দেওয়ান ফরিদ গাজী ছিলেন রাজনীতির বাতিঘর


মবরুর আহমদ সাজু:: | ০৮:৩৩ অপরাহ্ন, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

IMG



জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীকে পাঠ করা এখন সময়ের দাবি। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আদর্শিক এ জাতীয় নেতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সার্বিক গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই প্রত্যেক রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য অনুসরণীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস।  আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত প্রাণ সৎ ও সাহসী রাজনীতিবিদ ফরিদ গাজী ছিলেন, আপোষহীন ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদপুরুষ। তিনি আজীবন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও  অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম করেছেন। তাঁর রাজনীতির আদর্শ বাস্তবায়ন করা দরকার। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওয়ার্কশপ, সেমিনার আয়োজন করে তাঁর সেই অভিজ্ঞতা, ভাবনা, আদর্শ, অনুশীলন, সাফল্য, সব বিষয়ে জানা ও চর্চা করা, অনুসরণ প্রয়োজন।’ দেওয়ান ফরিদ গাজী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি সুন্দর সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা, তরুণ প্রজন্ম আজকের বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তরুণ প্রজন্মর হাত ধরেই এগিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ।

আসলে কোনো প্রাগৈতিহাসিক সূচনা নয়। আমার লেখাপড়া কিংবা আমার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ার স্মৃতি শক্তি যদি আমার সাথে প্রতারণা না করে, তাহলে বলব বাংলাদেশের রাজিনীতির ইতিহাসে যে কয়েকজন বাতিঘর ছিলেন, এরমধ্যে দেওয়ান ফরিদ গাজী বাংলাদেশের রাজনীতির সব সংস্কৃতিতে বিচরণকারী ব্যক্তিত্বময় একজন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, বৃহত্তর সিলেট আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনের ৪ ও ৫ নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক চেয়ারম্যান ৫ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য সিলেটের মাটি ও মানুষের নেতা কিংবদন্তী জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীকে পাঠ করা করা এখন সময়ের দাবী। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে কুটিলতাহীন, সজ্জন, সহজ-সরল রাজনীতির আদর্শ ছিলেন তিনি। তার বর্ণাট্য রাজনৈতিক জীবনে অসম্মানজনক বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের দৃষ্টান্ত বিরল। জাতির ক্রান্তিকালে কোনো দল-জোটের না হয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গোটা রাজনীতি পুনরুদ্ধারের বাতিঘর। চরম সংকটেও তিনি ছিলেন দৃঢ়-স্থির, অবিচল, জীবন্ত। জনসম্পৃক্ততা ও জনকল্যাণই ছিল তাঁর শক্তি, উৎসাহ ও লক্ষ্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ইতিহাসে তার তুলনা শুধু তিনিই। রাজনীতির যে কোনো তত্ত্ব-বিচারে দেওয়ান ফরিদ গাজী ভদ্র ও উদার রাজনীতির আদর্শ। আসছে তার মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। 
সময়ের সাথে পল্লা দিয়ে দেশে  রাজনীতিতে যে, ক্রমবর্ধমান কোনদিকে হাটছে তা বলা মুশকিল। তবে,সমাজতন্ত্রী মার্ক্সবাদী, বিপ্লবী, চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ এবং কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব এর্নেস্তো চেগুয়েভারা বলেছিলেন, ‘বিপ্লবী হতে চাও? বিল্পবের প্রথম শর্ত, শিক্ষিত হও।’ আর শিক্ষা মানেই মঙ্গল ও কল্যাণের পথ, অন্ধকার কুসংস্কার থেকে আলো ও প্রগতির দিকে এগিয়ে চলা। শিক্ষিত মানেই আলোকিত মানুষ, পথপদর্শক। আর রাজনীতি হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর আদর্শকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিফলিত করা। রাজনীতি লক্ষ্য হলো সমাজকে সংস্কার করে কল্যাণের পথে এবং উন্নতির দিকে ধাবিত করা। 
