মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০ ২০
লেখালেখি ডেস্ক
২০ মার্চ ২০ ২০
৯:১১ অপরাহ্ণ
দিল্লি আগ্রাসন এবং আমাদের দায়

নরেন্দ্র মোদির অতীত, উত্থান কিংবা কট্টর হিন্দুবাদী মনোভাব সবারই জানা, এটি তার মনের বিশ্বাস অথবা ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুজি করে ক্ষমতার মসনদে বসার ভিত্তি হতে পারে। সে যাই হোক, দিল্লিতে যে আগ্রাসন চলমান- তা কোনোভাবেই জাস্টিফায়েবল নয়, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ, ধর্মীয় অনূভুতিতে আঘাত এবং রাষ্ট্রীয় মদদে করা ঘৃনিত এবং নিন্দনীয় ক্রাইম। কট্টরপন্থী ধর্মীয় মনোভাব লালন করা কোনো দল বা সরকারই কোনো দেশের জন্যে ভালো নয়- হোক তা হিন্দুধর্মের বা ইসলাম ধর্মের, এটি তার উৎকৃষ্ট প্রমান। আমাদের এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে কারন ধর্মকে সেখানে সংখ্যালঘু ঘায়েলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আম জনতাকে বোকা বানিয়ে ভুল পথে আর ধর্মের দোহাইয়ে ধর্মের আদর্শিক বা মানবিক শিক্ষা থেকে দূরে রেখে বা উস্কানিমূলক কথার ফুলঝুরিতে ধর্মের নামে ধর্মবিরোধী কাজই বেশি করা হয়৷

নগর পুড়লে দেবালয় ভালো থাকবেনা, উপাসনালয় পুড়লে শহর-গ্রাম-দেশ কোনোটাই ভালো থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক, কোনো হিন্দু নির্যাতিত হলে বাকি হিন্দুরাও ভালো থাকবেনা, ঠিক তেমনি কোনো মুসলমান বিপদে থাকলে বাকি মুসলমানেরও কষ্ট লাগবে, চোখে জল আসবে৷ কিন্তু কি করার আছে আমাদের? 

আমরা (বাংলাদেশ) কোনো অর্থনৈতিক পরাশক্তি নই যে ভারতের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তারা ব্যবসার ভয়ে আমাদের কথা শোনবে। আমরা সামরিক শক্তিতে ভারতের ধারেকাছেও নেই যে আক্রমনের হুমকি দিব আর তাতেই তারা ভয় পাবে। আমাদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী ভারতের আরেক প্রতিবেশী পাকিস্তান, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকেও লম্বা লম্বা কথাই বলতে শোনি খালি, কিছু করেননা কেন ভারতের আমাদের মুসলিম ভাই-বোনগুলোকে বাঁচানোর জন্যে। অনেকগুলো শক্তিশালী মুসলিম দেশ আছে বিশ্বে, কই কেউতো কিছু বলেনা, এরদোগান সাহেবরেতো পারলে আমরা ওলি-আউলিয়া বানায় দেই, কই উনি? ভারতের সাথে লাগতে গেলে আমরা পারব? স্লুইস গেইটগুলো খোলে দিলেই বাংলাদেশে আগামী ছয়মাস চলবে বন্যা।
গরু না দিলে কোরবানির ঈদে লাখ টাকা হবে ছাগলের দাম। পিয়াজ এমনিতেই আকাশছোঁয়া, এটা আটকায়তো পিয়াজের বিকল্প মুলাও হতে পারে সোনার টুকরা। কুটনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি, ভৌগলিক হিসেবনিকেশ নাইবা কষলাম। 

ভয় নয়, হার মানা নয়, প্রতিবাদ না করে চুপ থাকার পায়তারা নয়, আক্ষেপ আর নিরেট বাস্তবতা।
ভৌগলিক রাজনীতিতে পরাশক্তির পাশে থাকা মানে বাঘের পাশে বিড়ালের গড়াগড়ি- গড়াগড়ি আস্তে করলে বলবে কিরে আছিস কি না বুঝিনা কোনো নড়াচড়া নাই যে, আবার জোরে নড়াচড়া করলে বলবে কিরে পশম গজাচ্ছে নাকি আওয়াজ দিচ্ছিস কেনো ধরব নাকি ঘাড় চেপে, উভয় সংকট।

এখন দেশে আওয়ামী লীগ সরকার না হয়ে বিএনপি-জামাত সরকার থাকলে কি আমরা পারতাম আমাদের ভারতীয় মুসলিম ভাই-বোনদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে? ঐ একই কাজ করতাম আমরা- মন থেকে এহেন জঘন্য কাজকে ঘৃনা, উপরওয়ালার কাছে হাত তুলে দোয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড়।

