বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০ , ২০ ২০
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
২১ মার্চ ২০ ২০
১২:৪২ পূর্বাহ্ণ
বঙ্গবন্ধু ও বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ইতিহাসের এক রাজনৈতিক দলিল

মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ এই তিনটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, নির্মাতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর প্রেম ও দ্রোহের  ইতিহাস হয়তো কারো অজানা নেই। ১৯৪৭ সালের রেফারেন্ডাম থেকে শুরু করে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলন,৬৯ এর গণঅভুত্থ্যান এবং ৭১ এর স্বাধীনতা আন্দোলন, সে সব আন্দোলনে বহুবার বঙ্গবন্ধুকে আসতে হয়েছিল শাহজালাল (রহঃ) ও ৩৬০ আউলিয়ার স্পর্শে ধন্য পণ্যভূমি সিলেটে। ইতিহাসের বিশাল মানচিত্রে বঙ্গবন্ধুর সিলেট ভ্রমনের ইতিহাস আমাদের অনেকের কাছেই অজানা। সিলেটের মানুষজনের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল গভীর সম্পর্ক । সেই কারনেই বঙ্গবন্ধু এই পুণ্যভূমিতে একটি বাড়ী নির্মান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শুধুমাত্র সিলেটের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বঙ্গবন্ধুকে টানেনি, তিনি আসতেন সংগ্রাম, রাজনীতি এবং স্বাধীনতার দাবী নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনের বহু সহযোদ্ধা ও ঘনিষ্ট সহচর রয়েছেন সিলেট অঞ্চলে। তাদের মধ্যে জননেতা জনাব দেওয়ান ফরিদ গাজী,জেনারেল এম এ রব, জননেতা আব্দুস সামাদ, কমান্ডেন্ট মানিক চেীধুরী, এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, জননেতা মোঃ ইলিয়াছ, ইসমত আহমদ চেীধুরী প্রমুখ। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ¯েœহভাজন তিন আমলা এস, এম কিবরিয়া, হুমায়ুন রশিদ চেীধুরী ও আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক ও জাতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম জাতি যেমন কোনোদিন ভুলতে পারবেনা তেমনি সিলেটের সাথে বঙ্গবন্ধরু যে গভীর হৃদ্যতা ও ভালবাসার সর্ম্পক ছিল তা কোনদিন ভুলবার নয়। 

১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগষ্টের মধ্যরাতে ব্রিটিশ কর্তৃক ভারত বিভাগের মাধ্যমে মুসলিম প্রধান অঞ্চল গুলোকে পাকিস্তান সৃষ্টির দাবি মেনে নেওয়া হলেও আসাম প্রদেশের সিলেট জেলা পাকিস্তান অন্তর্ভুক্তি প্রশ্নটি অমিমাংসিত থেকে যায়। এর দরুন পরবর্তী সময় তার জন্য রেফারেন্ডাম বা গনভোট অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিঃ ৩ রা জুন সিলেটে গণভোটের কথা ঘোষনা হলো। নির্বাচনের দিন ঠিক হলো ৬ ও ৭ জুলাই। নির্বাচনে জয় লাভের জন্য অবিভক্ত বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হোসেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের  নেতৃত্ব মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের এক বিরাট দল সিলেটে আসেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মেীলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ, পীর বাদশা মিয়া। অপরদিকে কলকাতা থেকে আসেন শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান, মোল্লা জালাল উদ্দিন,তাজ উদ্দিন প্রমুখ। যিনি অর্থ্যয়ান করেছিলেন তিনি হলেন এ, এইচ, ইসপাহানী।
 
১৯৪৭ সাল! বঙ্গবন্ধু তখন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। গণভোটের স্বপ্নের সারথী বঙ্গবন্ধু সিলেট অঞ্চলকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পাঁচশত কর্মীর নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ক্লান্তিহীন কর্মতৎপরতা চালিয়ে যান। তেজোদীপ্ত সুবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান তখন সিলেট শহরের বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান করেন। এটাই বঙ্গবন্ধুর প্রথম সিলেট সফর। বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থানকালে তখন মুসলিম লীগের নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য তুখোড় ছাত্র নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচিত হন। তখন ছাত্রনেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর উপর দায়িত্ব পড়ে কলকাতা থেকে আগত ছাত্র নেতাদের দেখাশোনা করার। ফরিদ গাজীর কর্তব্য নিষ্টা , অসীম সাহস, অমায়িক ব্যবহার ও বিচক্ষণতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আকৃষ্ট করে। তিনি হয়ে যান শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় ছাত্র ।

 

১৯৭২ সাল! বঙ্গবন্ধু রেফারেন্ডামের সময় সিলেটের অতিথিয়তা ও বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থানকালের কথা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ও ভুলতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে রেফারেন্ডামের সময় বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাত্রি যাপন কালে সে সময় স্কুলে এক মুরব্বী কুকিস বিস্কুট আর চা দিয়ে আপ্যায়ন করান। এখানে উল্লেখ্য থাকে যে, চায়ের সাথে কুকিস বিস্কুট না হলে সিলেটিদের চা চক্র সেই সময় জমতোই না। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সিলেট সফরে হযরত শাহজালাল(রহঃ) মাজার জিয়ারত শেষে হযরত শাহপরান (রহঃ) মাজারে যাওয়ার সময় হঠাৎ গাড়ী দাঁড় করান বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে। এ সময় তাঁর সফর সঙ্গী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দেওয়ান ফরিদ গাজীর কাছে ওই মুরব্বী ব্যাপারে জানতে চান। ফরিদ গাজী তখন বিষয়টা মনে নেই বললে বঙ্গবন্ধু বলেন,‘তোমরা কী রাজনীতি করো! মুরব্বীদের খবর রাখোনা ?

মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যেমন গভীর মমত্ববোধ ছিল তেমনি ছোটদের খুব ভালো বাসতেন,¯েœহ করতেন। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতেও খুব পছন্দ করতেন। তাইতো বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রাস্তার পাশে হওয়াতে শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মানের জন্য তৎক্ষণাৎ দশ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিশু মনে বঙ্গবন্ধ সদা জাগ্রত। বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গভীর শ্রদ্ধা ও পরম মমতায় স্মরণ করছে স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধু প্রেমিক, বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য এম, এ হান্নান সেলিম এর সত্য বাণী খচিত আছে বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে। তিনি লিখেছেন, "এই বিদ্যাপীঠ থেকে তোমার বজ্রকন্ঠে নির্ভীক ঘোষনা রেফারেন্ডামের মন্ত্র 'শ্রীহট্ট' ভারতে যাবেনা। ৪৭ এর যুবনেতা হে মুজিব, তোমার অক্ষয় বাণী ব্যর্থ হয় নাই, কোন দিনও ব্যর্থ হবেনা"। বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রেফারেন্ডাম বনাম বঙ্গবন্ধু এক রাজনৈতিক দলিল বহন করে চলেছে।
লেখক ---
জেসমিন সুলতানা (জেসি)
প্রধান শিক্ষক 
বখতিয়ার বিবি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়,
সিলেট সদর,সিলেট।

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য