সময়ে রাজনীতিেিত  বলতে হচ্ছে। দেওয়ান ফরিদ গাজী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি সুন্দর সমাজের প্রতিচ্ছবি, একটি সংগীত, একটি জাতির অহংকার, একটি পতাকা, সর্বোপরি একটি দেশ। মানব কল্যাণে তাঁর সকল কর্ম ফরিদগাজীকে দিয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার তাজ। বাঙ্গালী জাতীর মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অনবদ্য গৌরবোজ্জল স্বর্ণালী উপাখ্যানের জন্য জাতি যেমন তাঁকে কখনো ভুলবে না, তেমনি ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায় থেকে দেওয়ান ফরিদ গাজীর নামটি কখনো মুছে যাবে না। দেওয়ান ফরিদ গাজী ১৯৭২ সালে প্রথম হস্তলিখিত বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের স্বাক্ষরকারীদের একজন। ১৯৭৩ সালে সিলেট আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে তিনি হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, ২০০১ সালে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সর্বশেষ ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে ৭৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদন্দ্বীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। নবীগঞ্জ-বাহুবলের মানুষের জন্য ৯১ থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার বিরামহীন ছুটে চলা, সংগঠনের জন্য কাজ করা, নেতা-কর্মীদের আদর স্নেহ, ভালবাসা দেয়া, তাদের থাকা খাওয়া ও জীবন মানের উন্নতির চিন্তাই ছিল যার নিত্য দিনের খড়চা। আজ সেই কর্মবীর দেওয়ান ফরিদ গাজী নেই, দেখতে দেখতে ৯ বছর চলে গেছে।
আজকের তরুণ প্রজন্মরা রাজনীতির ইতিহাস পড়ে জানতে পারে। পঞ্চাশ-ষাট দশকে ছাত্র রাজনীতির কথা শুনলে ভেসে উঠতো একজন মেধাবী, শিক্ষিত, সমাজ সচেতন, নিষ্ঠাবান, সৎ এক তরুণের ছবি। তিনি হলেন, দেওয়ান ফরিদ গাজী। প্রিয় পাঠক  রাজনীতির দিকপাল ফরিদ গাজীর। কথাটি লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমানকে। তাঁর কবিতার ভাষায় বলতে হয়-স্বাধীনতা তুমি বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর শাণিত কথার ঝলশানি লাগা সতেজ ভাষণ।
‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, "সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকেও পড়বে না আবার মাটি থেকেও গজাবে না। সোনার মানুষ আমাদের মধ্যে থেকেই তৈরি হতে হবে।" সেই সোনার মানুষ, শিক্ষিত ও সুস্থ রাজনীতির পথিকৃৎ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান ফরিদ গাজী, তিনি একজন ক্ষণজন্মা কর্মযোগী মানুষের নাম। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর। বাংলাদেশ তথা সিলেটে বিভাগের তৃণমূল পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে একজন পথিকৃত্, নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও প্রাতঃস্মরণীয় জননেতা। অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত জনদরদী, স্বল্পভাষী, বিনয়ী, রুচিশীল, দূরদর্শী এই নেতার গণমুখী টেকসই উন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকান্ড ইতিহাসের পাতায় ও এলাকাবাসীর মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরদিন। আজ থেকে ৯বছর আগে তিনি নভেম্বর মাসে চলে যান না ফেরার দেশে। সমকালীন রাজনীতিতে বেশ প্রয়োজন ছিল তার।  আমরা, তরুণ প্রজন্ম আজকের বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করি। আমাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ। অর্জিত হতে পারে কাঙ্ক্ষিত সব স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন। আর সে জন্য চাই সব ক্ষেত্র সব মাধ্যমে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। হোক সে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে, সেবা ক্ষেত্রে, চাকরি, ব্যবসা, শিল্প, কিংবা খেলাধুলায়।  আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন এবং তার পরবর্তী প্রেক্ষাপট তৈরিই তো হয়েছিল তরুণদের প্রচেষ্টায়।  ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৬ দফা আন্দোলন, ’৭১-এর মুক্তি সংগ্রাম, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনসহ সব আন্দোলনের প্রাণ ছিল অকুতোভয় বাংলার দামাল ছেলেরা। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে আজ আমরা একটি নতুন প্রজন্মের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। এই আগামীর পথচলায় আবার নতুন করে তরুণদের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও অন্যান্য পেশাদারিত্বে আমাদের তরুণদের অর্জন ঈর্ষণীয় হলেও শুধু একটি ক্ষেত্রে চরম অনীহা ও ব্যর্থতা লক্ষণীয়। আর তা হলো ‘রাজনীতি’। একথা সত্য যে, ছাত্ররাজনীতি আজও এদেশে বিদ্যমান। তবে যে কাঙ্ক্ষিত সুস্থ এবং প্রগতিশীল রাজনীতির চর্চা সবাই প্রত্যাশা করে তার সঙ্গে বর্তমান ছাত্ররাজনীতির যোজন যোজন দূরত্ব।
সুতারাং এই যখন বাস্তবতা। তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম, মানবকল্যান, গনতন্ত্রের সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তার কাজ আমাদের প্রেরণা যোগাবে, অমরত্ব দেয়। তার মতোন মানুষ তার দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, নির্লোভ আদর্শিক আতœমর্যাদাবোধ ও নিরলস সংগ্রামের প্রতি নত থাকবে শ্রদ্ধায়,ভালোবাসায়। বাহুবল-নবীগঞ্জ আসনের বার বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত আলহাজ্ব দেওয়ান ফরিদ গাজী ছিলেন একজন কিংবদন্তী জাতীয় জনপ্রিয় নেতা। সামনের মাসে ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এই দিনে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরন করছি। জানতে পারি শৈশবকাল থেকে তিনি জনসাধারণের কল্যাণে কাজ করে মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি জমিদার পরিবারের হলেও জমিদারী প্রথা বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যা মানুষ কোন দিন ভুলবে না। ফরিদ গাজীর বর্ণ্যাঢ্য জীবনে রয়েছে অনেক অজানা কাহিনী। নির্বাচনী এলাকাসহ সিলেট তথা সারা দেশে সুনাম অর্জন করেন তিনি। দেওয়ান ফরিদ গাজী প্রথম জীবন কেটেছে প্রত্যক্য সংগ্রাম, প্রতিরোধ, অতঃপর বিজয়ের মধ্য দিয়ে সফলও এনেছেন ঘরে। ২য় জীবন কেটেছে দেশ পুণর্গঠনে ও গণতন্ত্রের মঞ্চ বিনির্মাণে। পুরো পাকিস্তানী আমল তিনি ছিলেন প্রতিবাদী ও সংগ্রামী। এই সত্য উপলদ্ধি করেই জনগণ তাকে ‘নেতা’ বানিয়েছেন ভোটের মাধ্যমে দেওয়ান ফরিদগাজীর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোকপাত করতে হলে কিশোর বয়সের স্কুল জীবনের কিছু কিছু ঘটনাবলীর উপর আমাদেরকে সুনিপুনভাবে অবলোকন করতে হবে। দেওয়ান ফরিদ, গাজী,  ১৯২৪ সালের ১ মার্চ হবিগঞ্জ জেলায় নবীগঞ্জ থানার দেবপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা দেওয়ান মোহাম্মদ হামিদ গাজী ছিলেন দিনারপুর পরগণার জমিদার। ফরিদ গাজী হযরত শাহজালাল মুজাররদ-ই-ইয়েমেনীর (র) সফরসঙ্গী হযরত তাজউদ্দিন কোরেশীর (র) ১৬তম বংশধর। দেওয়ান ফরিদ গাজীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়  গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। এরপর তিনি মৌলভীবাজার জুনিয়র মাদ্রাসা এবং সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেন। পরে মাদ্রাসা কারিকুলাম ত্যাগ করে সিলেট রসময় মেমোরিয়াল হাইস্কুলে ভর্তি হন। তিনি রসময় হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা, ১৯৪৭ সালে সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৯ সালে সিলেট মদন মোহন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।ফরিদ গাজী ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৪২ সালে ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগের অঙ্গ সংগঠন আসাম মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। তিনি ছাত্র ফেডারেশনের আসাম প্রাদেশিক শাখার সহ-সম্পাদক এবং সিলেট এম. সি কলেজ শাখার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৫ সালে আসামে অহমীয়দের ‘বাঙ্গাল খেদাও’ অভিযানের প্রতিবাদে আন্দোলন এবং লাইন প্রথা বিলোপ আন্দোলনের একজন অগ্রণী কর্মী ছিলেন ফরিদ গাজী। এ সব আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য বহুবার তাঁকে পুলিশী নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ১৯৪৭ সালে সিলেটের গণভোটে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে তিনি সিলেটে আন্দোলন সংগঠনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫০ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিহত করার লক্ষ্যে সূচিত শান্তি আন্দোলনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। 
