শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

শহরে নেই খোলা মাঠ, মুখ ফেরাচ্ছে শিশু-কিশোর

এ টি এম তুরাব:: 

ড্রীম সিলেট

প্রকাশিত : ০৯:৫০ পিএম, ২০ জুন ২০১৯ বৃহস্পতিবার

নেই খোলা জায়গা কিংবা খেলার মাঠ। তাই এলাকার বখে যাওয়া কিশোরদের সংস্পর্শে এসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে উঠছে। তারা স্কুল ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। বাসা-বাড়িতে কিংবা ফ্যাটে সারাদিন একা একা থাকে। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে কোথাও খোলা মাঠে একটু খেলবে তার উপায় নেই। ঝলমলের সিলেট নগরীতে এভাবেই বেড়ে উঠছে শিশু ও কিশোররা। নগরে খেলার মাঠ ও খোলা জায়গার অভাব। যেটুকু আছে দখল-দূষণে তাও প্রায় পরিত্যক্ত। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, খেলাধুলা ও নির্মল বিনোদন ছাড়া কোনোভাবেই শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ সম্ভব নয়। এসবের অভাবে শিশুরা পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না।
জানা যায়, আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত সিলেটের খেলার মাঠগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক পুরনো ও পরিচিত মাঠও এখন বেদখল হয়ে গেছে। গোটা শহরে খেলার মাঠ বলতে পড়ে রয়েছে শুধু এমসি কলেজ মাঠ। তবে সে মাঠের অবস্থাও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এই ঘেরা মাঠে জলের কোনও সংযোগ নেই। গ্যালারি নেই। এমনকি কোনও ছাউনি নেই। অসমান মাঠে চোট পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
সুত্র জানায়, যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ, হকারদের আধিপত্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে সিলেট নগরী থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে খেলার মাঠ। ফলে নিয়মিত ক্রীড়াচর্চা থেকে বঞ্চিত নগরীর শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। গত কয়েক বছরে নগর থেকে হারিয়ে গেছে ছোট-বড় অনেক মাঠ। নগরীর অন্যতম বৃহত্তম মাঠ ছিল মেডিক্যাল মাঠ। মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ খেলার মাঠের জায়গায় গড়ে তুলেছেন নার্সিং হোম আর ইন্টার্নি আবাসন। স্টেডিয়ামের পর হকি খেলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মাঠ ছিল সিলেট পুলিশ লাইন মাঠ। এই মাঠ থেকে উঠে এসেছেন সিলেটের নামিদামি অনেক হকি তারকা। কিন্তু বর্তমানে এই মাঠটিতে পুলিশ ছাড়া কারোরই প্রবেশাধিকার নেই। রাজবাড়ী খেলার মাঠ এক সময় খেলোয়াড়দের খেলাধুলায় মুখরিত থাকতো। নিয়মিত বসত খেলাধুলার আসর। কালের আবর্তে এই মাঠটিও হারিয়ে গেছে। নগরীর বহুল আলোচিত কয়েদির মাঠ দখল হওয়ার পথে। শাহজালাল উপশহর এলাকার সি ব্লকে মাঠটিও বিলীন হয়ে গেছে। দখল করে আছে একটি সামাজিক সংগঠন। নগরীর অন্যতম আরেকটি বৃহত্তম খেলার মাঠ ছিল মেডিকেল মাঠ। মেডিকেল কর্তৃপক্ষ এ মাঠে গড়ে তুলেছেন নার্সিং হোম আর ইন্টার্র্নি আবাসন। এছাড়া ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে নগরী থেকে হারিয়ে গেছে ছোট-বড় আরো অনেক মাঠ। এর মধ্যে উপশহর সি ব্লক মাঠ, লালদীঘির পাড় গাছতলা মাঠ, বর্ণমালা স্কুল মাঠ, লালমাটিয়া মাঠ, রেজিস্টারি মাঠ, মজুমদারী মাঠ, বাগবাড়ী এতিম স্কুল মাঠ উল্লেখযোগ্য। নগরীর কালাপাথর মাঠটিও নানাভাবে অবহেলার শিকার। 
