বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কানাইঘাটের কটালপুরে খাজা নিজাম উদ্দিন ভূইয়া ‘তোমরা পিছে চলে যাও, আমি ওদের দেখছি’



স্মরণ : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে
আলিম উদ্দিন, কানাইঘাট থেকে:: কানাইঘাটের লক্ষীপ্রসাদ পুর্ব ইউপির বড়খেয়ড় গ্রামে শায়িত আছেন একজন বীর সাহসী পুরুষ। তিনি সাবেক সেনা ও ইপিআরের মধ্যে একমাত্র বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা।

যিনি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে নিজের জিবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন দেশের জন্য।

তিনি হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বীরউত্তম। তার বাড়ী কুমিল্লার ভ্রাম্মণপাড়ার মালাপাড়া গ্রামে। পিতার নাম আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া ও মাতার নাম তাবেন্দা আখতার খাতুন। তিনি ১৯৭১ সালের ৪টা সেপ্টেম্বর কানাইঘাটের কটালপুর ব্রীজ ধ্বংস করতে গিয়ে শহীদ হন।

জানা যায়, ৬ ভাই ৩ বোনের মধ্যে নিজাম ছিলেন ২য়। নিজামের বড় ভাই লেফটেনেন্ট কর্নেল (অব:) কামাল উদ্দিন ভূইয়া ঢাকা উত্তরার মাইল স্টোন কলেজের প্রিন্সিপাল (এডমিন) হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট ভাই আল্লামা ইকবাল উদ্দিন ভূঁইয়া (কানাডা প্রবাসী), হাসান মহি উদ্দিন ভূইয়া (ব্যাংকার)। ইকবাল উদ্দিন ভূঁইয়ার ছেলে এহতেশাম ইকবালের সাথে আলাপকালে জানা যায়, নিজামের স্মৃতি বিজড়িত অনেক ইতিহাস।

‘মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে “বীরউত্তম” খেতাব দেওয়া হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ একমাত্র বেসামরিক বীরউত্তম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট নিজামের স্মৃতি অম্লান রাখতে আইবিএর প্রবেশপথে তাঁর ম্যুরাল তৈরি করবে, এছাড়া মাস্টার্সের সেরা ছাত্র হিসাবে স্বর্ণপদক দেওয়া হবে।

এছাড়া ‘বিজনেস ফ্যাকাল্টির বিশ তলা ভবনটি শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীরউত্তমের নামে নির্মাণ করা হবে। ঢাকার মালিবাগ রেলগেট থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের বিশ্বরোডটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের শহীদ মিনারটি ‘খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীরউত্তম শহীদ মিনার’ নামকরণ হয়েছে। কুমিল্লার ব্রাম্মনপাড়ার মালাপাড়া গ্রামে তার নামে স্কুল আছে। গ্রামের কবরী বাগিচাগাঁও- মূলকান্দিরপাড় থেকে পুলিশলাইন সড়কের নামও ‘বীর-উত্তম খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া সড়ক’ রাখা হয়েছে।

সিলেটের কানাইঘাটের লক্ষীপ্রসাদ পুর্ব ইউপির বড়খেয়র গ্রামে শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীরউত্তম কবর কমপ্লেক্সে ও স্মৃতিস্তম্বের পার্শ্বে তাঁর নামে একটি মসজিদ, একটি মাদরাসা ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া বড়খেয়র এলাকায় তার নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় করার প্রস্তাব প্রক্রিয়াদিন রয়েছে। এছাড়া শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীর উত্তমের নামে কানাইঘাটের বড়খেয়ড় রাস্তা এবং প্রস্তাবিত মন্তাজগঞ্জ-দর্পনগর সুরমা ব্রিজের নাম করনের জোরালো দাবী ঊঠেছে।

শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীরউত্তমের স্মৃতি রক্ষার জন্য প্রতি বছর ৪টা সেপ্টেম্বর তার স্বরণে স্মৃতিস্তম্ব মাঠে আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে মৃত্যু বার্ষিকী পালনের জন্য সাংবাদিক আলিম উদ্দিন’কে আহবায়ক করে ২১ সদস্য বিশিষ্ট স্মৃতি পরিষদ গঠন করা হয়।

মাকে না বলে দেশ স্বাধীন করতে ছুটে গেলেন যে তরুণ, তিনিই পরে নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়েছেন ৮শত সহযোদ্ধার প্রাণ। কোনো দিন মহসীন হল, কোনো দিন খালার বাসা এভাবেই থাকতেন খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন এমবিএ ৩য় ব্যাচে পড়েন নিজাম। দিনে চাকরি করেন ঢাকার হোটেল ইন্টারকনটিনেন্টালে রাতে ক্লাস করেন। ২৫ মার্চ হোটেলের বিদেশি সাংবাদিকের মুখেই শুনেছিলেন, রাতে ঢাকা আক্রমণ করবে পাকিস্তানি বাহিনী।

ফলে সেদিন হলে না ফিরে চলে গেলেন পুরান ঢাকার অভয় দাস লেনের খালার বাসায়। রাতভর হলের বন্ধুদের চিন্তায় ঘুম এলো না। সকালে ঘণ্টা দু’য়েকের জন্য কারফিউ উঠলে, হলে ছুটে গেলেন। গিয়ে দেখলেন নিথর পড়ে আছে প্রিয় মুখগুলো, রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর এ দৃশ্যই পুরোপুরি বদলে দিল তাঁকে। সেদিনই খালার পরিবারকে কুমিল্লা নিয়ে গেলেন।

