শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০ ২০
সম্পাদকীয় ডেস্ক
১৩ জুন ২০ ২০
৭:১৬ অপরাহ্ণ
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ: এস ডি সুব্রত

যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ ভাষা ও মননের ব্যবহার করে আসছে ।গবেষক সুকুমার সেনের মতে "মানুষের উচ্চারিত অর্থবহ বহুজনবোধ্য ধ্বনি সমষ্টি হচ্ছে ভাষা।"

          

            আমরা বাঙালি । আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষায় সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।ইন্দো- ইউরোপীয় ভাষা পরিবারে বাংলা ভাষার স্থান চতুর্থ এবং বিশ্বে ষষ্ঠ এবং ভাষা ব্যবহারকারী র সংখ্যা হিসেবে সপ্তম।

 

           মানুষের নিজের ভাষা তার কাছে মেঘগলা বৃষ্টির জলের মতো। বাঙলা ভাষা ছাড়া থেমে যায় বাঙালি র জীবন।ব্রাহ্মী লিপি থেকে বাংলা লিপি বা অক্ষর সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানা যায়। কোন ভাষাই শুধু নিজের ভাষা দিয়ে চলে না। দরকার হয় অন্য ভাষার শব্দ। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে প্রবেশ করেছে আরবী,ফারসি  ইংরেজি তুর্কি ভাষা।

 

         বিভিন্ন ভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে রুপ লাভ করেছে বাংলা ভাষা।এরিক লেনেবার্গ মত প্রকাশ করেন যে, "প্রাণিজগতের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এমন একটি মৌলিক জীবকোষগত রুপান্তর ঘটে যার ফলে একদিন মানুষ মননশীল প্রাণী হয়ে উঠে।এ থেকে বুঝা যায় যে আমরা যে ভাষায় কথা বলি তা আমাদের ই সৃষ্টি।"

 

               আমাদের   বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের

পশ্চিমবঙ্গ ,বিহার,ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা,, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ,আসামের দক্ষিণ আসাম ও বরাক উপত্যকার অঞ্চলের মানুষের ভাষাও বাংলা।সারা বিশ্বে বাংলা ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা প্রায় ত্রিশ কোটি।।

              বাঙালি সংস্কৃতির অধিকারী বাঙালি জাতি যে ভাষায় কথা তাই বাংলা ভাষা।

 

         আমরা যে ভাষায় কথা বলি অনেক আগে  তা আজকের মত ছিল না। অনেক আগে যখন বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিল এ ভাষা ছিল অধোঘটিত। হটাৎ বাঙলা ভাষার সৃষ্টি হয়নি। ভাষা বদলায় মানুষের কন্ঠে।অনেকের মতে আমাদের পুরনো ভাষাটির নাম ছিল প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা। এটা পরিবর্তন হয়ে রুপ নেয় পালি।তা থেকে প্রাকৃত। শেষে আমাদের বাঙলা ভাষা।

        হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে রূপান্তর  হয়ে বঙ্গীয় অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিল এক মধুর বিদ্রোহী কোমল ভাষা ।তার নাম বাংলা ভাষা।তখন এ ভাষাকে বলা হতো প্রাকৃত, কখনো গৌড়ীয়, কখনো বাঙলা।এখন বলা হয় বাংলা। বাংলার প্রাচীন তম অধিবাসীরা  সম্ভবত ছিল অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর অস্ট্রো এশিয়াটিক জাতির মানুষ। তারা ব্রহ্মদেশ ও শ্যামদেশের  মোন ও কম্বোজের খের শাখার মানুষের আত্মীয়। তাদেরকে বলা হতো নিষাদ। পরবর্তীতে কোল্ল ভিল্ল ইত্যাদি। এছাড়া ছিল দ্রাবিড় গোষ্ঠী। তারা ছিল সুসভ্য জাতির মানুষ। তাদের আভাস ছিল দাক্ষিণাত্য। তাছাড়া ছিল মঙ্গোলিয় গোষ্ঠীর জাতি। সম্ভবত এদের কিরাত জাতি বলা হতো।

 

         অষ্ট্রিক দ্রাবিড় মঙ্গোলিয় ভাষা গোষ্ঠীর পর যে নতুন ভাষা বাংলায় প্রবেশ করে তারা হল আর্য। আর্য দের ভাষা বৈদিক।স্ংস্কারের ফলে বৈদিক ভাষা র নাম হয় সংস্কৃত। সংস্কৃত হতে য় প্রাকৃত। প্রাকৃত হতে অপভ্রংশ। অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি।

 

         কারো মতে আমাদের পূর্বপুরুষ ছিল সিংহলী ভেড্ডা। আমাদের শরীরে তাদের রক্ত মিশে আছে।ভেড্ডা রক্তধারার সাথে মিলিত হয় আরেকটি রক্তধারা।তা হলো মঙ্গোলিয়।এরপর বাঙালি রক্তধারার সাথে মিলিত হয়েছে আরেকটি রক্তধারা।সেটি হল ইন্দো আর্য।

