বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ঈমানের দাবীদারদের কাফির বলা থেকে বিরত থাকি: মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান



আমাদের কিছু ভাইয়েরা কথায় কথায় তাদের মতাদর্শের বিপরীত ভাইদের কাফির ফতওয়া দিয়ে থাকেন। মুহুর্তের মধ্যে তাদের ঈমানের গন্ডি থেকে বের করে দেন। অবাক লাগে তাদের সাহস আর ঈমানের জোর (!) দেখে। আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন মানুষকে কাফির থেকে মুমিন বানানোর জন্য, আর আমাদের কুফরী প্রডাকশন কোম্পানীর এসকল ভাইয়েরা মানুষকে সেকেন্ডের ব্যবধানেই মুমিন থেকে কাফির বানিয়ে দেন।

এ কোম্পানীর শ্রমিকদের কাছে জানতে খুবই ইচ্ছা হয়, ভাই! জীবনে তো অসংখ্য মুসলমানকে কাফির বানিয়েছেন, দয়া করে বলবেন কি, কয়টা কাফিরকে মুসলমান বানিয়েছেন? এসকল তাকফীরী ভাইদের জন্য খুবই আফসোস হয় প্রিয় নবীর সতর্কবাণী পড়ে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِذَا كَفَّرَ الرَّجُلُ أَخَاهُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا (إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلا رَجَعَتْ عَلَيْهِ)
‘‘যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফির বলে, তবে এ কথা দু জনের একজনের উপর প্রযোজ্য হবে। যদি তার ভাই সত্যিই কাফির না হয় তবে যে তাকে কাফির বললো তার উপরেই কুফরী প্রযোজ্য হবে।
মুতাওয়াতির পর্যায়ের এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী।

ঈমানের দাবিদারকে কাফির বলতে নিষেধ করে মহান আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا
‘‘হে মুমিনগণ, যখন তোমরা আল্লাহর পথে যাত্রা করবে তখন যাচাই করবে এবং যে ব্যক্তি তোমাদেরকে সালাম দেবে তাকে বলবে না যে, ‘তুমি মুমিন নও।

আমাদের সকলের মনে রাখা আবশ্যক, কুফরী কাজ করা আর কাফির হওয়া এক বিষয় নয়। কোন মুসলমান কুফরী কাজ করলেই সে কাফির হয় না। প্রকাশ্যভাবে কোন মুসলমান থেকে কুফরী কাজ প্রমাণিত হলেও তাকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন ছাড়া কাফির বলা যাবে না।
বুখারী শরীফে এসেছে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে হাতিব ইবনে আবী বালতাআ (রা) যুদ্ধের গোপন বিষয় ফাঁস করে মক্কার কাফিরদের নিকট একটি পত্র লিখেন। পত্রটি উদ্ধার করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতিব (রা)-কে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন যে, মুনাফিকী বা কুফরীর কারণে তিনি এরূপ করেন নি, বরং নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে এরূপ করেছেন।

হযরত হাতিব (রা.) এর কাজটি বাহ্যত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে খিয়ানতের শামিল, যা স্পষ্ঠত কুফর ছিল। এজন্য উমার (রা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিককে হত্যা করি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়ে হাতিবের বক্তব্যকেই চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করেছেন।

কেননা বাহ্যত তার কাজ কুফরী হলেও মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লামের সাথে খেয়ানত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। তাই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ভর্ৎসনা করেন নি।
হযরত হাতিব রা. এর কাজ কুফরী ছিল ঠিক কিন্তু তার কাছে এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছিল। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দোষারূপ করেন নি।
হাদীসে এরকম আরো অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

মুসলিম শরীফে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: একব্যক্তি জীবনভর সীমালঙ্ঘন ও পাপে লিপ্ত ছিল। যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো তখন সে তার পুত্রদেরকে ওসিয়ত করে বললো: আমার মৃত্যু হলে তোমরা আমাকে আগুনে পুড়াবে। এরপর আমাকে বিচুর্ণ করবে। এরপর ঝড়ের মধ্যে আমাকে (আমার দেহের বিচুর্ণিত ছাই) সমূদ্রের মধ্যে ছাড়িয়ে দেবে।

কারণ, আল্লাহর কসম, যদি আমার প্রতিপালক আমাকে ধরতে সক্ষম হন তবে আমাকে এমন শাস্তি দিবেন যে শাস্তি তিনি অন্য কাউকে দেন নি। তার সন্তানগণ তার ওসিয়ত অনুসারে কর্ম করে। তখন আল্লাহ যমিনকে নির্দেশ দেন যে, যা গ্রহণ করেছে তা ফেরত দিতে। তৎক্ষণাৎ লোকটি পুনর্জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হয়ে যায়। তখন তিনি লোকটিকে বলেন: তুমি এরূপ করলে কেন? লোকটি বলে: হে আমার প্রতিপালক: আপনার ভয়ে। তখন আল্লাহ তাকে এজন্য ক্ষমা করে দেন।

