বুধবার   ১৬ অক্টোবর ২০১৯   আশ্বিন ৩০ ১৪২৬   ১৬ সফর ১৪৪১

৪২৪

ক্রিকেট বিশ্বকাপ ‘জুয়া’ খেলায় ভূগছে সিলেট

প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০১৯ ২০ ০৮ ১০  

এ টি এম তুরাব:: এ এক অন্য রকম নেশা। আর এই নেশায় জড়িয়ে আছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ, সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছাড়াও ধণাঢ্য ব্যক্তিরা। কোথাও কোথাও খেটে খাওয়া দিনমজুররা এ ফাঁদে পা দিয়েছে। শুনে হয়তো অবাক হওয়ারই কথা। তবে এতে অবাক হওয়ার কোন কারণ নেই। এই নেশায় পা দিয়ে প্রতিদিন সিলেটের অসংখ্য পরিবার স্বর্বশান্ত হচ্ছে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনযাত্রায়। 
ইংল্যান্ডে ঝমকালো আয়োজনের মধ্য নিয়ে চলছে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ ও বিপিএল’র শিরোপার লড়াই যেমন জমেছে, তেমন জমেছে এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জমজমাট এ আসরটিও। এ যেন পুরো পৃথিবী বিশ্বকাপ ক্রিকেট জ্বরে কাঁপছে। ক্রিকেট খেলা চলেছে মাঠে, আর খেলার মাঠে না গিয়েই ব্যাটিং, বোলিং করা যায় পাশাপশি উইকেটও পাওয়া যায়। কোন খেলোয়াড় কতো রান করবেন, কতো উইকেট নিবেন। কে কয়টি চার, ছক্কাসহ রান করবেন, চলতি ওভারে বোলার উইকেট পাবে কি-পাবে না, ব্যাটম্যানরা কতো রান করবেন এসব বলে-বলে জুয়া হচ্ছে। কি শুনে অবাক হচ্ছে? না অবাক হওয়ার কোন কারণ নেই। ঘরে বসে কিংবা টিভির সামনে বসে টাকা উপার্জন করা যেমন সহজ তেমনি অনেকে আবার সর্বস্ব^ হারাচ্ছেন। এই ভয়ঙ্কর নেশার নাম হলো ‘অনলাইন জুয়া’। এটি এখন বিশ্ব ছাড়িয়ে বাংলাদেশে রমরমা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকলেও তবু থামছে না, দিনদিন বেড়েই চলছে।  
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বকাপ ক্রিকেট ঘিরে বেশিরভাগ জুয়ার আসর বসছে নগরের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও ভাড়া বাড়িতে। বাজিকররা টিভির স্ক্রিনে খেলা দেখে দেখে ধরছেন বাজি। তাদের বেশিরভাগ পরস্পর বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিচিতজন হওয়ায় নগদ টাকার পরিবর্তে এ বাজিতে নানা ধরনের টোকেন ব্যবহার করছে। যারা বাজি ধরেন তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৫ থেকে ২৫-৩০ বছর। যাদের বয়স বেশি বা বাজিতে যারা বিশেষজ্ঞ এঁরা কম বয়সীদের কাছে ‘বাজির ডন’ হিসাবে পরিচিত। সিলেট নগরের বন্দরবাজার, তালতলা, কাজিরবাজার, শেখঘাট, রিকাবীবাজার, ওসমানী মেডিকেল রোড, বাঘবাড়ি, পাঠানটুলা, কালিবাড়ি, আখালিয়া, সুবিদবাজার, আম্বরখানা শাহী ঈদগাহ, টিলাগড়, শিবগঞ্জ, উপশহর, সোবহানীঘাট, চালিবন্দর, মাছিমপুর, মহাজনপট্টী, কালিঘাট, কদমতলী, রেলস্টোশন এলাকায় বাজিকরদের বিচরণ সবচেয়ে বেশি। তবে নগরীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ছাড়া সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় এর কমবেশি বিস্তার রয়েছে।
জুয়াড়িদের এ ধান্দায় বাদ নেই নগরের অভিজাত এলাকাগুলো। ধনীর দুলালরা বাজি ধরেন বিভিন্নভাবে। অভিজাত হোটেলে গিয়ে তারা মোটা অংকের বাজি ধরেন। দলগত হার-জিত নির্ধারণ ছাড়া পাশাপাশি চলতি ওভার বা ‘বল বাই বল’, উইকেট, কতো রান হবে এসব নিয়ে বাজি। পাশাপাশি ম্যাচে পাওয়ার প্লেতে (প্রথম ৬ ওভার) কতো রান হবে, ৫ থেকে ১০ ওভারে কতো রান হবে, টোটাল রান কতো হবে, কোন প্লেয়ার বেশি রান করবে সবকিছু নিয়েই চলে বাজি। বিশেষ করে বাংলাদেশের খেলা থাকলে জুয়ার আসর সবচেয়ে বেশি জমে ওঠে।
