বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সংবাদ সম্মেলনে: এমপি মানিক রাজাকারের সন্তান তার ভাই সকল অপকর্মের হোতা



ফারুক হত্যা মামলা তদন্তে তারা অন্তরায়
ডেস্ক রিপোর্ট:: ছাতক-দোয়ারাবাজার আসনের এমপি মুহিবুর রহমান মানিক ও তার ভাই ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লালকে নব্য আওয়ামী লীগার এবং দল ও ফারুক হত্যা মামলার অন্তরায় বলে দাবি করেছেন দুই উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, এমপি মানিক রাজাকারের ছেলে। তার পিতা শান্তি কমিটির সদস্য ও জামায়াতের রোকন ছিলেন।

তার ভাই বিল্লাল তার সকল অপকর্মের হোতা। আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হত্যা মামলা থেকে নিজেদের বাঁচাতে উপজেলার রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ছাতক পৌরসভার মেয়র কালাম চৌধুরী ও সংসদ সদস্য পদে মনোনয়র প্রত্যাশী শামীম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন। এমপি মানিক দলের জন্য কাজ না করে নিজের উন্নয়নে কাজ করছেন। দুই উপজেলায় বিসৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। রোববার সিলেট নগরীর একটি হোটেলে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তারা এ অভিযোগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য রাখেন, ছাতকের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক আবরু মিয়া তালুকদার। সংবাদ সম্মেলনে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, জেলা পরিষদের সদস্য, ওয়ার্ড কমিশনার ও ইউপি চেয়ারম্যনা উপস্থিত ছিলেন।

ছাতকে তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতা, আলোচিত ফারুক হত্যা মামলার পর এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের ভাই ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লাল ৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য দেন রোববার পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে মূলত তার জবাব দেন তারা। এতে উল্লেখ করা হয়, গত ২২ জুন দিবাগত রাতে র্দুবৃত্তরা নৃংশসভাবে কুপিয়ে ও গলা কেটে উত্তর খুমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমদকে হত্যা করে। ২৪ জুন তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা করতে গেলে মানিকের কারণে পুলিশ মামলা রেকর্ড করেনি। কারণ তার ভাই ছিল প্রধান আসামী।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ছাতকে ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনীতি করছেন আবুল কালাম চৌধুরী ও শামীম চৌধুরী। দীর্ঘদিনে তারা আজ একটি অবস্থান তৈরী করেছেন। যা নিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীতা নিয়ে শঙ্কায় আছেন মানিক। অথচ তাদেরকে বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগের লেবাসধারী। তারা যদি লেবাসধারী হন তাহলে দলের নেত্রী শেখ হাসিনা ও জননেতা আব্দুল হামিদ (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) তাদের বাড়িতে আসতেন না। ৮০’র দশকে কালামের বড় ভাই শাহজাহান চৌধুরী এমসি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তাদের চাচা ছাতক উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান সুজন মিয়া চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর লেটার প্রেসে প্রকাশ করা ছাতক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কামান্ডার রহিম উদ্দিনের একটি প্রকাশনায় যে কয়েকজন সাহায্য-সহায়তাকারীর নাম রয়েছে তার মধ্যে সুজন চৌধুরী অন্যতম। অথচ তাকে রাজাকার হিসেবে দাবি করেন বিল্লাল।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ১৯৯৯ সালে ছাতকে এমপি মানিকের বাসায় বোমা বিস্ফোরণের মধ্যদিয়ে ছাতকে অপরাজনীতি শুরু হয়। দেশবাসী মানিককে কি হিসেবে চেনে তাও সকলে জানেন। কালাম-শামীমের পরিবারকে চিরতরে শেষ করতে মানিক বোমা বানিয়েছিলেন। সেই মানিক ৯১ সালে ছাতকে আওয়ামী লীগের অফিসে (কালাম চৌধুরীর বিল্ডিং) গণতন্ত্রী পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। অথচ কালাম-শামীমের পরিবারকে নব্য আওয়ামী লীগার ও রাজাকারের পরিবার দাবি করা হয়েছে। মানিকের পিতা কলমদর আলী শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।

অনেক মা বোনের ইজ্জত লুন্টন ও অসংখ্য বাড়ি-ঘর লুটপাট তার দ্বারা হয়েছে। স্বাধীনতার পর তিনি জামায়াতের রুকন ছিলেন। মানিক তিনবারের এমপি হলেও তার পরিবারে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীও নেই। তার ভাই মুজিবের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা রয়েছে। তার ভাগনা ধারন গ্রামের আব্দুল আলিম বিয়ানীবাজার থানার একটি ধর্ষণ মামলার আসামী। বিল্লাল ইউনিয়ন পরিষদের চাল পাচারকালে গোবিন্দগঞ্জে তার ট্রাক আটক করেছিল ট্রাফিক পুলিশ। কিন্তু আটকের কারণে সেই ট্রাফিক পুলিশকে প্রত্যাহার হতে হয়েছিল। মানিক গত ১০ বছরে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। সর্বশেষ গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানে বরাদ্ধকৃত টাকার মধ্যে ৩৪ কোটি টাকাই তিনি ঘুষ নেন। তার ভাই বিল্লালের বিয়েতে উপহার হিসেবে ২৫ টন চাল প্রদান করেন। সিমেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে কোটি কোটি টাকা বানিজ্য করছেন এমপি মানিক।

সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারা) আসনের আওয়ামী লীগের এমপি মানিক ও তার লোকজন নিজেদের পকেটভারি করতে ব্যস্ত রয়েছেন দাবি করে বলা হয়, গত ৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে বিল্লাল আহমদ যে বক্তব্য দিয়েছেন তা জঘন্য মিথ্যাচার। নিহত ফারুক একসময় এমপি বলয়ের কর্মী ছিলেন ঠিকই। নানাভাবে নির্যাতন ও হয়রানীর শিকার হয়ে তিনি আবুল কালাম চৌধুরী ও শামীম চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করেন। ফারুকের স্ত্রী দায়ের করা মামলার এজাহারে যাদেরকে আসামী করেছেন তাদের মধ্যে ৪ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। যদি এজাহার অনুযায়ী আসামী গ্রেফতার করা হয় তা হলে ১ নং আসামী বিল্লালকে গ্রেফতারে বাধা কোথায়? মামলাটি বাদির আবেদনের প্রেক্ষিতে পিবিআই এ স্থানান্তর করা হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, শনিবার পিবিআই ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেছে। মামলাটি পিবিআই-এ স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়।

ফরুরক হত্যার পর আজ পর্যন্ত ফারুকের পরিবারকে সাহায্য করাতো দুরের কথা, সহানুভ’তিটুকু জানাননি এমপি ও তার ভাই এমন দাবি করে বলা হয়, গত ইউপি নির্বাচনে ছাতকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত ৫ ইউপি চেয়ারম্যান তার বিরোধী বলয়ের হওয়ায় তাদেরকে নানাভাবে বঞ্চিত করছেন। এমনকি সিংচাপইউড় ইউপি চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন সাহেলকে সম্প্রতি অপহরণ করানোর পেছনেও তাদের হাত ছিল। এমপির কথামত কাজ না করায় দোয়ারাবাজারের ইউপি চেয়ারম্যান মামুনের বিরুদ্ধে চাদাবাজির মামলা করানো হয়েছে।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে কালাম ও শামীম চৌধুরীর পরিবার মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে বক্তব্যে বলার হয়, গত এক এগারোতে কালাম চৌধুরী ১৬ মাস জেলে ছিলেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ৮৭ সালে তিনি একমাস জেলও খাটেন। শামীম চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্য নানা নির্যাতন সহ্য করেছেন। অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় তাদের মা ইন্তেকাল করলে তার জানাযায় তারা উপস্থিত হতে পারেননি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো মামলায় আসামী হননি মানিক ও তার পরিবারের লোকজন। কারণ, তারা কোনো আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন না। এক এগারো’র সময় সংস্কারপন্থি ছিলেন মানিক। শেখ হাসিনা মাইনাস ফর্মুলায় ব্যস্ত ছিলেন। নৌকার বিরোধীতা করে গত উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী দিয়েছেন। ছাতক উপজেলার ৫ জন ও দোয়ারাবাজারে ১ জন ইউপি চেয়ারম্যান নৌকা নিয়ে জয়লাভ করেও এমপি মানিকের রোষানলে পড়েছেন। তারা উন্নয়ন বরাদ্দ পান অন্যদের চেয়ে কম।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, যখন কালাম চৌধুরী ছাতক পৌরসভার তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে চমক দেখান। পাশাপাশি ছাতক ও দোয়ারার প্রত্যন্ত অঞ্চললের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে সুসংগঠিত করেন শামীম চৌধুরী। তাদের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তৃণমূলের কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী ও তাদের উপর স্টিমরোলার চালানোর চেষ্টা করছেন মানিক ও তার ভাই। এরই ধারাবাহিকতায় ফারুককে হত্যা করা হয়। ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর ছাতকে ছাত্রলীগ নেতা মাসুদুল ইসলাম তালুকদারকেও হত্যা করে মানিকের কর্মীরা। মানিক ও বিল্লালের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় ২০০৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাতক প্রেসক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ইত্তেফাকের সংবাদদাতা আব্দুল আলীমের উপরও হামলা করা হয়। এমনকি সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করা প্রবীণ সাংবাদিক চান মিয়ার জায়গা সংক্রান্ত বিরোধে তাকে হয়রানীও করেন মানিক। সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতিবাজ ও দলের অন্তরায় উল্লেখ করে মানিক-বিল্লালরা যাতে ফারুক হত্যা মামলাকে প্রভাবিত না করতে পারে সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক আজমল হোসেন সজল, ছাতক পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহাব উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মৃদুল কান্তি দাস মিন্টু, ছাতক পৌর মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার অজয় ঘোষ, সাবেক কামান্ডার গোলাম মোস্তাক, নোয়ারাই ইউপি চেয়ারম্যান পীর আব্দুল খালিক রাজা, ছাতক ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম, কালরুকা ইউপি চেয়ারম্যান অদুদ আলম, গোবিন্দগঞ্জ-সৈয়দেরগাও ইউপি চেয়ারম্যান আখলাকুর রহমান, দোয়ারার সুরমা ইউপি চেয়ারম্যান খন্দকার মামুনুর রশিদ, ছাতকের প্যানেল মেয়র তাপস চৌধুরী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর নওশাদ মিয়া, দিলোয়ার হোসাইন, আখলাকুল আম্বিয়া, সুদিপ দে, লিয়াকত আলী, ধন মিয়া ও আছাব আলী, মহিলা কাউন্সিলর মিলন রানী দাস, সামসুন্নাহার বেগম, দোয়ারাবাজার আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক শামিমুল ইসলাম, জেলা পরিষদ সদস্য আব্দুস শহীদ মুফতি, উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক রোটারিয়ার আবুল হোসেন, উত্তর খুরমা ইউনিয়ন আওয়ামীগ সভাপতি আরশ আলী খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক আজাদ মিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল ইসলাম খান, নিহতের ভাই মানিক মিয়া ও আকিক মিয়া, পিপি অ্যাডভোকেট ছায়াদুর রহমান, প্রবাসী নেতা জয়নাল আবেদিন, আবু সাইদ চৌধুরী বাবুল, সুলেল মিয়া, শাহিন চৌধুরী প্রমুখ।

UA-126402543-3