মুসলিম বিশ্ব কবি-আল্লামা ইকবাল


| ০৪:০৪ অপরাহ্ন, নভেম্বর ০১, ২০১৯

IMG



আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (জন্ম ৯ নভেম্বর. ১৮৭৭ঃ শিয়ালকোট. পাঞ্জাব পাকিস্তান
মৃত্যু: ২১শে এপ্রিল. ১৯৩৮) ছিলেন বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ। উনার ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইকবাল উনার ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। উনার একটি বিখ্যাত চিন্তা দর্শন হচ্ছে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন। এই চিন্তাই বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। উনার নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই বিশ্বে পরিচিত। উনার ফার্সি সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ; তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত।

আল্লামা ইকবালের ১২৯৪ হিজরী ৩রা যিলকদ মোতাবেক ১৮৭৭ খৃস্টাব্দে ৯ই নভেম্বর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লামা ইকবালের পিতার নাম শেখ নূর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন একজন সূফী-দরবেশ শ্রেণীর লোক। ইলমে তাছাউফের প্রতি তার ছিল প্রবল আকর্ষণ। নামায, রোযা, তাসবীহ-তাহলীল, মোরাকাবা-মোশাহাদার মাধ্যমে তিনি অতিবাহিত করতেন দিবসের অধিকাংশ সময়। শিখ শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে শিখ-মুসলিম দাঙ্গার সময় কাশ্মীর ছেড়ে সিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন তিনি। আল্লামা ইকবালের মাতা ইমাম বিবিও ছিলেন পিতার মতই একজন ধর্মভীরু পরহেযগার মহিলা।

পাঞ্জাবের বৃটিশ আর্মির কাছে শিখদের পরাজয়ের পর খ্রিষ্টান মিশনারীরা শিয়ালকোটে শিক্ষা প্রচারের উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এই সময়েই শিয়ালকোটে স্কটিশ মিশন কলেজ স্থাপিত হয়। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ লিবারেল আর্টস্ এর কোর্সসমূহের অনেকগুলোতেই আরবি ও ফার্সি ভাষা মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হতো। যদিও এই সময় বেশীর ভাগ স্কুলেই ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। এই স্কটিশ মিশন কলেজেই ইকবাল সর্বপ্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্ত হন।

ইকবাল উনার কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতি পান উনার শিক্ষক সাইয়িদ মীর হাসানের কাছ থেকে। ১৮৯২ সালে ইকবাল স্কটিশ মিশন কলেজ হতে উনার পড়াশোন শেষ করেন।

১৮৮৫ সালে স্কটিশ মিশন কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ইকবাল লাহোরের সরকারী কলেজে ভর্তি হন। দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্য নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এখান থেকে তিনি স্বর্ণ পদক নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে যখন তিনি মাষ্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন ততদিনে তিনি সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত ব্যক্তিত্ব।

মাষ্টার্স ডিগ্রীতে পড়বার সময় ইকবাল স্যার টমাস আর্নল্ড এর সংস্পর্শে আসেন। এই শিক্ষাবিদ ইসলাম ও আধুনিক দর্শনে বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইকবালের কাছে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন। স্যার টমাস আর্নল্ডই ইকবালকে ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

১৮৯৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পারিবারিক প্রথা অনুযায়ি ইকবাল গুজরাটের সিভিল সার্জন খান বাহাদুর আতা মুহাম্মদের কন্যা করিম বিবি কে বিয়ে করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে উনার কন্যা মেরাজ বিবি ও পুত্র আফতাব ইকবালের জন্ম হয়। এ স্ত্রীর সাথে তার মনোমালিন্য হলে তারা আলাদা বাস করতে থাকেন। প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছিন্নতার পর এক কাশ্মিরী পরিবারের সরদার বেগম নামীয় মহিলার সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ হয়। এই স্ত্রীকে তিনি বিবাহের চার বছর পর ঘরে তোলেন এবং তার গর্ভেই ১৯২৪ সালে জাবিদ ইকবালের জন্ম হয়। ইকবালের তৃতীয় বিবাহ ১৯১২ সালে লুধিয়ানানিবাসী মোখতার বিবি’র সাথে। সন্তান প্রসবকালে তার মৃত্যু হয়। শেষ জীবনে ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েলে প্রথম স্ত্রী করিম বিবির ধারস্থ হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত এই স্ত্রীই তাঁকে সঙ্গ দেন।