ইতিহাস উদঘাটন করে জানাযায়, মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজী ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানার দেবপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দেওয়ান হামিদ গাজী। হযরত শাহ জালাল (র.) এর সাথী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ তাজ উদ্দিন কুরেশী তাদের পূর্ব পুরুষ। ১৯৫৩’ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত সিলেটের প্রাচীনতম ‘সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। 
‘১৯৪২সালে কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে যোগদান করেন। তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৫ সালে আসামে বাঙ্গাল খেদাও আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে গণভোট, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। 
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিয়ে রাজনীতি শুরু করা এই রাজনৈতিক ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে সিলেট- ১ আসন থেকে জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু সরকারের স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ফরিদ গাজী ছিলেন সংস্কৃতিমনা এবং শিক্ষার উদার পৃষ্ঠপোষক। সিলেট অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি সুদীর্ঘকাল সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি ছিলেন। উদার হৃদয়ে মানুষ ফরিদ গাজী অত্যন্ত সাদাসিদা জীবনযাপন করতেন। নিরহঙ্কার ও সজ্জন এই মানুষটি দলমত নির্বিশেষে ছিলেন সকল শ্রেণির লোকের শ্রদ্ধাভাজন। দেওয়ান ফরিদ গাজী ২০১০ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে সিলেটে হজরত শাহজালালের (রহ.) মাযার সংলগ্ন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। সর্বোপরি, ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আদর্শিক এ জাতীয় নেতার শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সার্বিক গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই প্রত্যেক রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য অনুসরণীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস।  আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত প্রাণ সৎ ও সাহসী রাজনীতিবিদ ফরিদ গাজী ছিলেন, আপোষহীন ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদপুরুষ। তিনি আজীবন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও  অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম করেছেন। তার হাত ধরে যারা আজকে রাজনীতি করছেন তার রাজনীতির আদর্শ বাস্তবায়ন করা দরকার। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওয়ার্কশপ, সেমিনার আয়োজন করে তাঁর সেই অভিজ্ঞতা, ভাবনা, আদর্শ, অনুশীলন, সাফল্য, সব বিষয়ে জানা ও চর্চা করা, অনুসরণ বেশ প্রয়োজন।’ দেওয়ান ফরিদ গাজী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি সুন্দর সমাজের প্রতিচ্ছবি, একটি সংগীত, একটি জাতির অহংকার। আমরা, তরুণ প্রজন্ম আজকের বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করি। তরুণ প্রজন্মর হাত ধরেই এগিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ” সিলেটের মাটি ও মানুষের নেতা কিংবদন্তী জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীকে পাঠ করা করা এখন সময়ের দাবী
লেখক : কবি ও সাংবাদিক




সম্পর্কিত খবর -----------------------------






লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন




পুরানো খবর দেখুন