বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০ ২০
এক্সক্লু‌সিভ ডেস্ক
১০ এপ্রিল ২০ ২০
৯:৫৩ অপরাহ্ণ
অবশেষে ভূয়া লন্ডনী জাপা নারী নেত্রী শিউলী পুলিশের খাঁচায় 

এ টি এম তুরাব:: সিলেটে লন্ডনী কন্যা সেজে বিয়ে বাণিজ্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শক্তিশালী হচ্ছে নারী নেত্রী শিউলীর প্রতারক সিন্ডিকেট। দেশব্যাপী আলোচিত যুব মহিলা লীগ থেকে বহিষ্কৃত শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ’র মতো না হলেও তার চেয়ে কম নয় সিলেটের জাতীয় মহিলা পার্টির শিউলী আক্তার। লোকমুখে খ্যাতি আছে তিনি নাকি ভয়ংকর নারী প্রতারক ও অপরাধ সাম্রাজ্যের রাণী। তার সাথে অপরাধ জগতে প্রায়ই জড়াচ্ছেন গ্রামের অসহায় নীরিহ গরীর পরিবারের অনেক তরুণী। তাদেরকে দিয়ে বাধ্য করা হচ্ছে মাদক সেবন, দেহ ব্যবসাসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ডে। এমন অভিযোগের তথ্য ও প্রমান রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।    
    সুত্র জানায়, পুরো নাম শিউলি আক্তার। নিজেকে পরিচয় দেন লন্ডন কিংবা আমেরিকান সিটিজেন পাত্রী হিসেবে। বিয়ের আলোচনার সময় বাড়ির ঠিকানা দেন ভুয়া। কাবিন হিসেবে পাত্রপক্ষের কাছে ডিমান্ড করেন মোটা অংকের নগদ টাকা ও ৫ থেকে ১৫ ভরি পর্যন্ত স্বর্ণ। বিয়ে দিনক্ষণ ঠিক হলো। ঘরোয়া পরিবেশে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বর কনেকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বিয়ের কিছুদিন পরই পূর্ব পরিকল্পনা মতো স্বামী বা স্বামীর বাড়ির মানুষের সঙ্গে অকারণে ঝগড়া করে স্বামীর বাড়ি থেকে চলে আসেন। পরে স্বামীকে ‘তুমি ভালো নায়, তোমার বাড়ির লোকজনও ভালো নয়’ এই অজুহাত দেখিয়ে- ‘গুড বাই’ আমি লন্ডন চলে যাচ্ছি বলেই স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
কিছুদিন পর আবার নতুন আয়োজনে পুরনো পরিকল্পনায় খোঁজতে থাকেন অন্য পাত্র। এভাবেই তিনি একের পর এক প্রতারণার ফাঁদ পাতেন। এনিয়ে ড্রীম সিলেটে “লন্ডনী কন্যা সেজে প্রতারণার ফাঁদ, একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা ও স্বর্ণালস্কার” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সংবাদটি প্রকাশের পর শিউলিসহ তার সহযোগীরা গাঁ ঢাকা দেয়। বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর ফের এ চক্রটি শুরু করে তাদের প্রতারণার ফাঁদ। তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের খাঁচায় আটকা পড়ে শ্রীঘরে যেতে হলো চক্রটির মূল হোতা জাপা নেত্রী শিউলি ও তার দুই সহযোগীকে।
গ্রেফতারকৃত মহিলা জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শিউলী আক্তার বিশ্বনাথ উপজেলার কোনারাই গ্রামের তৌহিদ উল্লার মেয়ে। অপর দুইজন হলো, সুনামগঞ্জের ছাতক থানার দোয়ালিয়া গ্রামের মৃত কাচা মিয়ার মেয়ে সুমনা আক্তার (১৯) ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ঘোলডুবা গ্রামের মৃত আজাদ মিয়ার মেয়ে সিমা আক্তার (১৯)।
রোববার (৫ এপ্রিল) তাদেরকে জগন্নাথপুর থানা পুলিশ আদালতে হাজির করলে বিচারক জাপা নেত্রী শিউলিসহ তার সহযোগীদের সুনামগঞ্জ কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে আশরাফুল রহমান নামের এক মামলার প্রেক্ষিতে শনিবার রাতে জগন্নাথপুর উপজেলায় আশারকান্দি ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রাম থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। 
