মঙ্গলবার   ২০ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৫ ১৪২৬   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

বালিশের চেয়ে নহে কিছু মহিয়ান

স্বদেশ রায়, সাংবাদিক

ড্রীম সিলেট

প্রকাশিত : ০৪:১৪ পিএম, ১ জুন ২০১৯ শনিবার

জন্মেই মায়ের কোলের পরেই পরিচয় ঘটে বালিশের সঙ্গে। তখন মায়ের মুখ হয়তো চেনা হয়ে যায়, বালিশ চেনা হয় কিনা জানিনে। বিজ্ঞানে অতটা জ্ঞান নেই। বিজ্ঞানে যেমন জ্ঞান নেই তেমনি বালিশ সম্পর্কেও কোন জ্ঞান নেই। তবে সম্প্রতি মিডিয়া ও সোশ্যাল ফোরামের বালিশের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়, আমারও আগ্রহ বেড়েছে বালিশে। প্রথমে মনে করেছিলাম এই লেখাটি লেখার আগে কোলকাতা যাবো এবং কলেজ স্ট্রিটে বালিশের ওপর বই খুঁজব। পরে মনে হল, আসলে আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে, তথ্য প্রযুক্তির এই সময়ে কি আর কলেজ স্ট্রীটের পুরানো দোকানে যাওয়া লাগে। স্মার্ট ফোনে চাপ দিলেই তো হয়ে যায়। জানা যায় অনেক বালিশের কথা। তখন মনে হলো সেটা জেনে লাভ কি আমার, আমি তো বালিশের ব্যবসা করবো না বা বালিশ বিশেষজ্ঞ হবো না। তার থেকে শুধু মাথার নিচেই বালিশ থাকুক মাথা থেকে বালিশ ফেলে দেয়া হোক।

তবে ওই যে, হোক বললে তো আর হয় না। এই পৃথিবীতে একটা সমস্যা আছে, যাকে আপনি ফেলে দেবেন সেই আপনাকে আঁকড়ে ধরবে বেশি করে। রবীন্দ্রনাথ এই বুঝে কাউকে পিছনে ফেলতে নিষেধ করেছিলেন, কাউকে পিছে ফেললে সে পশ্চাতে টানে। এখানে হলো আরো সমস্যা। যখনই মাথা থেকে বালিশ ফেলে দিতে গেলাম তখনই কোন ফাঁকে মাথার ভেতর বালিশ ঢুকে গেলো। আর হাজার রকম বালিশের স্মৃতি এখন মাথায় আসছে। প্রথমেই মাথায় এলো কালি ঘাটের পট। আহা! বাবু বসে আছেন, দুপাশে দুটো কোল বালিশ। কালিঘাটের পটে উজ্জল রঙের ব্যবহার হওয়াতে কখনও কখনও কোল বালিশও উজ্জল রঙের। বাবুর কালো গোঁফের সঙ্গেও যেন মিলে গেছে বালিশের ব্যক্তিত্ব। এই তো আবার মুস্কিল হলো চিন্তায়, আবার তো বইয়ের পাঁজা ঘেটে কালি ঘাটের পট কিছু বের করতে হয়। কারণ, পরিস্কার হওয়া দরকার- বালিশের ব্যক্তিত্ব না বাবুর ব্যক্তিত্ব কোনটা মিলেছে গোঁফের সঙ্গে। যেহেতু গোঁফ নিয়ে কথা। গোঁফ বড্ডই বড় বিষয়। পৃথিবীতে যত শিকারী, সবার গোঁফ আছে। সিংহ, বাঘ, বিড়াল। সবই তো “গোঁফ দিয়ে যায় চেনা”। কিন্তু এই কালি ঘাটের পট খুঁজতে গিয়েই মুস্কিল হলো। এখন আর বড় বাজারের বাবু নয়, প্রথমই যে ছবিটি মিললো সেটা বাঈজী পাড়ার বাবুর। সেখানে কোল বালিশও আছে মাথার বালিশও আছে। আহা! বাবুর ঠেস দেবার ভঙ্গিমা! বালিশ না হলে এমন ঠেস কীভাবে দিত! গত ক’দিন বালিশ নিয়ে যা শুনছি, আর এই সব যারা বলছেন তাদের ওপর ক্রোধ জন্মে গেলো। বলতে ইচ্ছে হলো, বালিশ না হলে এমন গজল আর নাচের আসরে এই ঠেস কীভাবে দিতো? ঠেসের কী ভঙ্গিমা! এতো কেবল বালিশ বলেই সম্ভব হয়েছে। বালিশের এই গুণ তো আগে দেখিনি কখনো! মনে মনে খুবই দুঃখ হলো সংক্ষিপ্ত মানব জীবন নিয়ে। জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে গেলাম অথচ বালিশের গুণাগুণ চিন্তা করার সময় পেলাম না কখনই।

