বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০ ২০
আইন-অপরাধ ডেস্ক
২০ মার্চ ২০ ২০
২:০ ২ অপরাহ্ণ
লন্ডনের বর্ণবাদী হামলায় শহীদ  ছাতকের আলতাব আলী'র পরিবারের আকুতি

হাসান আহমদ, ছাতক থেকে::  সত্তর দশকে যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদী বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন বাঙ্গালী কিংবদন্তি ছাতকের কৃতি সন্তান বর্ণবাদীদের নিংস হামলায় শহীদ আলতাব আলীর পরিবারের কান্নার আর্তনাদ দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরেই শুনেনি বিট্রিশ সরকার। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিহতের পরিবার-পরিজনকে সরকারিভাবে কোন আর্থিক সহায়তা প্রদান ও শহীদ পরিবারের খোঁজ-খবর রাখেননি।শহীদ পরিবারের আর্থিক সহায়তার নামে লন্ডনে বিভিন্ন ধরনের ট্রাষ্ট গঠন করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছেন শহীদ পরিবারে লোকজন।
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সিলেটিদের নিয়ে ফাউন্ডেশন ও ইউকে ট্রাস্ট নামে দুটি প্রতিষ্টান শহীদ আলতাব আলীর নামে সাইনবোর্ড দিয়ে লাখ লাখ টাকার অর্থ সংগ্রহ করে আসছেন। শহীদ আলতাব আলীর পরিবারদের নামে লন্ডন থেকে ছাতকে তিনটি চেকের মাধ্যমে ১০লাখ ৮০হাজার টাকা বরাদ্ধ করা হলে ও তার পবিরারে কাছে ৯লাখ ৩০হাজার দেয়া হয়েছে। প্রায় দেড় লাখ টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।এই ঘটনায় ট্রাষ্ট ইউকে’র সভাপতি রফিক উল্লাহ রফিক লন্ডনে তোপের মুখে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে দেড় লাখ টাকা অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগের ঘটনায় নিয়ে ছাতকসহ দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড় বইছে। গত ১৮ ফেরুয়ারি উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ সৈদের গাও ইউনিয়নের ইলামের গাও গ্রামের শহীদ পরিবারে বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ৪মে বর্ণবাদীদের হামলায় আলতাব আলী নিহত হওয়ার ৪৪ বছর পর গত ১৮ ফেরুয়ারি যুক্তরাজ্য থেকে শহীদ আলতাব আলী ট্রাষ্ট ইউকে’র সভাপতি রফিক উল্লাহ রফিক’র নেতৃত্বে শহীদ আলতাব আলীর নিজ গ্রামে এসে শহীদ আলতাব আলী'র ছোট আব্বাস আলীর হাতে আর্থিক অনুদান ও চেক হস্তান্তর করেন যুক্তরাজ্য থেকে আগত শহীদ আলতাব আলী ট্রাষ্ট ইউকে’র সভাপতি রফিক উল্লাহ রফিক, আব্দুস ছালিক, টাওয়ার হ্যামলেটের ডেপুটি স্পীকার আহবাব হোসেন, টাওয়ার হ্যামলেটের কাউন্সিলর আব্দাল উল্লাহ, শেফট টমি মিয়া,আওয়ামী’লীগ নেতা আওলাদ আলী রেজা, আলী হোসেন মানিক প্রমুখ। সভা শেষে আগত অতিথিরা ব্যানার সামনে রেখেই শহীদ আলতাব আলীর কবর জিয়ারতের ছবি নিয়ে গণমাধ্যমেই নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়।ট্রাষ্ট ইউকে’র সভাপতি রফিক উল্লাহ ও ট্রাষ্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্টাতা চেয়ারম্যান শেখ দবির মিয়ার পাল্টা –পাল্টি একে অন্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদানের করায় অজানা রহস্য রেরিয়ে আসতে শুরু করছে। এব্যাপারে শেখ দবির মিয়া জানান, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কয়েকজন ব্যক্তিদের নিয়ে ট্রাষ্ট ফাউন্ডেশন গঠন করে শহীদ আলতাব আলীর নামে ফান্ড রাইজিং (তহবিল সংগ্রহ) এর জন্য অনুমতি নিয়েছেন দেশে থাকা শহীদ আলতাব আলীর ছোট ভাই উকিল আলী, আব্বাস আলী ও সিলেট জর্জকোর্টের নোটারি পাবলিক অ্যাডভোকেট মো. নুরুল ইসলামের মাধ্যমে গত ২০১৬ সালে সম্পাদিত অনুমতিপত্রে তহবিল সংগ্রহকারীরা হচ্ছেন শেখ দবির মিয়া, আলতাব মিয়া, বায়েক উল্লাহ,  আব্দুস সাত্তার, আলকাবুর রহমান মুশাহিদ, আব্দুল কালাম ও আখলাকুর রহমানসহ অনেকেই। ট্রাষ্ট ফাউন্ডেশন গঠনের পর থেকে বাংলাদেশে অবস্তানরত শহীদ আলতাব আলী পরিবারের খোঁজ-খবর নেন বলে তিনি সত্যতা নিশ্চিত করেন শেখ দবির মিয়া। ট্রাষ্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্টাতা চেয়ারম্যান শেখ দবির মিয়া ট্রাষ্ট ইউকে’র সভাপতি রফিক উল্লাহ রফিক বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ করে বলেন তার কাছে তিনটি চেকের মাধ্যমে শহীদ আলতার আলী পরিবারদেরকে ১০লাখ ৮০হাজার টাকার অনুদানের চেক দেয়া হয়। কিন্ত সে শহীদ আলতাব আলীর বাড়িতে গিয়ে নানা বির্তক সৃষ্টি করে বরাদ্ধকৃত অনুদানে থেকে শহীদ পবিরারকে দেড় লাখ টাকা কম দেয়ার খবর পেয়ে আমি মর্মাহত ও অবাক হয়েছি। ১৯৭৮ সালে বর্ণবাদীদের হামলায় আলতাব আলী নিহত হওয়ার পর ব্রিটেনে প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে বর্ণবাদ বিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেন। তাদের সে আন্দোলনের ফলে বর্ণবাদের কালো ছোবল থেকে মুক্ত হয় পূর্ব লন্ডন। এ শহীদ আলতাব আলীর নামে পূর্ব লন্ডনে একটি পার্কের নামকরণ করা হয়।