বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

নকল ঔষধে প্রতারিত সিলেটবাসী চিকিৎসায় প্রতারণা: অনুসন্ধানী পর্ব-১



জাবেদ এমরান:: বিভাগীয় শহর হওয়ায় সিলেটে চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুঁটে আসছেন নানা রোগে আক্রান্ত রোগীরা। ডাক্তার দেখিয়ে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ি ঔষধ কিনে হচ্ছেন প্রতারিত। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়িরা অধিক মুনাফার লোভে বিক্রি করছেন নকল ঔষধ। রোগ তো কমছেই না বরং মানুষ ঝুঁকছেন মৃত্যুর দিকে। জীবনরক্ষাকারি ভেজাল ঔষধ খেয়ে কিডনি বিকলসহ জটিল ও কঠিন অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে নিভে যাচ্ছে জীবন প্রদীপ। সে হিসেব নেই কোনো সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের কাছে।

নগর ঘুরে অনুসন্ধানে জানা যায়, নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারিরা বাজারে নামি ব্র্যান্ডের ওষুধের মোড়ক, প্যাকেট ও বোতল নকল করে হুবহু ওষুধ তৈরি করছেন। দেশের কয়েকটি কোম্পানীতে উৎপাদন করা হচ্ছে নকল ওষুধ। এসব ঔষধে সিলেটের বাজার এখন সয়লাব।

লাভ বেশি হওয়ায় ভেজাল ঔষধ বিক্রি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছেন মুনাফা লোভী ফার্মেসীর মালিকরা। সম্প্রতি সিলেটের এক কোম্পানির ঔষধ হুবহু নকল করে পুলেরমুখের মৌবন মার্কেটের এক ফার্মেসীতে বিক্রি হচ্ছিল। ওঁত পেতে থাকা কোম্পানির লোকজন বিক্রিকালে হাতেনাতে ধরে মার্কেট ব্যবসায়ি সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে ডেকে আনেন। তাদের উপস্থিতিতে কয়েক কার্টুন নকল ঔষধ জব্দ করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময়কার ছবিসহ প্রমান এ প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। এভাবে ফার্মেসী চক্র ভেজাল ঔষধ কম দামে ক্রয় করে তা বেশি দামে বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

জানা যায়, পাইকারি মূল্য অত্যাধিক কম হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ি নিম্নমানের ওষুধ ক্রয়-বিক্রিয়ে জরিত রয়েছেন। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধের নাম লেখা থাকে তারা তা না দিয়ে রোগীকে একই ওষুধ, একই গ্রুপ বলে নিম্নমানের বা নকল ওষুধ কিছু টাকা কমিশনের নামে ছাড় দিয়ে বিক্রি করছেন।

বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে এমন ধরনের বিভিন্ন প্রকার ভেজাল ও নকল অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, ক্যালসিয়াম, শক্তিবর্ধক ও অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের পরিমাণ বেশি। এদিকে নকল ও ভেজাল ওষুধে বাজার সয়লাব হওয়ায় রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি আসল ওষুধের দামে নকল ওষুধ কিনে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা দিনদিন বাড়ছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বিক্রি হওয়া ইনজেকশনের মধ্যে নকল হচ্ছে হাইড্রোকরটসিন, মিথাইল প্রডেনিসোলসহ নানা নামের ইনজেকশন। আর নকল ওষুধের মধ্যে বেশি তৈরি হচ্ছে হরমোলিড, বায়োজেন, রেনিটিডিন, মাই গ্লোড, সাসটনসহ বিভিন্ন নামের ওষুধ। মাঝে মধ্যে সিলেট শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পারিচালনা করে অর্থদন্ড দিলেও বন্ধ হচ্ছেনা নকল ঔষধ বিক্রি। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত তদারকি ও নজরদারির অভাবে শহরের ফার্মেসিগুলোর নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খেয়ে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে।

সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার পুলেরমুখের ঔষধের পাইকারী মার্কেট, স্টেডিয়াম মার্কেট, ওসমানী মেডিকেল রোড, টিলাগড়সহ নানাস্থানে নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি হচ্ছে বলে কয়েকটি ঔষধ কোম্পানির মার্কেট প্রতিনিধি ও ফার্মেসী ব্যবসায়িরা জানিয়েছেন। তারা আরো বলেন, পাইকারি বাজার থেকে সস্তায় কার্টুন কার্টুন ভেজাল ঔষধ কিনে নগরীর পাড়া-মহল্লার দোকানে ও গ্রাম-গঞ্জের বাজারেও বিক্রি হচ্ছে।

যে দল ক্ষমতায় যায় সে দলের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে একটি সিন্ডিকেট মহল দীর্ঘদিন থেকে করে যাচ্ছে নকল ও ভেজাল ঔষধের ব্যবসা। তাদের সাথে সরকারের ঔষধ সংশ্লিষ্ট বিভাগের হাতেগুনা কয়েক অসাধু কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততারও অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে অভিযানের আগেই মুঠোফোনে সতর্ক বার্তা পৌছায় অনেক অসাধু ফার্মেসী মালিক রয়ে যান ধরা ছুঁয়ার বাহিরে।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে আড়াই লাখের বেশি ওষুধের দোকান থাকলেও রেজিস্টার্ড প্রায় ৬০ হাজার দোকানে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল, নকল, নিম্নমানের ওষুধ। তার মধ্যে বেশি বিক্রি হয় সিলেট নগরে। ভেজাল ওষুধের মধ্যে আটা, ময়দা, চিনি, বেসন, ক্ষতিকারক রং, বিভিন্ন প্রকার বিষাক্ত কেমিক্যাল, সোডা, পানি মিশিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল ও সিরাপ তৈরি হচ্ছে।

আর সেগুলো জনগনের হাতে তুলে দিচ্ছে প্রতারক ফার্মেসী মালিকরা। কোন কোন ফার্মেসীতে সরকারি হাসপাতালগুলোর বিনামূল্যের ওষুধও বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে নকল ওষুধ সেবনে জনগনের বিরাট ক্ষতি হতে থাকবে।

এ বিষয়ে সিলেট ড্রাগনিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ড্রাগ সুপারেন্টেন্ড শফিকুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, অভিযান পরিচালনা করে ভেজাল ঔষধ বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আপনার কাছে তথ্য থাকলে দিয়ে সহযোগীতা করবেন, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। অসাধু ব্যবসায়িদের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা ও অভিযানে আগে খবর ফাঁস হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, এ সব কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

UA-126402543-3