ঢালাওভাবে হিন্দুবিদ্বেষী যেন না হই আমরা, আমি প্রচুর হিন্দু মানুষকে দেখছি এটার তীব্র প্রতিবাদ করতে, করে চলেছেন৷ সবাই-ই শান্তির পক্ষে আর সংঘর্ষের বিপক্ষে- নষ্ট আর পথভ্রষ্টরাই এগুলো করছে, সকলখানেই এমন ইতর শ্রেনীর লোকজন আছে, ছিল আর থাকবে যুগে যুগে, এরা নিপাত যাক। মহার রব এদের হেদায়াত করুন আর মুসলিম পরাশক্তি দেশগুলোর নেতাদের বিবেক আর প্রতিবাদী এ্যাকশন নেয়ার জন্যে জাগ্রত করে দিন ঈমানী শক্তি।

এরকম খারাপ কাজকে কেবলি একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলবনা, এটি বিশ্ববিবেক নাড়া দেয়ার মত নৃশংসতা- তীব্র নিন্দা জানাই, অত্যাচারীরা নিপাত যাক মানবতা মুক্তি পাক। মানুষ হউক মানুষের জন্যে-
"কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর!
মানুষেরই মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেই সুরাসুর
রিপুর তাড়নে যখনি মোদের বিবেক পায় গো লয় আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনি পুড়িতে হয়"।

কোরআন-গীতা-বাইবেল লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বা একই শেল্ফেই থাকে, তাদের মাঝে ঝগড়া হয়না, ঝগড়া শুরু হয় শেল্ফ থেকে তা মানুষের হাতে নামলে। মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান পাশাপাশিই হেটে চলা আশরাফুল মাখলুকাত, ধাক্কাধাক্কিটা মানুষরুপি কুকুরের চেয়েও অধমগুলোই শুরু করে৷

ধর্ম আর রাষ্ট্রকে আমরা এক করে ফেলি খুব সহজে, হুম আমি মুসলমান, মন আমার কাঁদে না? কাঁদে অবশ্যই। 

প্রথমত, এই পাপের জন্যে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্যে আমি বা আপনি বা বাংলাদেশ কি কোনো অথোরিটি? শাস্তি দিতে গেলে বিশ্ববিবেক জাগ্রত হয়ে একযোগে কাজ করা লাগবে? শরীয়াহ আইন দিয়ে যে দেশগুলো চলে, তারা আমাদের থেকে অনেক ভালো মানের মুসলমান হওয়ার কথা আবার তাদের শক্তিসামর্থ্যও
অনেকেরই অন্তত আমাদের থেকে বেশি, তাইনা? যেমন সৌদি আরব- তারা একটু যদি হুংকার দিত, দিল্লির সেই পাপের মসনদটা কেপে উঠত, তারা নিরব কেন? এরদোগান আর ইমরান খান খালি মাঠ গরম করা কথা বলে, তারা পারেনা মুসলিম নেতাদের নিয়ে জাতিসংঘের বাইরে নিজের মত করে একটি মুসলিম কনফারেন্স ডাকতে? তাদের ডাকে অনেক মুসলিম দেশই সাড়া দিত। তারা করেনা কেনো? এদের তুলনায় বাংলাদেশের শক্তি অনেক কম তা আমাদের জানা, এবং আমাদের ভৌগলিক কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে- বাংলাদেশের তিনদিকে ভারত আর একদিকে সাগর, আমাদের মধ্যে অনেক ব্যবসাবানিজ্য, পররাষ্ট্র কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কসহ দুদেশের অনেক হিসেবনিকেশ আছে, অন্য দেশের তাও নেই তবুও তারা এগিয়ে আসে না কেন?

খ্রিস্টানদের/ইহুদিদের মাঝে শক্তিশালী কারা? আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইসরায়েল গং তাইনা? তাদের সব ব্যপারে এরাই লিড দেয় আর সাথে থাকে সব ছোট খ্রিস্টান দেশগুলো৷ এটাইতো নিয়ম, শক্তিশালীরা লিড দিবে বাকিরা সাথে থাকবে৷ সে জায়গায় আমাদের মুসলিম দেশগুলো এমন কেন? এক মধ্যপ্রাচ্যেই কত কত দেশ, এরাতো শরীয়াহ আইন দিয়ে দেশ চালায়, তাই না, তা কেন এগিয়ে আসে না? যেখানে ওদের এই অবস্থা, সেখানে আমাদের মত ছোট্ট দেশ কিভাবে পারবে? কি পারবে? ডাক দিলেও মুসলিম দেশগুলো আসবেনা সাথে, সবাই যার যার মত ভারতের সাথে খাতির বজায় রাখবে ব্যবসা-পররাষ্ট্র সহ অনেক কারনে৷

