বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

তিন দশক ধরে শিক্ষার আলো জ্বালাচ্ছেন ৪ শিক্ষক!



আসহাবুর ইসলাম শাওন, কমলগঞ্জ থেকে:: দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন কমলগঞ্জ উপজেলার জশমতপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষক। শিক্ষকদের নিজস্ব অর্থায়নে টিনসেড ঘরে নির্মিত বিদ্যালয়টিতে এলাকার সন্তানরা শিক্ষা লাভের সুযোগ পেলেও কোনরূপ বেতনভাতা নেই শিক্ষকদের।

বিদ্যালয়টি রেজিষ্ট্রেশন কিংবা জাতীয়করণেরও মুখ দেখেনি। ফলে মানবেতর জীবন যাপন করছেন শিক্ষকরা। জানা যায়, ১৯৯৬ সনের ১৩ এপ্রিল চট্রগ্রাম বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের পক্ষে সহকারী পরিচালক মো. শাহজাহান সরকার (২৯১/রেজি:/১৩/১৭৬৩ স্মারকমূলে) জমির খারিজ, বিদ্যালয় গৃহের ছবিসহ সকল কাগজপত্রাদি প্রেরণের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে প্রতিবেদন প্রদানের নির্দেশ দেন। এরপর আর কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।

সরেজমিন দেখা যায়, জীর্ণ টিনের ঘর, বাঁশের বেড়া, ভাঙা দরজা-জানালা, চেয়ার-টেবিল ব্রেঞ্চের সংকটাপন্ন পরিবেশে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগের এ যেন এক বিচ্ছিন্ন পাঠশালা। উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের জশমতপুর গ্রামে ১৯৯১ সনে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে ৪ জন শিক্ষিক নিয়োগ দেয়া হয়। বিগত ২৭ বছর ধরে তারা পাঠদান করছেন। বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে ১৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষকদের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও টিনশেডের ঘরটি অর্থাভাবে আর সংস্কার সম্ভব হয়নি। চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চসহ আসবাবপত্র, শিক্ষার্থীদের সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের সমস্যাও রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী হতদরিদ্র পরিবারের হলেও সরকারি উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিপন মিয়া, তাইয়্যা হোসেন, সামা বেগম জানায়, ‘বৃষ্টি হলে পানি পড়ে বইপত্র ভিজে যায়। জোরে বাতাস শুরু হলে স্যারেরা আমাদের ছুটি দিয়ে দেন।’ স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, খতিজা বিবি ও আব্দুল গফুর এর ৩৩ শতক ভূমির উপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের ভবন হবে, শিক্ষার্থীরা সুন্দর পরিবেশে পাঠদানের সুযোগ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এ আশায় বুক বেঁধে পাঠদান করছেন শিক্ষকরা।

জাতীয়করণের আশায় পাঠদান করলেও আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে হতাশ শিক্ষক ও অভিভাবকরা। জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বগতিতে কোন ধরণের বেতন ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক আব্দুল ওয়াহিদ জানান, প্রতিবছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাশ করছে। সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুস শহীদ এমপি, সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দ মহসীন আলী এমপি’র সুপারিশসহ বিদ্যালয়টি জাতীয়করণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এরপরও অদ্যাবধি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ না হওয়ায় ২৭ বছর ধরে আমরা ৪ শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছি। দ্রুত বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। কমলগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এ বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়ে আসছে।

বিদ্যালয়ের আশপাশে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় এটি জাতীয়করণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আগামী শিক্ষা কমিটির মাসিক সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, বিষয়টি অমানবিক। আমি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে আমি সাধ্যমত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। জাতীয়করণ দীর্ঘদিনেও কেন হলো না বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।