এদিকে জেলা স্টেডিয়ামের পাশে অবস্থিত সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার খেলার মাঠটি বর্তমানে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মেলা পরিচালনার কেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। ফলে মাঠটি হয়ে পড়ছে ক্ষতবিক্ষত ও খেলাধুলার অনুপযুক্ত। সিলেটের অন্যতম একটি মাঠ হচ্ছে এমসি কলেজ মাঠ। এই মাঠটিও এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। শাহী ঈদগাহ খেলার প্রতিবছর বাণিজ্যমেলা হওয়ার ফলে খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত রয়েছে শিশু-কিশোররা। এই দু’টি মাঠে বাণিজ্যমেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে মাঠটি শ্রী হারিয়েছে অনেকটাই। এছাড়া মাঠ দুটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাজুক একটু বৃষ্টি হলে পানি জমে খেলার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। চারদিকে সীমান্ত দেয়াল নির্মাণ করে মাঠটিকে সংরক্ষণ না করা হলে ভবিষ্যতে এটি তার অস্তিত্ব হারাতে পারে বলে আশঙ্কা আমাদের। উপশহর সি ব্লক মাঠে গত পাঁচ ছয় বছর আগেও এলাকার কিশোর যুবকরা খেলে ছিলো। হঠাৎ এই মাঠটিতে খেলা বন্ধ করে দেওয়া হলো। শাহজালাল উপশহর কল্যাণ পরিষদের একটি সাইন বোর্ড টানিয়ে দিলেন। উপশহর মহিলা স্কুল, এর কিছু দিন পর সাইন বোর্ডটি সংশোধন করে আবার লেখা হলো উপশহর মহিলা কলেজ। এরপর থেকে এই মাঠটিতে আর ‘বল’ গড়ায়নি। ভূমিদস্যুদের হাত থেকে নগরের খেলার মাঠ রক্ষা ও দখল হয়ে যাওয়া মাঠগুলোকে দখলমুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন ক্রীড়ানুরাগীরা।
মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও নগরবিদরা বলছেন, একটা শিশু যখন খেলাধুলা করে, তখন তার শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনেও আসে প্রশান্তি। তবে খেলার ধরনের ক্ষেত্রে শিশুরা ইচ্ছেমতো বা অভিভাবকদের মাধ্যমে শিখেও খেলাধুলা করতে পারে। এই দুই ধরনের খেলাই শিশুদের মধ্যে সামাজিক জীব হয়ে ওঠার সামর্থ্য তৈরি করতে সক্ষম। পাশাপাশি সেলফ রেগুলেশনের ক্ষেত্রেও খেলাধুলা ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে নিজ নিজ আচরণ সংশোধন করে নেওয়া এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও তৈরি হয়। তবে বিশেষভাবে শিশুরা যখন ইচ্ছেমতো খেলে, তখন ইনডোর ও আউটডোর দুই ক্ষেত্রেই অন্যের সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে, টার্ন টেকিং করতে শেখে, নিজের সঙ্গে সঙ্গে অন্যের সঙ্গে সমঝে চলতেও শেখে। আসলে খেলাধুলা শেখায়, কী করে বন্ধু তৈরি করে জীবনের পথে এগিয়ে চলতে হয়। 
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কেন্দ্রে মাসব্যাপী আাবাসিক প্রশিক্ষণে অংশ নেন দেশের আড়াইশত ক্ষুদে ক্রিকেটার এই প্রশিক্ষণে অংশ নেন সিলেটের ক্ষুদে ক্রিকেটার নাহিয়ান মুরসালিন অহিন ও আরো দুইজন। ক্ষুদে ক্রিকেটার অহিন প্রশিক্ষণের নানা অভিজ্ঞতার কথা জানালেন । সে জানায়, আবাসিক প্রশিক্ষণের সময় তার রুমমেট ছিলেন আরো ৭ জন। এর মধ্যে ছিলেন ঢাকার বাড্ডার একজন, সাভারের একজন, চট্টগ্রামের ২ জন, নেত্রকোনার পূর্বধলা এলাকার ১ জন ও সিলেটের তার দুজন বন্ধু। 
ক্রিকেটার নাহিয়ান বলেন, চট্টগ্রামের মানুষের রক্তে মাংশে মিশে আছে ক্রিকেট। ক্রিকেটের সাথে তাদের ভালোবাসা, ভালোলাগা যে কি রকম তা চিন্তাই করতে পারবেন না। তাদের কাছে ক্রিকেটের মর্যাদা সীমাহীন। তারা ক্রিকেট পাগল। এক্ষেত্রে সিলেট তাদের ধারেকাছেও নেই। 
সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মাহিউদ্দিন আহমদ সেলিম  বলেন, অতিতের যে কোন সময়ের চেয়ে খেলাধুলায় সিলেট অনেক এগিয়ে। প্রতিবছর সিলেটে গড়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ। নগরীর ব্যক্তি মালিকানাধীন মাঠগুলোতে ধীরে ধীরে আবাসন গড়ে উঠছে। তবে সরকারী মাঠগুলো বেদখল মুক্ত হওয়া উচিত।