আমাদের অনেকেই যে আমাদের সরকারের পরোক্ষভাবে সমালোচনা করেন, করুন নো প্রবলেম কিন্তু বাস্তবতা হলো বড় কোনো দেশ যদি এগিয়ে না আসে আর খালি মিডিয়ায় এমনি এমনি হুংকার দেয় তাইলে কি হয়৷ ঐ দশ লাখ রোহিংগাদের কিন্তু বাংলাদেশই আশ্রয় দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এই সাহসী আর মানবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আজও যাবতীয় শেল্টার দিয়ে মেহমানের মতই আদরে আগলে রেখেছেন। আমার ধারনা বেগম খালেদা জিয়া এসময় ক্ষমতায় থাকলে তিনিও এই অসহায় রোহিংগা মুসলমানদের আশ্রয় দিতেন। আমাদের নেতারা এসব ব্যাপারে মানবিক কিন্তু সামর্থ নিয়েতো ভাবা লাগে নাকি। এক জাহাজ এক জাহাজ করে ইমরান খান, এরদোগান, সৌদি আরব সহ এরা সবাই নিতে পারতোনা/পারেনা কিছু রোহিঙ্গা? ওরাতো অনেক বেশি ধনী, শক্তিশালী, চাপাবাজিতে অনেক বড় আর হৃদয়বান মুসলিম। তাহলে করেনা কেনো? এজন্যেই আমার মনে আসে কথাগুলো যে এত ধনী শক্তিশালী মুসলিম দেশগুলো এত খারাপ কেন? ওরা নিরব বলেই আজ মুসলমানরা নিপীড়িত। আমাদের ঘরে আমরাই ঠিক নেই, অন্যের চরকায় তেল দেয়ার সময় আমাদের হয়নি এখনো, আগে ঘর- তবেতো পর৷ প্রত্যেক মুসলমানের কান্না আমাকেও ভাবায়, অনুভব করি তাদের নিরব অশ্রু কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে কথা বলতে চাই আমি৷ 

আমি তাই দোয়া করি আল্লাহর কাছে আল্লাহ যেন ওদের হেফাজত করেন, অন্তর থেকে সকল নিপীড়কদের ঘৃণা করি, করব সবসময়, বদ-দোয়া দেই, ধ্বংস হউক এরা। তবে এখানে বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় দায় আছে বলে আমি মনে করিনা। দেশ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিন্দা জ্ঞাপন করতে পারে, সেখানে কোনো বাংলাদেশী অবস্থান করলে তাদেরকে ফিরে আসার জন্যে বলতে পারে, দূতাবাসের সাহায্য নেয়ার কথা বলতে পারে, দিল্লি ভ্রমনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে ইত্যাদি৷

অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে চায় সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে, নাস্তিক বানায় দিতে- এগুলো ধর্মীয় অনুভূতি নয় বরং উস্কানি, সবখানে দলবাজি করে৷ এগুলো আওয়ামী বা বিএনপি ইস্যু নয়, অনেকেই বুঝে না বুঝে চায়- এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে ভারতের সাথে লাগায়-বাজায় মাঝখানে মজা লুটতে। আবার এই এরাই অসুখে পড়লে চেন্নাই যাব চেন্নাই যাব করে চেল্লাইতে চেল্লাইতে দেশের বদনাম আর ভারতের সুনাম করে, এরাই আবার একসাথে এই ঘটনায় পুরো ভারতের গুষ্টি উদ্ধার করছে।

আমরা সাধারণের জায়গা থেকে খুব সহজে যা বলতে বা করতে পারি, একটি সরকার তা পারেনা, তা আওয়ামী লীগ হোক আর বিএনপি হোক। সরকারের একটা কথা মানে একটা দলিল। সুতরাং তাদের অনেক ভেবেচিন্তে কাজ করতে হয়, আওয়ামী লীগ বিএনপি সবাইই ইসলামের পক্ষে৷ আমাদের আরেকটু বোধহয় রাষ্ট্র তন্ত্র আর ধর্ম তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করা উচিত৷ ভারতপ্রীতি, ভারতভীতি কিংবা ভারতের প্রতি ঘৃণা কোনোটাই আমার নেই। আমার মতামত আমার, সবার মতামত আমার সাথে মিলতে হবে এমন নয়, ভিন্নমতকে আমি সবসময় শ্রদ্ধা করি।

অ্যাডভোকেট শাকী শাহ ফরিদী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য