রবিবার, মার্চ ২৯, ২০ ২০
খেলাধুলা ডেস্ক
১৭ মার্চ ২০ ২০
১০ :৫০ অপরাহ্ণ
জিম্বাবুয়ে হোয়াইটওয়াশ: অধিনায়ক মাশরাফিকে বিদায়ী উপহার লিটন-তামিমের

যখন থামল কোলাহল, নীরব-নিথর হয়নি চারিদিক। আলো নিভে গেলেও আলো জ্বলছিল। লাক্কাতুরা তখনও জেগে। এক নক্ষত্রকে বিদায় জানাতে। টিশুমাকে সাইফউদ্দিন বোল্ড করতেই চাঁদকে ঘিরে তারার মেলা বসল। সেই চাঁদ যে মাশরাফি মুর্তজা, বিলক্ষণ জানেন সবাই। জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করার অনুচ্চ আনন্দ ছাপিয়ে তখন মুখ্য মাশরাফি। বাংলাদেশ দলের সব খেলোয়াড় ২ নম্বর জার্সি পরে ফের মাঠে এলেন। নিচে লেখা-

‘ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন’। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তখন আবেগের রেণু উড়ছে। অধিনায়ক মাশরাফির পথচলা থামল। আবেগমথিত নায়কের স্বপ্নযাত্রা শেষ হল রোমাঞ্চকর জয়ে। সেই জয়ের বিশাল ক্যানভাসে তামিম-লিটন আনন্দের রঙ ছড়ালেন, রেকর্ডে জড়ালেন নিজেদের।

রেকর্ডস্নাত রাতে মাশরাফির দু’চোখেও কী নেমেছিল বৃষ্টি! অধিনায়কের বিদায়লগ্নে আকাশেরও মুখভার হয়েছে। শেষে সতীর্থরা বিদায়ী উপহার দিলেন তাকে- মধুর জয়। নেতার ৫০তম জয় আজ থেকে বহু বছর পর অশীতিপর মাশরাফিকে সুখের বৃষ্টিতে ভেজাবে।

ছবির মতো মাঠে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো নান্দনিক ব্যাটিং। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচা যদি ক্যানভাস হয়, তবে লিটন দাস ও তামিম ইকবাল হয়ে গেলেন পাবলো পিকাসো। আর তাদের ব্যাট যেন জাদুর তুলি। অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি মুর্তজার বিদায়ী ম্যাচের সাক্ষী হতে শুক্রবার সিলেট স্টেডিয়ামে দর্শকের ঢল নেমেছিল।

উৎসবে রূপ নেয়া ম্যাচে বেরসিক বৃষ্টি বাগড়া দিলেও বৃষ্টি থামার পর ছক্কা-বৃষ্টিতে সেই খেদ পুষিয়ে দিলেন লিটন ও তামিম। দু’জনের সেঞ্চুরি ও ২৯২ রানের ইতিহাস গড়া উদ্বোধনী জুটির সুবাদে ৪৩ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে তিন উইকেটে ৩২২ রানের পাহাড় গড়েছিল বাংলাদেশ।

জবাবে ধুঁকতে ধুঁকতে ৩৭.৩ ওভারে ২১৮ রানে গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ১২৩ রানের বিশাল জয়ে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে তিন ম্যাচের সিরিজ ৩-০তে জিতে নিল বাংলাদেশ। অধিনায়ক মাশরাফির বিদায়ী ম্যাচে এমন ঝলমলে পারফরম্যান্স ও দাপুটে জয়ই কাঙ্ক্ষিত ছিল।

অধিনায়ক হিসেবে ৫০ জয়ের মাইলফলক ছুঁয়েই নেতৃত্বের সোনালি অধ্যায় শেষ করলেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। সতীর্থদের কাঁধে চেপে কাল মাঠ ছেড়েছেন মাশরাফি। খেলা শেষে অধিনায়কের হাতে বিশেষ ক্রেস্ট তুলে দেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান।

‘ধন্যবাদ অধিনায়ক’ লেখা বিশেষ জার্সি পরে মাশরাফিকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেন সতীর্থরা। শেষ ম্যাচেও দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক মাশরাফি। রান তাড়ায় প্রথম ওভারে তিনাশে কামুনহুকামওয়েকে ফিরিয়ে মাশরাফিই হেনেছিলেন প্রথম আঘাত। সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি সফরকারীরা।

সর্বোচ্চ ৬১ রান আসে সিকান্দার রাজার ব্যাট থেকে। ৪১ রানে চার উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের সফলতম বোলার মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। মাশরাফি পেয়েছেন ৪৭ রানে এক উইকেট। তবে তার অধিনায়কত্ব পর্বের শেষটা রাঙাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন লিটন ও তামিম।

লিটনের ১৭৬ রান ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। তামিম অপরাজিত ছিলেন ১২৮ রানে। তাদের ২৯২ রানের যুগলবন্দি ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটি। শুধু তাই নয়, ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ রানের উদ্বোধনী জুটি।

এর আগে ৪৩ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংস যখন শেষ হয়, ততক্ষণে রেকর্ডের মালা গাঁথা শেষ। সিলেটের সবুজে লিটন-তামিমের রেকর্ডরাঙা ব্যাটিংয়ে আনন্দের দু’মুখী স্রোত বয়েছে। বিদায়ী অধিনায়ককে দুই ওপেনার দিলেন অবিস্মরণীয় উপহার। প্রত্যাশা ছাপিয়ে দিনটাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন তারা।