এবার কালিঘাটের পটচিত্রগুলো রেখে দিলাম। আর আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া ব্যতিরেকে অন্য কোনো পথ পেলাম না। মনে হলো, শুধু শুধু জীবনের এতটা পথ রাজনৈতিক কলাম লিখে সময় নষ্ট করলাম। মৌলিক কোনো একটা কাজ করলাম না। অথচ এই বালিশ নিয়েই রাজনীতির মৌলিক কাজ করার পথ ছিলো। যৈবন কালে সেটা মাথায় ঢুকলো না! এখন প্রৌঢ়ত্বে এসে হাহুতাশ করা ছাড়া আর কী করার আছে! কত মানুষ রাজনীতির কত দিক নিয়ে গবেষণা করলো। শুনেছি নির্বাচনে সুন্দরবনের বাঘের ভূমিকা নিয়েও নাকি মৌলিক গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণা না করে অর্ধ শিক্ষিত সাংবাদিকই থেকে গেলাম। এ নিয়ে এত দিন কোন দুঃখও ছিলো না। এখন এই বালিশ এসে যত গোলমাল পাকিয়ে দিলো। এখন মাথার ভেতর কেবল কুর কুর করছে, ঠিকই ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বালিশের ভূমিকা’ নামে একটি গবেষণা করলে এতদিনে আমিও ড. ভারে ভারী একজন বুদ্ধিজীবী গোছের কিছু হয়ে যেতে পারতাম। ওই যে কথায় আছে যা হবার নয়, তা কখনো হবে না। তাই তো চুল পেকে সবগুলো সাদা হয়ে যাবার আগে বালিশের কথা মনে পড়লো না। অথচ দেখুন তো একবার হিসেবে করে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বালিশের ভূমিকা পায়ে ঠেলে এমন যোগ্যতা কার আছে! আজ ভারতের কংগ্রেস মোদির হাতে যতই খাবি খাক না কেন, দেশটা স্বাধীন তো এই কংগ্রেসই করেছে। কমিউনিস্ট থেকে শুরু করে মায় ধর্মীয়ওয়ালারা সবাই যখন বৃটিশের কাছে মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বাইরে এসে হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন তখন কংগ্রেস নেতারা একটা কম্বল আর একটা বালিশ নিয়ে শুধু জেলে নয়, তাদের প্রতিটি ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংও হচ্ছে বালিশে হেলান দিয়ে। এই বালিশে হেলান দেয়া ছবি কি কম আছে। মতিলাল নেহরু, লালা লাজপত রায়, দাদা ভাই নৌরাজি থেকে সীমান্ত গান্ধী সবাই বালিশে হেলান দিয়ে বসেই তো ওয়ার্কিং কমিটিতে ইংরেজ তাড়ানোর সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গান্ধীজির কাপড় ছাড়া খালি হাটুটি তো বালিশেই থাকতো। আর এই বালিশই যে সব থেকে শক্তিশালী তা তো ইতিহাসেরই সত্য। এই বালিশ ছেড়ে কংগ্রেস যতবার গোল টেবিলে বসেছে ততবারই সব আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ চেয়ার টেবিলের কোন অবদান নেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে। বরং বালিশে হেলান দিয়ে বসে যে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজপথে নেমেছে কংগ্রেস সেই সিদ্ধান্তেই তো দেশ জুড়ে আন্দোলন হয়েছে। আর যার ধাক্কায় একটু করে লেজ পেটের মধ্যে পুরে নেয় ইংরেজ। বালিশের এই শক্তিকে তাই শুধু জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ধরে রাখেনি, এখনো তাকে চির সঞ্জবনী সুধা মনে করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। যে কারণে এই স্মার্টফোন টেকনোলজির যুগেও ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসেই কংগ্রেস নেতারা আইফোনে কথা বলেন, আই প্যাডে নোট রাখেন। স্টিভ জবসকেও তারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন, নতুন টেকনোলজি যতই আসুক বালিশের অর্ন্তনিহিত শক্তির মত শক্তি আর কোন কিছুতে নেই।

এখন মাথার ভেতর একের পর এক বালিশের কথা আসছে। ভারতীয় জোতদারদের শরীর ঠান্ডা করার জন্যে নাকি তেল লাগানো কাপড়ের বালিশ ছিলো। জমিদাররা সে বালিশ নোংরা বলে ফুটো করে দিয়ে যেতো। হায়রে, আবার জীবনের বড় ভুল। এসব তথ্য জেনেও বালিশ চিনতে পারলাম না। যৈবনে চিনলে ঠিকই সমাজ সংস্কারে বালিশ নিয়ে বড় একটা কিছু লিখে ফেলতে পারতাম। তাছাড়া নিজেও তো বালিশের অধীন। সারা জীবন রাজনীতির ছাইপাশ লিখে ঘাড়ে ব্যথা তৈরি করে এখন রাত হলে কার্ভ পিলোতে শুতে হয়। তা নাহলে সকালে ঘাড়টি একেবারে সম্মুখমুখী থাকে। একেবারে সোজাসুজিপন্থী হয়ে যেতে হয় তখন। অথচ একটু ডানে আর একটু বামে না হেললে কি এই সমাজে চলা যায়! আর সে হেলতে গেলেই এখন সাহায্য নিতে হয় কার্ভ পিলো’র। এখন তো সব ভেবে মনে হচ্ছে এ জীবনে বালিশ চিনতে না পেরেই আসল ভুলটি করে গেলাম। এখন বুঝতে পারছি বালিশ চিনতে হবে। এই যে ফেসবুকের পাতায় পাতায়, টেলিভিশনে, পত্রিকার পাতায় যারা রূপপুরের বালিশের নিন্দা করছেন তাদের বলি দোহাই, থামুন। আর বালিশের নিন্দা নয়। বাঁচতে হলে বালিশ চিনুন।

বরং সবাই শুনুন,
গাহি বালিশের গান, বালিশের চেয়ে বড় কিছু নয়, নয় কিছু মহিয়ান।
গাও সবে রূপপুরের বালিশের জয়গান।