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথপুরের লোহারগাঁও গ্রামের আশরাফুল রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় ওসমানীনগরের করমসী গ্রামের রহিম উল্লাহর। এর সূত্রধরে গত ফেব্রুয়ারী মাসে আশরাফুলের সঙ্গে সিলেট নগরীর উপশহরের একটি বাসায় লন্ডনী পাত্রী হিসেবে শিউলী আক্তারকে দেখান রহিম উল্লাহ। ওই সময় শিউলী তার গ্রামের বাড়ী গোলাপগঞ্জের জিলপাই গ্রামে বলে ঠিকানা দেন। এরপর গত ১০ ফেব্রুয়ারী নগরীর একটি হোটেল নগদ ৫ লাখ টাকার কাবিন ও ৭ ভরি স্বর্ণালংকার দিয়ে শিউলী বিয়ে করেন আশরাফুল। বিয়ের পর তারা জগন্নাথপুরেই বসবাস করছিলেন। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই শিউলী শশুরবাড়ীর লোকজনের সঙ্গে ঝগড়া করে তার বাবার বাড়ি চলে আসেন। বাবার বাড়ি যাওয়ার কয়েকদিন পর শিউলী আশরাফুলকে মুঠোফোনে জানায় সে লন্ডন চলে যাচ্ছে। একই সাথে তাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ বলেও জানায়।
এ ঘটনার কিছুদিন পর আশরাফুল জানতে পারেন শিউলী লন্ডন নেয়ার কথা বলে সম্প্রতি জগন্নাথপুরের আশারকান্দি ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের কামরুল ইসলামকে বিয়ে করেছেন। এ খবর পেয়েছে আশরাফুল গত ৩ এপ্রিল রাতে কামরুল ও তার পরিবারের লোকজনকে বিষয়টি জানান। শিউলী লন্ডনী পরিচয় দিয়ে প্রতারণার মাধ্যম বিয়ের নামে ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেয়। এরপর আশরাফুল জগন্নাথপুর থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ শনিবার (৪ এপ্রিল) রাতে কামরুল ইসলামের বাড়ি থেকে ভুয়া লন্ডনী কন্যা নারী নেত্রী শিউলী আক্তার ও তার অপর দুই সহযোগী কাজের মেয়ে গ্রেফতার করে।
এ ব্যাপারে জগন্নাথপুর থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রতারক চক্রের ভুয়া লন্ডনী কন্যা শিউলিসহ তিনজনকে সুনামগঞ্জ জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। প্রতারকচক্রটির সাথে কারাকারা জড়িত রয়েছে এসব তথ্যের উদঘাটনের জন্য প্রয়োজনে তাদেরকে রিমান্ডে আনা হবে। তিনি বলেন, এ চক্রটির অন্য সদস্যদের গ্রেফতার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।   
কে এই শিউলি আক্তার?
দিলশানারা বেগম তার ছদ্মনাম। তার আরো অনেক ভূয়া নাম আছে। তবে এই নামটি তিনি ব্যবহার করেন প্রতারণার ক্ষেত্রে। তার আসল নাম শিউলি আক্তার। তিনি জাতীয় মহিলা পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার কুনারই গ্রামের মৃত তৌহিদ উল্লাহর মেয়ে তিনি। রয়েছে ২০/২২ বছরের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলে ও মেয়েদের বিয়েও দিয়ে দিছেন। শিউলি ছেলে রায়হান ও পুত্রবধুকে নিয়ে বর্তমানে নগরীর মেন্দিবাগস্থ গার্ডেন টাওয়ারের ৮ তলার ৪০৮৬ নং ফ্লাটে বসবাস করেন। 
শিউলি বাংলাদেশী নাগরিক হলেও পরিচয় দেন ব্রিটিশ সিটিজেন আবার কোন সময় আমেরিকান নাগরিক হিসেবে। তার রয়েছে একটি ভূয়া ব্রিটিশ পাসপোর্ট। প্রভাবশালীদের যোগসাজশে নারী নেত্রী শিউলি আক্তার প্রতারণা আর অপরাধের পাহাড় গড়েছেন। নিজের ভাড়া ফ্লাটে মাদক ব্যবসা-সেবন, দেহ ব্যবসা, হুমকি, লন্ডনী কনে সেজে প্রতারণার ছবি, ভিডিওসহ অসংখ্য অভিযোগের প্রমাণ রয়েছে স্ংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। বর্তমানে তিনি নগরীর উপশহরে সি ব্লকের ৩৮ নং রোডের প্যারিস ভিলার নীচ তলার একটি ফ্লাট থেকেই এসব অপকর্ম করতেন। তাকে সহযোগীতা করতেন বিশ্বনাথের গনি, ঘটক খলিল, আনছার, তাজপুরের রহিম, সৌদি কবির আরো অনেকে। জাপা নেত্রী শিউলির এমন প্রতারণার তথ্য সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রয়েছে।


 

সম্পর্কিত খবর

পুরানো খবর দেখার জন্য