের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’ প্রচলিত কথাটির সাথে আমি কোনোদিনও সমর্থিত হতে পারি না। আমি বিনয়ের সাথে বাক্যটিকে প্রত্যাখ্যান করতে চাই। তবে বাক্যটির পূর্ণতা এরকম হবে ‘সু-শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’। কারণ প্রত্যেকটি বিষয়ের একটি খারাপ এবং একটি ভালো দিক থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও আছে: সু-শিক্ষা ও কু-শিক্ষা। একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে কু-শিক্ষা নয় সু-শিক্ষার প্রয়োজন। তাই আমরা চেষ্টা করবো আমাদের সন্তানদেরকে উপরোক্ত উদাহরণগুলোর বাস্তবপ্রয়োগ থেকে মুক্ত রাখতে।

শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে এক ধরনের গাঠনিক, ব্যবহারিক, আচরণগত, বৈষয়িক বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে বিচক্ষণ হওয়ার পেছনে তাদের উৎসাহী করে যাবো। তাদেরকে প্রত্যেকটি ভালো কাজের জন্য তাদের পাশে থেকে তাদেরকে সাপোর্ট করে যাবো। কিন্তু তাদের অবশ্যই খারাপ কাজগুলোতে বাধা প্রদান করবো। তাদের যেকোনো ভালো শিক্ষাই দেই না কেনো তাদেরকে প্রত্যকটি বিষয়ে মানবতা, সত্য ও ন্যায় শেখানোর প্রচেষ্টায় অবিরাম থাকবো।

কারণ আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ তার পথচলার উপর নির্ভর করবে। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সৃষ্টি করার সময় পৃথিবীতে আশরাফুল মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে প্রেরণ করেছেন। সাধারণ মানুষের এই কাপুরুষতা দেখে হয়তোবা তিনি বলবেন, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ রূপ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম এখন দেখলে তাদেরকে কীটপতঙ্গ মনে হয়। হাত আছে ভিক্ষা চাওয়ার জন্য, মুখ আছে আহাজারি করার জন্য। করে নিব, কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো না।

কেনো করবো, আমরা সাধারণ মানুষ দু-বেলা, দু-মুঠো খেঁয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাই। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ আমার পরিবারের কারোর সাথে সমস্যা না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিবাদ করবো না। যদি কেউ আমার সামনে অন্যের বোনকে ধর্ষণও করে নেয় তাও প্রতিবাদ করবো না যতক্ষণ পর্যন্ত আমার বোনের সাথে করবে না।

এটাই হলো আমাদের বর্তমান সমাজে বসবাসরত মানুষের অবস্থা।ন আমার খুব প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব মরহুম ড. আবুল কালাম স্যারের একটি উক্তি,‘যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয়, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ ক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে। তারা হলেন বাবা, মা এবং শিক্ষক।’ সমাজব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত জীবন চলার পথে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ বা আলাপচারিতা হয় যারা জীবনকে যার যার মতো করে উপলব্ধি করতে চায়। ছাত্রজীবনের পাশাপাশি যখন একজন শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্বটা পালন করতে পারি নিজের প্রতি সম্মানটা অনেক বেশি বেড়ে যায়। কারণ আমি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে অবিচল।

শিক্ষার্থী: সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট
ছাত্র সংগঠক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।