সুত্র জানায়, জুয়া ভিত্তিক অসংখ্য ওয়েবসাইট গড়ে উঠেছে। বিশ্বকাপ, আইপিএল, বিপিএল কিংবা ঘরোয়া খেলা নিয়েই জুয়া হচ্ছে এসব সাইটে।  অনলাইনে ক্রিকেট ছাড়াও বেটিং সাইট লিংকের মধ্যে বিশ্বের জনপ্রিয় যে কোন খেলাধুলায় অংশ নিতে পারবেন। এজন্য প্রথমে অ্যাকাউন্ট খুলতে ৫শ’ টাকা দিতে হয়। পরিচিত একটি সাইটে নাম, ঠিকানা, বয়স সহ অনেক তথ্য দিয়েই অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও এটি ভেরিফাইয়ের জন্য প্রয়োজন হয় পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা ড্রাইভিং লাইন্সেস এছাড়াও ব্যাংক স্টেটমেন্টের ছবি তুলে সাবমিট করতে হয়। সাধারণত জুয়ার টাকা পেমেন্ট করা হয় নিটেলার ও স্ক্রল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। এরপর অ্যাকাউন্ট লগইন করে পছন্দ মতো খেলাটি বেছে নেন। অ্যাকাউন্টে ২০ টাকা ডিপোজিট করেই অনলাইনে বেট করা যায়। তারপর কোন দলের পক্ষে, কিসের উপর বেট করবেন তা সিলেক্ট করতে হয়। সেইসঙ্গে ডলার বা সেন্টের পরিমাণও সিলেক্ট করে কিক করতে হয়। খেলায় হারলে টাকা কেটে নেবে আর জিতলে অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হবে। খেলায় অংশ নিতে অনেকে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে নিটেলার ও স্ক্রল অ্যাকাউন্টের ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে বলে অনেক জুয়াড়িরা জানান। লাভ হলে বাজি ধরা ডলারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আর লস হলে যা ধরলেন তা। এই লোভে জুয়া খেলায় জড়িয়ে যাচ্ছেন অনেকে। শখের বশে কিংবা বিনা পরিশ্রমে ঘরে বসে বসে টাকা আয় করতে গিয়ে নেশাগ্রস্ত হচ্ছেন তরুণ, যুবক ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষজন। জুয়া খেলায় সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই। তাদের বেশিরভাগই স্কুল, কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থী ও ক্ষুদে ব্যবসায়ী এবং দিনমজুর। 
নগরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী আবুল মনসুর মোঃ ফারুক সেলিম বলেন, বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে ঘিরে জুয়া শুধু নগরীতে নয়, পুরো সিলেটসহ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ জুয়াতে তরুণ ও যুবকরা বেশি ঝুঁকে নিঃস্ব হচ্ছেন। তরুণ ও যুবকদের এ জুয়াবাজির কবল থেকে রক্ষা করতে হলে প্রশাসনকে আরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
অপরাধ পর্যবেক্ষকদের অভিমত, বিশ্বের পাঁচটি বাজিক’র দেশের মধ্যে ভারত এবং পাকিস্তানের নাম রয়েছে। আর প্রতিবেশী এ দুটি দেশ থেকেই বাংলাদেশে প্রথমে আইপিএল, বিপিএল এরপর বিশ্বকাপ। এমনকি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ঘরোয়া ক্রিকেটলীগ, ফুটবল লীগগুলোকে ঘিরে বাজিকররা রমরমা বাণিজ্য জমিয়ে তুলেছে। শুরুতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর না হওয়ায় জুয়ারি সিন্ডিকেট এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে অবৈধ আর্থিক লেনদেন দিন দিন বাড়ছেই। আর এতেই জুয়াড়িদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। চলতি এই ক্রিকেট বিশ্বকাপ আসরে অনলাইনে সিলেটসহ দেশে অন্তত শত কোটি টাকার জুয়া হয়েছে। আর বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও কয়েকগুণ হবে বলে ধারণা করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (দক্ষিণ) এর সহকারী কমিশনার জুবের আহমদ জানান, বিশ্বকাপ ক্রিকেট ঘিরে সক্রিয় জুয়াড়িদের ধরতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাড়া-মহল্লায় এমনকি অলিগলিতে যেসব স্থানে টিভিতে খেলা দেখানো হয় সেসব স্পটে গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করা হয়েছে। জুয়ার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। 
তবে বাসা-বাড়িতে এ ধরনের অপতৎপরতা চললে তা বন্ধ করা দুস্কর বলে মন্তব্য করেন জুবের আহমদ বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পক্ষে জুয়া খেলা একা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য সামাজিক ভাবে এর বিরোধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
 

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট
এই বিভাগের আরো খবর