শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শব্দ দূষন, পাথরের স্তুপ, ধুলো বালুর মাঝখানে কানাইঘাটের বাজেখেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়



আলিম উদ্দিন, কানাইঘাট থেকে:: বিদ্যালয়ের পিছনের দেয়ালের সঙ্গে পাথরের স্তুপ, সামনের আঙ্গিনা দিয়ে পাথর ভর্তি ট্রাক্টর- ট্রলির অবাধ যাতায়াত, শ্রেনী কক্ষের চেয়ার-টেবিলে ধুলো-বালু, বিদ্যালয়ের আশে পাশে সারাদিন গাড়িতে পাথর লোড আনলোডের শব্দ, পাথর শ্রমিকদের সুর-চিৎকার।

সব মিলিয়ে এক ভুতুড়ে অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছে কানাইঘাট উপজেলার ১নং লক্ষীপ্রসাদ পুর্ব ইউপির বাজেখেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম। এছাড়া বিদ্যালয়ের ভূমি দাতাদের প্রভাব, ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তদের অসহযোগিতা, অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতা, শিক্ষিকাদের স্থানীয় প্রভাব, ছাত্র/ছাত্রীদের অনুপস্থিতি সহ শিক্ষিকাদের ঘনঘন অনুপস্থিতির কারণে বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আসবাবপত্র থাকার পরও লেখাপড়ার নাই কোন পরিবেশ বলে অনেকেই জানিয়েছেন।

জানা যায়, ১৯৯৪ সালে স্থানীয় বাজেখেল, ছতিপুর ও মেছা গ্রামের ছাত্র/ছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য এলাকার সচেতন মহল উক্ত বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর লেখাপড়ার মান ও রিজাল্ট ভাল থাকায় বিদ্যালয়টি সরকারী করণ করা হয়। এলাকাবাসী জানান, বিদ্যালয়ের পার্শ্বেই লোভানদী থাকায় এলাকার কিছু লোকজন লোভাছড়া পাথর কোয়ারী থেকে পাথর উত্তোলন করে বিদ্যালয়ের দেওয়াল ঘেঁষে প্রতি বছর পাথর স্টক করে রাখে।

যার কারণে বিদ্যালয়ের ৬৬ শতক জায়গার মধ্যে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তায় নেই কোন ভাউন্ডারী। বিদ্যালয়ে একটি সৌচাগার থাকলেও টিউবওয়েল না থাকায় পানী নেই অজুহাত দেখিতে সৌচাগারটি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা (চলতি দায়িত্বে) মুর্শিদা বেগম বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে ৫ জন শিক্ষিকা রয়েছেন। এছাড়া বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় ১৩৫ জন ছাত্র/ছাত্রী আছেন। তিনি বলেন, তার বাড়ী একই উপজেলার সাতবাঁক ইউপির চরিপাড়া গ্রামে। তিনি বাড়ী থেকে সুরমা নদী পার হয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁঠে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসেন।

তাই অনেক সময় তিনি বিদ্যালয়ে এসে উপস্থিত হতে তার দেরি হয়ে যায়। এছাড়া বাকি ৪ জন শিক্ষিকা হলেন ছতিপুর গ্রামের মনোয়ারা বেগম-১, মনোয়ারা বেগম- ২, (তারা দু’জনই একই পরিবারের) কান্দলা গ্রামের জাহানারা বেগম ও শামীমা আক্তার সুমি। তিনি বলেন, তারা প্রতিদিন নিয়মিত স্কুলে গেলেও বিদ্যালয় এলাকার অভিভাবকরা সচেতন না থাকায় তাদের বাড়ী বাড়ী গিয়েও অনেক সময় ছাত্র/ছাত্রীদের ক্লাসে এনে উপস্থিত করানো যায়না। তিনি বলেন, ওয়াশ ব্লকের পক্ষ থেকে বিশুদ্ধ পানীর জন্য ২০ লাখ টাকার একটি ভবন প্রক্রিয়া দিন রয়েছে। ভবনটি না আসলে বিশুদ্ধ পানী পাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই।

গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১১টায় সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জাহানারা বেগম, মানোয়ারা বেগম-২, এবং শামীমা বেগম সুমি জরুরী কানাইঘাটে রয়েছেন। তাই তারা বিদ্যালয় থেকে আগেই ছুটি নিয়েছেন। এছাড়া দুপুর ১২টায় প্রধান শিক্ষিকা মুর্শিদা বেগম বিদ্যালয়ে এসে উপস্থিত হয়েছেন।

শুধু মনোয়ারা বেগম-১ বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। ক্লাশে গিয়ে দেখা যায়, প্রাক ওয়ানে ১ জন, ক্লাশ ওয়ানে ২ জন, ক্লাশ টু তে ২ জন, ক্লাশ ত্রী তে ২, ক্লাশ ফো’রে ২ জন, ক্লাশ ফাইভে ২ জন। সব মিলে বিকাল ২টা পর্যন্ত সর্বমোট ৬ ক্লাশে ১১ জন ছাত্র/ছাত্রী উপস্থিত হয়েছেন। বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় কখনো সমাবেশ হয়েছে বলে ছাত্র/ছাত্রীরা জানে না। ছাত্র/ছাত্রীদের হাতে মূখে ধুলো-বালু। এছাড়া তাদের গায়ে নেই কোন স্কুল ড্রেস। বিদ্যালয়ের ১ রোমে প্রাক ১ থেকে ক্লাশ ২ পর্যন্ত মোট ৫ জন এবং অপর রোমে ক্লাশ ত্রী থেকে ফাইভ পর্যন্ত মোট ৬ জন ছাত্র/ছাত্রী রয়েছেন। অতচ খাতা পত্রে শত ভাগ উপস্থিতি রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সমসের আলম বলেন, বিদ্যালয়ের ৬৬ টি শতক জায়গা চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় ৮০ লাখ টাকার একটি দ্বিতল ভবনের মাটি পরিক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। বিদ্যালয়ের অপর দাতা সদস্য আমির হোসেন বলেন, গ্রামে কোন মরা মৃত্যু, বিয়ে-সাদী, কিংবা কারো বাড়ীতে শিরণী হলে বিদ্যালয়ে ছাত্র/ছাত্রী কম আসে। তাই বৃহস্পতিবার সকালে বাজেখেল গ্রামের এক হুজুর মারা যাওয়ায় ঐদিন বিদ্যালয়ে ছাত্র/ছাত্রী কম হয়েছে।
এলাকাবাসী বাজেখেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানায় পাথর স্টক বন্ধ করে বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার সুষ্ট পরিবেশ তৈরি করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের কাছে জোরদাবী জানিয়েছেন।