প্রতি বছর ৪ মে ব্রিটেনে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শহীদ আলতাব আলীকে স্মরণ করা হয়। ৪৪ বছর পূর্বে এই দিনেই তিনি প্রাণ হারিয়েছেন আলতাব আলী। কিন্তু কেউ খোঁজ নেন না শহীদ আলতাব আলীর পরিবারের। তিনি নিহত হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার তার পরিবারকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন পবিরারের লোকজন। ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ-সৈয়দরগাঁও ইউনিয়নের ইলামের গাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলতাব আলী'র জন্ম ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে। তার পিতা হাজী আবদুস সামাদ ও মাতার সোনাবান বিবি। গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর যুক্তরাজ্য প্রবাসী আপন চাচা আবদুল হাসিমের উৎসাহে ভর্তি হয়েছেন সিলেটের মদনমোহন কলেজে। কলেজে পড়া চলাকালে পরিবারের আর্থিক অনটন ঘুচিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপনের জন্য ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে পাড়ি জমান সুদূর ব্রিটেনে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ১৯৭৮ সালের ৪ মে ব্রিটেনে বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়ে আলতাব আলী নিহত হন।এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী ওঠে নিন্দার ঝড়। তার লাশ আসে প্রায় এক মাস পর। তার গ্রামের বাড়ি পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয় এদিকে শহীদ আলতাব আলীর ছোট আব্বাস আলী ৯লাখ ৩০হাজার টাকা প্রাপ্তির ঘটনা
সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন যুক্তরাজ্য থেকে শহীদ আলতাব আলীর পরিবারদের নামে ১০লাখ ৮০হাজার টাকা অর্থ সংগ্রহ করে দেয়ার প্রমাণাদি ও থাকলে আমরা দেড়লাখ টাকা কম পেয়েছি।তার ভাগিনা ইয়াহিয়া জানান,  যুক্তরাজ্য প্রবাসী তার চাচা আব্দুল হাসিমের মাধ্যমে আলতাব আলী ১৯৬৯ সালে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে একটি লেদার ফ্যাক্টরীতে তিনি কাজ করতেন। তার ফুফাত ভাই আবুল হোসেনের সঙ্গে একই বাসায় রাত্রি যাপন করতেন। এক টানা ছয় বছর থাকার পর ১৯৭৫ সালে আলতাব আলী তার মা সোনাবান বিবিকে দেখতে দেশে আসছে। ঐ বছর ২৭ মার্চ গোবিন্দগঞ্জের বিলপাড়ের মাহমুদুর রহমানের কন্যা জাহানারা বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের ছয় মাসের মাথায় তিনি আবারো যুক্তরাজ্যে চলে যান। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে মাকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি বাড়ির পুরনো ঘর ভেঙে নতুন করে ঘর তৈরীর পরিকল্পনার কথা জানান। পাশাপাশি স্ত্রীকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য মায়ের মতামত জানতে চান। এই চিঠিই ছিল মায়ের কাছে আলতাব আলীর হাতে লেখা শেষ চিঠি। যদিও মারা যাওয়ার আগের রাতে আরেকটি চিঠি তিনি বাড়িতে পাঠানোর জন্য লেখা শুরু করেছিলেন। অসম্পূর্ণ চিঠি তিনি আর সম্পন্ন করতে পারেননি। পরের দিন বর্ণবাদী হাতে নির্মম হামলার শিকার হয়ে তিনি প্রাণ হারান। আলতাব আলী মৃত্যুর পর তার ফুফাত ভাই আলতাব আলীর লেখা অসম্পূর্ণ চিঠিটি সম্পন্ন করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। যা আজ ও তার পরিবারের কাছে স্মৃতি হয়ে রয়েছে। এছাড়া তার ভাই ব্রিটেনে বর্ণ হামলায় নিহত হলেও ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ আজো ও তারা পাননি। তবে আলতাব আলীর কোন ছেলে সন্তান না থাকায় তার স্ত্রী জাহানারা বেগম কয়েক বছর পরে সুনামগঞ্জের একজন ব্যাংকারের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আলতাব আলী বিয়ে করে ফের বিলাত যাওয়ার সময় তার কিশোরী বোন সিতারা বেগমকে যুক্তরাজ্যে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তার ভাই অকালে মারা যাওয়ার দুঃখে তিনি আজ ও বিয়ে করেননি। সারা জীবন চিরকুমারী থাকার শপথ নিয়েছেন।যুক্তরাজ্যে বর্নবাদীদের হামলায় শহীদ আলতাব আলীর পরিবারের আকুতি মিনতি কেউ শুনেনি।
 

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য