১৯২৩ সালে বৃটিশ সরকার ইকবালকে নাইট খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। তার এই নাইট প্রাপ্তি ভক্ত অনুরাগীদের মাঝে ভূল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদী কবিরা ব্যাঙ্গাত করে কবিতা লিখে উনাকে আক্রমণ করে।
এমনকি উনার বন্ধুরা চিঠি লিখে উনার মতামত জানতে চায় এবং আশ্বস্ত হতে চায় ঘটনা যেন কোন ক্রমেই তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কিংবা কওমের প্রতি খেদমতে বাঁধার সৃষ্টি না করে। আল্লামা ইকবাল বাকী জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেগেছেন যে, তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলন নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালীন সময়ে
উপ-মহাদেশের নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিশেষ করে মুসলমানদের দু:খজনক চিত্র উনাকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক শক্তিশালী হওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুসলমানদেও উত্তরণ আর সম্ভব নয়। মুসলমানদের প্রতিটি সমস্যায় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষে আমৃত্যু রাজনীতির কঠিন ময়দানে বিচরণ করেন তিনি। তিনি ১৯২৬ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সরকার ভবিষ্যৎ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পটভূমি তৈরীর প্রত্যাশায় “সাইমন কমিশন” প্রেরন করলে কংগ্রেস দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবাল নওয়াব জুলফিকার আলী খান ও মাওলানা মোহাম্মদ আলীর সাথে যৌথভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনকে সহযোগীতার আশ্বাস দেন। তিনি মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলেন, যদি আমরা কমিশনকে সহায়তা না করি তবে বৃটিশরা মুসলমানদের স্বার্থকেই বিঘিন্ত করবে। আল্লামা ইকবালের এই ধারণা বৃটিশদের শাসন পরিচালনায় মুসলমানরা হারে হারে টের পেয়েছিল। বৃটিশরা সবসময় মুসলমানদের কাছ থেকে মতা দখল করার কারণে মুসলমানদেরকেই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করছে। যা তাদের দীর্ঘ দিনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে।

মুসলমান শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরী মুসলমান ভাইদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরীরা আঞ্জুমান নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মুলতঃ কাশ্মীরী। তার পূর্বপুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েই কশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন।
১৯৩০ সালের দিকে মুসলমানদের প্রতি যুলুম-নির্যাতন অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। ডোগরা মহারাজার ক্রমবর্ধমান জুলুম, নির্যাতনের প্রতিবাদে লাহোরে সর্বভারতীয় কাশ্মীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কাশ্মীর প্রশাসনের অন্যায় নির্যাতনের সমালোচনা করে প্রস্তাব গৃহিত হয়। আল্লামা ইকবাল এই প্রস্তাবের প্রতি একাত্মতা পোষন করেন। এ সময় তিনি মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি কাশ্মীরিদের সার্বিক সমস্যার কথা সরকারের কাছে যথাযথ ভবে তুলে ধরেন। এর প্রেক্ষিতে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কাশ্মীরিদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়।

১৯৩২ সালে আলোয়ার রাজ্যের মহারাজা কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানগণ ‘খাদেমুল মুসলিমিন’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করালে মহারাজার সরকার এটিকে বেআইনী ঘোষণা করে। এ অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে মুসলমানরা বিক্ষুভ করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শহীদ হন প্রায় এক শত মুসলমান। এরপর শুরু হয় গণ-গ্রেফতার। বাড়ী ঘরে ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানগণ। এই অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আল্লামা ইকবাল ভাইসরয় লর্ড ওয়েলিংটনের নিকট একটি স্মারক লিপি পেশ করেন। পরিণতিতে মুসলমানগণ ফেরারী জীবন ছেড়ে বাড়ী ফেরার সুযোগ পায়।

১৯৩৬ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত হন। একই সালে পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের লে অনুষ্ঠিত সভায় সর্ব-সম্মতিক্রমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয় তাকে। ১৯৩৮ সালে লাহোরে মসজিদের দখল নিয়ে শিখ-মুসলমান দাঙ্গার সময় আল্লামা ইকবাল মসজিদ পুনরুদ্ধারে শাহাদাত প্রত্যাশি মুসলমান যুবকদের উৎসাহ যোগান। এক কথায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

এরপরও কেউ কেউ আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে একজন মুসলমানের এরচেয়ে কতটুকু বেশী করার সুযোগ ছিল তা কিন্তু প্রশ্ন সাপে। সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় মুসলমানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আল্লামা ইকবালের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনিই সর্ব প্রথম মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবী উত্থাপন করেন। এই দাবীই পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সূচনা করে।

সব চেয়ে বড় কথা হল আল্লামা ইকবাল কেবল মাত্র রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন নি। জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কাজ তিনি চালিয়ে যান সমান তালে। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়েই ৬টি বক্তৃতা দেন তিনি। এর পরপরই বাঙ্গালুর হায়দারাবাদ এবং আলীগড়ে বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ পান। তার এ সকল বক্তৃতা The Reconstruction of Religious Thought in Islam নামক পুস্তকে প্রকাশিত হয়। যা আল্লামা ইকবালের চিন্তার গভীরতার
স্যা বহন করে।

ইকবাল গদ্য-পদ্য উভয় রচনাতেই ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। তিনি ছিলেন মুক্তছন্দ কবি ও লেখক। তিনি লেখালেখি করেছেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর। অর্থনীতির মত জটিল বিষয় থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতার মতো বিমূর্ত বিষয় পর্যন্ত উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

এই বিশ্ব মানবতার মুসলিম কবির কবর ও আখেরাত জীবন যেনো হয় নূরের আঁলোয় আঁলোকিতো এই কামনায় - শিহাব খান




সম্পর্কিত খবর -----------------------------






লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন




পুরানো খবর দেখুন