সোমবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৭ ১৪২৬   ২৩ মুহররম ১৪৪১

কোরবানি করুন মনের পশুত্বকে   

মাহমুদুর রহমান::

ড্রীম সিলেট

প্রকাশিত : ০৮:৩৮ পিএম, ১০ আগস্ট ২০১৯ শনিবার

 খুশির বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবার এসেছে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রতি বছর হিজরি জিলহজ মাসে পবিত্র হজ পালিত হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখ লাখ মুসলমান আরাফাত ময়দানে সমবেত হন। এটি মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ পশু কোরবানি। যার সঙ্গে জড়িত নবী হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পবিত্র স্মৃতি।

প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মহান রাব্বুল আলামিন হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় বস্তু কোরবানি করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হজরত ইবরাহিম (আ.) তার ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আপত্য স্নেহ যাতে ঐশী নির্দেশ পালনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করতে নিজের চোখ বেঁধে প্রিয় পুত্রকে কোরবানির প্রাক্কালে করুণাময়ের অসীম কুদরতে ইসমাইল (আ.)-এর বদলে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়।

ফেরেশতা হজরত ইবরাহিমকে (আ.) জানান, আল্লাহ তার আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়েছেন। আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এই মহিমান্বিত ঘটনার অনুসরণে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীদের মধ্যে ১৪০০ বছর ধরে পালিত হচ্ছে কোরবানির প্রথা। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে সারা বিশ্বের মুসলমানরা ১০ জিলহজ কোরবানি দিয়ে থাকেন। একই সঙ্গে এটি এমন এক উৎসব ও ইবাদত যা মানবজাতির ঐক্য এবং বিশ্বশান্তির পথ দেখাতে পারে।

ঈদুল আজহার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিজের অহমিকা ও উচ্চাভিলাষ পরিত্যাগ করা। কোরবানির অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ। কোরবানির উদ্দেশ্য নিছক শুধুপশু জবাই নয়, মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকে যে অহংবোধ, তা বিসর্জন দিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হওয়াই কোরবানির শিক্ষা। পশু কোরবানির ভেতর দিয়ে মানুষের ভেতরে থাকা পশুশক্তি, কাম-ক্রোধ, লোভ, মোহ, ইত্যাদি রিপুকে পরিত্যাগ করতে হয়।

কোরবানি কোনো লোক দেখানো বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘রাব্বুল আলামিনের কাছে কোরবানি করা পশুর রক্ত বা মাংস কিছুই পৌঁছায় না। তার কাছে পৌঁছে বান্দার তাকওয়া।’ সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের উৎস- মহান আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী জীবন গড়ার মধ্যেই রয়েছে কোরবানির আসল মাহাত্ম্য। তা উপেক্ষা করে কোরবানির নামে অহংবোধের প্রকাশ ঘটালে তা হবে পশু হত্যার নামান্তর। কিন্তু দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ত্যাগের চেয়ে লৌকিকতা, দাম্ভিকতা ও ভোগ-বিলাসের দিকটিই প্রধান হয়ে ওঠে, যা সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়।

পশু কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। রাস্তার ওপর বা যত্রতত্র কোরবানি দেওয়া অনুচিত। এতে পরিবেশ দূষিত হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়। কোরবানি করার পর রক্ত ও অন্যান্য অনুষঙ্গে পরিবেশ যাতে দূষিত না হয় সে ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। জবাইকৃত পশুর রক্ত ও বর্জ্যে যাতে পরিবেশ দূষিত না হয় তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার কর্তব্য। সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে উদ্যোগী হলে পরিবেশ সুন্দর থাকবে।

কোরবানির মাধ্যমে আমরা মনের ভেতরের পশুশক্তিকে যেমন হত্যা করব, তেমনি সুদৃঢ় করব মানুষে মানুষে ভালোবাসা। মানবতার সেবাই হচ্ছে প্রকৃত ধর্ম। পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে ব্যক্তি, সমাজ তথা মনের ভেতরের পশুশক্তিকে দমনই হচ্ছে কোরবানির মূল কথা। এ ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের পথ ধরে লাভ করা যায় আল্লাহর নৈকট্য। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আমরা দেশবাসী ও মুসলিম উম্মাহর সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করছি। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আত্মত্যাগের ও আনন্দময় উৎসবে আমাদের অগণিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি রইল শুভেচ্ছা। সবাইকে ঈদ মোবারক।

লেখকঃ মাহমুদুর রহমান 
সাধারণ সম্পাদক, নিউইয়র্ক মহানগর যুবলীগ।