শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

তাদের ওপর রাগ নেই, দুঃখবোধ আছে: জাফর ইকবাল



ডেস্ক নিউজ:: উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হয়ে যারা হামলা করেছে, তাদের ওপর কোনো রাগ পুষে রাখছেন না প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জাফর ইকবাল। বরং তাদের প্রতি করুণা হয় তার।

এটা ভেবে দুঃখ পান, পৃথিবীতে কত ভালো ভালো কাজ করার আছে, সেটা বাদ দিয়ে তারা এমন একটা কাজে নেমেছে, যেটা কোনা কল্যাণ বয়ে আনে না।

গত ৩ মার্চ নিজ কর্মস্থল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উগ্রপন্থী’ ফয়জুল হাসানের হত্যা চেষ্টা থেকে বেঁচে গেছেন জাফর ইকবাল। সেই রাতেই তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আর ১১ দিনের চিকিৎসা শেষে আজ বুধবার তিনি ছাড়া পেয়েছেন হাসপাতাল থেকে।

হাসপাতাল ছেড়েই শিক্ষার্থী অন্তঃপ্রাণ মানুষটি ছুটে যান সিলেটে তার ছাত্রছাত্রীদের কাছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানে উঠার সময় তিনি কথা বলেন গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে।

জাফর ইকবাল জানান তিনি ভালো আছেন। সেই কথাটি তিনি সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদেরকে বলবেন।

হত্যার চেষ্টা করেছে যারা, তাদেরকে আপনি কী বলবেন?- এমন প্রশ্ন ছিল জাফর ইকবালের কাছে।

জবাবে দেশ বরেণ্য এই শিক্ষক বলেন, ‘তাদের (হামলাকারী) জন্য আমার কোনো রাগ নেই। তাদের জন্য আমি এক ধরনের দুঃখ অনুভব করি।’

কী সেই দুঃখবোধ, তারও ব্যাখ্যা দেন জাফর ইকবাল। বলেন, ‘এত সুন্দর পৃথিবী, সেখানে এত সুন্দর সুন্দর কাজ করা সম্ভব, কিন্তু তারা সেগুলো না করে, এই ধরনের একটি কাজকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে এ জন্যই তাদের জন্য দুঃখবোধ করি।’

‘তাদের প্রতি আমার কোনো রাগ নাই। আমাদের বাংলাদেশটাকে এভাবে গড়ে তুলতে হবে এই ধরনের মানুষ যেন জন্ম না নেয়, বা তারা এই ধরনের পথে যেন না যায়। তারা যেন সুন্দর জীবন যাপন করতে পারে সাধারণ মানুষের মতো, এটাই সেটাই আশা করি’- স্বপ্নের কথা বলেন জাফর।

-হামলার কারণে কোনো ভয় কাজ করে কি না-এমন প্রশ্নও ছিল এক গণমাধ্যমকর্মীর।

জবাব আসে, ‘আমি জানি না, আমি হয়ত বোকা টাইপের মানুষ। আমার মধ্যে ভয় ভীতি কাজ করে না। আগেও করে নাই, ঘটনা যখন ঘটেছে সেই মুহূর্তেও করে নানি, পরেও করে নাই, এই মুহূর্তেও করছে না।…আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনও ভয় পাইনি, এখনও ভয় পাচ্ছি না।’

-এই ধরনের হামলা প্রগতিশীল আন্দোলনে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না?’

-‘না, না, না, না, না, বাধা আসবে কী জন্য? আমার মনে হয় বরং উল্টোটা হয়েছে। এটা করার কারণে অনেক মানুষ বরং বলেছে এটা কেমন হচ্ছে? কোনো বাধা আসেনি।’

-‘তাহলে আপনি কি নিরাপদ বোধ করছেন?’

-‘অবশ্যই আমি নিরাপদ বোধ করছি। আমার নিরাপত্তা আসলে পরিচিত মানুষ, আমার দেশের মানুষজন, আমার ছাত্র ছাত্রী, শুভানুধ্যায়ী, এবং তো আছেই আমাদের পুলিশ, মিলিটারিও আছে।’

-‘নতুন প্রজন্মের জন্য কী বলবেন?’

—ওদের জন্য আমার একটাই কথা। আমাদের এত সুন্দর একটা দেশ। , এত সুইট একটা দেশ। তোমরা দেশকে ভালোবাসবা, দেখবে দেশও তোমাদের ভালোবাসবে।

‘আপনি হাসপাতালে শুয়েও লিখেছেন’- এমন মন্তব্যের জবাবে জাফর ইকবাল স্ফীত হেসে তার ডান হাত উঁচু করে বলেন, ‘সৌভগ্যক্রমে বাম হাতটা অচল হয়েছে, ডান হাতটা সচল ছিল।’

হাসপাতাল ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরায় স্বস্তিতে আছেন এই লেখক, শিক্ষাবিদ। বলেন, ‘আমার ভালো লাগছে, আমি নরমালি ফিরে আসতে পেরেছি। পুরো ঘটনার সময় সবাই মিলে, ডাক্তার থেকে শুরু করে সবাই যেভাবে আমার যত্ন করেছেন এবং আমাকে ভালো করে তোলার জন্য সবাই এত কষ্ট করেছেন, এত ভালোবাসা দেখিয়েছে, সেটা আমি কীভাবে প্রকাশ করব, তা আমি জানি না।’

‘আমার ছাত্ররা এত অস্থির হয়ে আছে, এ জন্য আমি ক্যাম্পাসে যাচ্ছি তাদের বলার জন্য, এই দেখ আমি ভালো আছি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান এই শিক্ষাবিদ। বলেন, ‘আমি কে? আমি একজন সাধারণ ইউনিভার্সিটির মাস্টার, বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য বই লিখি। কিন্তু আমাদের প্রাইম মিনিস্টার নিজে আমাকে ওখান থেকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে এসেছেন। ওনি এত ব্যস্ত, তারপরও নিজে এসে আমাকে দেখে গেছেন। এবং কেউ যেন আসতে না পারে, ইনফেকশন যেন না হয়, সে জন্য নিজে থেকে উনি বলে গিয়েছেন। আমি কী বলব? আমি ওনাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।’

‘আমি ডাক্তারদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাই, দেশের মানুষকে কৃতজ্ঞতা জানাই এবং আপনাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাই যে আপনারা (গণমাধ্যম কর্মী) আমার জন্য এত ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।’

-‘সব মিলিয়ে আপনার শারীরিক অবস্থা কেমন?’

-আমার শারীরিক অবস্থা ভালো, মাথায় চারটা আঘাতের চিহ্ন আছে। এ জন্য আমি ছেলে মানুষের মতো টুপি পরে আছি, যেন কেউ দেখতে না পারে। সেটার সেলাই কেটে দেয়া হয়েছে, ভালো, আমার হাতে স্টিচ আছে, আমার পিঠে স্টিচ আছে, এগুলো কাটার জন্য আমাকে আবার ওখানে (সিএমএইচ) যেতে হবে।’

‘আমাকে কিছু ওষুধপত্র দেয়া হয়েছে, খাচ্ছি। এমনিতে ফিজিক্যালি আমি ভালো। আমাদের ডাক্তারদের ওপর আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।’

-‘আপনি কবে আবার ওখানে যাবেন?’

-‘আমাকে ও জায়গায় যেতে হবে ১৮ তারিখ।’

UA-126402543-3