হাদীসে বর্ণিত অবস্থায় লোকটির উপর কুফরী ফতওয়া প্রজোয্য। কেননা সে ধারণা করেছে যে, তার দেহ এভাবে পুড়িয়ে ছাই করে সমূদ্রে ছড়িয়ে দিলে আল্লাহ তাকে আর পুনরুজ্জীবিত করতে এবং শাস্তি দিতে পারবেন না। আর আল্লাহর ব্যপারে এরকম বিশ্বাস রাখা কুফরী। কিন্তু তারপরও আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন, কেননা তার এ ধারণা ছিল অজ্ঞতা প্রসূত। আল্লাহর কুদরতকে অস্বীকার করা বা সন্দেহ করার বিন্দুমাত্রও মনোভাব তার ছিল না।

কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে মুসলিম দাবি করে এবং ইসলামের ব্যাহ্যিক কিছু কাজগুলো করে তবে তাকে মুসলিম বলে গণ্য করতে হবে এবং লোকটি থেকে কুফরী কোন কিছু প্রকাশিত হলে তার কোনো ওযর আছে বলে ধরে নিতে হবে। বাহ্যিকভাবে একটি কর্ম সুনিশ্চিত কুফর হতে পারে। তবে এরূপ কর্মে লিপ্ত মুমিন যদি এর কোনো ওযর বা ব্যাখ্যা দেন তবে তা গ্রহণ করতে হবে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উলামায়ে কিরাম তাকফীর তথা কাউকে কাফির ফতওয়া প্রদানের কিছু মূলনীতি পেশ করেছেন। আমাদের সমাজে যারা কাফির ফতওয়া প্রদান করেন তারা আদৌ সেগুলো পড়েছেন কি না সন্দেহ হয়। সালফে সালেহীনের কেউই আহলে কিবলাহকে কাফির মনে করতেন না। ইমাম গাযযালী র. তার “কিতাবুত তাফরিকা বাইনাল ঈমান ওয়ায যানদাকা” কিতাবে বলেন- তাকফীর বা কাফির বলা মুর্খদের কর্ম।

মুর্খরা ছাড়া কেউ কাউকে কাফির বলতে ব্যস্ত হয় না। মানুষের উচিত সাধ্যমত কাউকে কাফির বলা থেকে বিরত থাকা। কিবলাপন্থীগণ যারা ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’’ বলে সাক্ষ্য দেন তাদের রক্ত ও সম্পদ নষ্ট করা কঠিন অপরাধ। ভুলক্রমে এক হাজার কফিরকে পরিত্যাগ করা ভুল করে একজন মুসলিমের প্রাণ বা সম্পদের সামান্যতম ক্ষতি করা থেকে সহজতর। …. কাফির বলার মধ্যে রয়েছে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি, আর নীরব থাকায় কোনোই ঝুঁকি নেই।’

ইমাম মুল্লা আলী কারী র. তার “শরহু ফিকহিল আকবার” এ বলেন- কোনো মুমিন যদি এমন কোনো কর্মে লিপ্ত হয় বা কথা বলে যা কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশ অনুসারে কুফর বা শিরক বলে গণ্য তবে তার কর্মকে অবশ্যই শির্ক বা কুফর বলা হবে, তবে উক্ত ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে কাফির বা মুশরিক বলার আগে দেখতে হবে যে, অজ্ঞতা, ব্যাখ্যা, ভুল বুঝা বা এজাতীয় কোনো ওযর তার আছে কিনা।

***প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা, পৃথিবীতে কাফিরের সংখ্যা না বাড়িয়ে আসুন মুমিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করি। কোন মুসলমানকে কাফির বলার আগে শতবার চিন্তা করি নবীর সতর্ক বাণিকে। আমরা যারা সাধারণ মুসলমান আছি; আলেম নই, আমাদের জন্য কোন মুসলমানকে কাফির বলা হারাম। তাকফীরের দায়িত্বটা আলেমদের উপর ছেড়ে দিন।

উলামায়ে কিরামের উচিত হলো, কাউকে কাফির ফতওয়া দিতে হলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আইম্মাদের মূলনীতিকে অনুসরণ করা। ঈমানের দাবীদার কউকে কাফির না বলে তার কর্মের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করুন। নির্দিষ্ঠভাবে কোন ব্যক্তিকে কাফির না বলে কুফরী কাজকে কুফরী বলার অভ্যাস করুন। আল্লাহ আমাদের সকলের ঈমানকে হেফাযত করুন। আমীন।