রেকর্ডের সব পাতা ওলট-পালট করে গড়লেন নতুন ইতিহাস। আগের ম্যাচের ৩২২ ছিল ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। শুক্রবার সিলেটে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে লিটন ও তামিমের ইতিহাস গড়া জুটিতে ৪৩ ওভারেই সেই রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলে স্বাগতিকরা।

আগের ম্যাচে তামিমের করা ১৫৮ ছাপিয়ে লিটন খেললেন বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসটি। ১৬ চার ও আট ছক্কায় ১৪৩ বলে ১৭৬ রানে থামেন লিটন। ততক্ষণে ওয়ানডেতে যেকোনো উইকেটে নিজেদের সর্বোচ্চ জুটি পেয়ে গেছে বাংলাদেশ। লিটন ও তামিমের ২৯২ রানের যুগলবন্দি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তো বটেই, ওয়ানডে ইতিহাসের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ জুটি।

আগের ম্যাচের দুঃসময় পেছনে ফেলা তামিমও পেয়েছেন টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। সাত চার ও ছয় ছক্কায় ১০৯ বলে ১২৮ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। জিম্বাবুয়েকে বিধ্বস্ত করে দুই সেঞ্চুরিতে তিন উইকেটে ৩২২ রানের পাহাড় গড়ে বাংলাদেশ। এ নিয়ে প্রথমবারের মতো টানা তিন ম্যাচে তিনশ’ ছাড়ানো ইনিংস খেলল বাংলাদেশ। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে জিম্বাবুয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৩ ওভারে ৩৪২ রান।

জিম্বাবুয়ে কেন টস জিতে বোলিং নিয়েছিল, কারণটা অনেকেই বুঝতে পারেননি। হয়তো আগের ম্যাচে রান তাড়ার রোমাঞ্চ তাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। অথবা শেষ ম্যাচে মাশরাফি টসে জিতে ব্যাটিং নিতেন ভেবে বিদায়ী ম্যাচে বাংলাদেশ অধিনায়ককে সম্মান জানাতেই অতিথিদের এমন সিদ্ধান্ত! ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল সাবধানী।

এরপর লিটন ও তামিম যা করেছেন তাতে শুধু রেকর্ড আর রেকর্ড। আগের ম্যাচেই গড়া তামিমের ১৫৮ রানের রেকর্ড ভেঙে লিটন করেছেন ১৭৬। ১৪৩ বলের ইনিংসে ছিল আট ছক্কা। এর আগে তামিমের ছিল সর্বোচ্চ সাতটি। এ নিয়ে দুই দফায় তামিম পেলেন টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি। একবারও নেই বাংলাদেশের আর কারও। দু’জনের জুটিও জায়গা করে নিয়েছে রেকর্ড বইয়ে।

কাল শুরুতে তামিমই ছিলেন বেশি আক্রমণাত্মক। পরে ধীরে ধীরে চড়াও হন লিটনও। ষষ্ঠ ওভারে চার্লটন মুম্বাকে জোড়া বাউন্ডারি হাঁকিয়ে যেন গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠেন লিটন। চলতে থাকে নান্দনিক সব শটের মহড়া। ৫৪ বলে পৌঁছে যান ফিফটিতে। তামিমের রান তখন ২৯।

এরপর দু’জনই সমানতালে ব্যাট চালিয়েছেন। মাঝে রানের গতি একটু কমে এলেও পরে দু’জন সেটা পুষিয়ে দিয়েছেন। আগের ম্যাচে দুর্ভাগ্যজনকভাবে রানআউট হওয়া লিটন সিরিজের শেষ ম্যাচে পেয়ে যান ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি। শন উইলিয়ামসকে বাউন্ডারি মেরে ১১৪ বলে স্পর্শ করেন তিন অঙ্ক।

পরের ওভারেই বৃষ্টির হানা। ৩৩.২ ওভারে বাংলাদেশের রান তখন ১৮২। সেঞ্চুরি থেকে ২১ রান দূরে তামিম। এরপর বৃষ্টি থামার দীর্ঘ অপেক্ষা। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ বুঝি আর ব্যাটিংয়ে নামতেই পারবে না। খেলা বন্ধ ছিল আড়াই ঘণ্টা। বৃষ্টি শেষে খেলা শুরু হলে প্রথম বলেই ক্যাচ দিয়েছিলেন লিটন।

সেটা ধরতে পারেননি ব্রেন্ডন টেলর। পরে শুরু হয় চার-ছক্কার টর্নেডো। সেঞ্চুরিতে পৌঁছানোর আগে লিটনের ছক্কা ছিল না একটিও। পরের ৭৬ রানে মেরেছেন আটটি ছয়। লিটন জীবন পান আরও দু’বার। ১২২ রানে ক্যাচ ছাড়েন সিকান্দার রাজা, ১৪৪ রানে ওয়েসলি মাধেভেরে। পরপর দুই ছক্কার পর মুম্বাকে আবারও ছয় মারতে গিয়ে লং অনে ধরা পড়েন। শেষ হয়ে যায় ডাবল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা।

এদিকে ৯৮ বলে ক্যারিয়ারের ১৩তম সেঞ্চুরি পেয়ে যান দেশসেরা ওপেনার তামিম। লিটনের বিদায়ের পর মাহমুদউল্লাহ এসে চার বলে তিন করে আউট হন। অভিষিক্ত আফিফ হোসেন চার বলে সাত করে শেষ বলে ফেরেন। ব্যাটিংয়ে নামার সুযোগ হয়নি আরেক অভিষিক্ত মোহাম্মদ নাঈম শেখের। বৃষ্টি বিরতির পর ৫৮ বলেই বাংলাদেশ করেছে ১৪০ রান।

Related Posts