 

         কোন কোন গবেষকের মতে বাংলা ভাষা ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার শাখা থেকে  উৎপত্তি লাভ করেছে।ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা গুলোর সীমা একদিকে ভারত অন্য দিকে ইউরোপ। ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর একটি দল প্রথমে ইরান ও পরে ভারতে উপনিবেশ স্থাপন করে।ইরানীয় ভাষায় প্রাচীন ভাষার গঠন সংরক্ষিত থাকায় পরবর্তী যে সংস্কৃত ভাষার প্রাচীন ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা পূনঃগঠনে বিশেষ সহায়তা করে। ভারতীয় আর্য ভাষার প্রাচীন নমুনা ঋগ্বেদে সংরক্ষিত আছে। আর্যগন ১২০০- ১৫০০ খ্রীষ্টপূর্ব পর্যন্ত তিনশ' বছর ভারতে যে ভাষা ব্যবহার করত  তাই প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা। আর্য হচ্ছে একটি প্রাচীন জাতি বিশেষ। আর্যগন প্রথমে পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করত। এরা ছিল উন্নত জাতি গোষ্ঠী। তাদের নিজেদের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল।এদের অবস্থান ছিল মধ্য ইউরোপে। খ্রিপূ ১৪০০ সালে এরা ভারতবর্ষে আসে।ভারতীয় তথা অনার্য জাতির সাথে মিশে ই তৈরি হয় প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে আধুনিক ভারতের বাংলা সহ বহু আঞ্চলিক ভাষার উদ্ভব হয়। বাংলা কে ভারতীয় আর্য ভাষার সূদূর বংশ ধর বলা হয়।

 

       প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার জীবনকাল প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর।এর তিনটি পর্ব।

  ১। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা

  ২ । মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা

  ৩। নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা

 

      প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা কে সংস্কৃত ভাষা বলা হয়। সংস্কৃত ভাষা চারশ খ্রি পূর্বাব্দে প্রচলিত।ঋগ্বেদের ভাষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থেকে সংস্কৃতের জন্ম হয় ।

        মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা কে সাধারণত প্রাকৃত ভাষা বলা হতো। আনুমানিক ষষ্ঠ শতকে প্রাকৃত ভাষার উদ্ভব বলে মনে করা হয়। বৈদিক ভাষা বিবর্তনকালীন সময় দেশের জনসাধারণ যে ভাষায় নিত্য কথা বলত তাই প্রাকৃত ভাষা। মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার প্রথম স্তরের একটি ভাষা হল পালি।পালি হল সংস্কৃত ও প্রাকৃতের মাঝামাঝি একটি স্তর । অনেক ভাষা তত্ত্ববিধ পালিকে প্রাকৃতর প্রাথমিক রুপ বলে মনে করেন।

 

           প্রাকৃত ভাষার শাখা গুলোর মধ্যে একটি ছিল মাগধী।মগধ অঞ্চলের প্রাকৃত ভাষা কে বলা হতো মাগধী।

          প্রাকৃতের শেষ পর্বে র দুটির একটি হচ্ছে অপভ্রংশ। প্রাকৃত ভাষা বিবর্তিত হয়ে যে ভাষায় জন্ম তাই অপভ্রংশ। বাংলা ভাষার উদ্ভব অপভ্রংশ থেকে এ কথা আজ সর্বজন স্বীকৃত। জর্জ গিয়ারসনের মতে বাংলা এসেছে মাগধী অপভ্রংশ থেকে। মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ র মতে বাংলার উদ্ভব গৌড়ীয় অপভ্রংশ থেকে। আবার কারো মতে বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা , অন্যভাবে সংস্কৃত ই বাংলা ভাষার জননী।

 

        মাগধী অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি এ মতের সাথে জর্জ গিয়ারসন, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও দ্বিজেন্দ্র নাথ বসু একমত। সুতরাং বলা যায় যে মাগধী অপভ্রংশ থেকে ই বাংলা ভাষার উৎপত্তি।

 

লেখক: কবি গীতিকার ও কলামিস্ট।

           পরিদর্শক,জেলা সমবায় কার্যালয়, সুনামগঞ্জ।

 

তথ্যসুত্র:১। বাংলা সাহিত্যের কথা- মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

             ২।কতো নদী সরোবর- হুমায়ূন আজাদ।

              ৩। সাহিত্য ও সংস্কৃতি- আহমদ শরীফ।

             ৪। লাল নীল দীপাবলি- হুমায়ূন আজাদ।

              ৫। ভাষা শিক্ষা- হায়াৎ মামুদ।

 

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য