শহরের করবী বাগিচা গাঁওয়ের বাড়িতে মা-বাবার কাছে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কুমিল্লা শহরের তরুণদের ডেকে ঢাকার ঘটনা বললেন, বারবার অনুরোধ করলেন, ‘আপনারা কিছু করুন।’ ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সেনারা বেরিয়ে পড়তে পারে ভেবে দুই পরিবারকে বুড়িচংয়ের বাড়িতে রেখে এলেন। মাকে বললেন, ‘খালার বাড়িতে গিয়ে কয়েক দিন থাকি?’ বলে খালাতো ভাই গিয়াসকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন নিজাম।

আশরাফ নামের আরেক পরিচিতকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরা চলে গেলেন। এপ্রিলের শুরুতে আগরতলা গিয়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ হলো। এরপর অস্ত্র হাতে লড়তে গেলেন তিনি। আগরতলার কাছে ইন্দ্রনগরের ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে মে মাসের শুরুতে মুক্তিফৌজের একজন হিসেবে চলে এলেন সিলেটের কানাইঘাটে। তখনো সেক্টরগুলো তৈরি হয়নি।

ছোট ছোট দলে অপারেশন করে সিলেট মুক্ত রাখছিলেন নিজামের মতো মুক্তিসেনারা। ৪ নম্বর সেক্টর গঠিত হলে সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের অধীনে সাব-সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হলেন নিজাম উদ্দিন। তিনিই সাবেক সেনা ও ইপিআরের মধ্যে একমাত্র বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা।

ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন তিনি। সহকর্মীদের প্রতি মমতা দেখে সবাই তাঁকে ভালোবেসে ফেললেন। তখনো বাড়িতে কেউ জানেন না, দেশ মুক্ত করতে গিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিবারের অবস্থা তখন বেশ করুণ। সরকারের রাজস্ব বিভাগের সাবডিভিশনাল ম্যানেজার বাবা আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া, সেই যে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছেন, আর চাকরিতে যোগ দেননি।

বড় ভাই সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোস্তফা কামাল উদ্দিন ভুঁইয়া পাকিস্তানে কর্মরত অনেক বাঙালি অফিসারের মতো বন্দি। সেজো ভাই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শাহজালাল উদ্দিন ভুঁইয়া, ক্লাস টেনের ছাত্র আল্লামা ইকবাল উদ্দিন ভুঁইয়া যুদ্ধে চলে গেছেন। সবই জেনেছেন তিনি। তবে নিজামের খবর না পেয়ে পিতা মাতা দুশ্চিন্তায় অস্থির। পরে খালাতো বোনের স্বামী বাড়ি এসে জানালেন, নিজাম মুক্তিযুদ্ধে গেছেন। যুদ্ধের অবসরে মায়ের জন্য মন পোড়ে।

একদিন সেক্টর কমান্ডারকে বলে ফেললেন ‘স্যার আমাকে কুমিল্লায় পাঠান। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে ৮শত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সাবসেক্টর কমান্ডার খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া। কানাইঘাটের কঠালপুর ব্রিজ উড়িয়ে দেবেন। রাতভর যুদ্ধ করে অসম সাহসী বাঙালি তরুণ দল ব্রিজ উড়িয়ে দিল। তবে যুদ্ধ থামল না। থেমে থেমে গোলাগুলি হচ্ছে। হঠাৎ তাঁরা টের পেলেন, গুলি ফুরিয়ে আসছে। পাকিস্তানি বাহিনীও পরিস্থিতি টের পেয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরার ছক কষল।

তাঁদের নেতা এগিয়ে এলেন। হাতে সাব-মেশিনগান। সহযোদ্ধাদের বললেন, ‘তোমরা পিছে চলে যাও, আমি ওদের দেখছি।’ নিরাপদে সরে যেতে লাগলেন সবাই। নিজাম অনবরত গুলি ছুড়ছেন। হঠাৎ একটি গুলি এসে তাঁর হাতে বিঁধল। তবুও অস্ত্র ফেলে দেননি। রক্ত ঝরা হাত নিয়েই দম আটকে গুলি করছেন। মুক্তিসেনারাও নিরাপদে চলে যাচ্ছেন। একটি গুলি বুকে লাগল, আরেকটি গুলি মাথায় বিদ্ধ হওয়ার পর আর পারলেন না।

‘লাইলা—রাসুলুল্লাহ’ পড়ার শব্দে পেছন ফিরে তাকালেন সহযোদ্ধারা। মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে এই বীরের লাশ নিয়ে তবেই তাঁরা ফিরেছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী চেয়েছিল, নিজামের কবর ভারতেই দেওয়া হোক। তবে মুক্তিযোদ্ধারা আপন দেশের মাটিতেই চিরদিনের জন্য রেখে দেবেন তাঁকে। কোনোভাবেই দুই পক্ষের সমঝোতা হলো না।

অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি সিলেটের কৃতি সন্তান এম এ জি ওসমানী বললেন, নিজাম বাংলাদেশে থাকবে। কানাইঘাটের বড়খেয়ড় গ্রামে হজরত পাতাশাহ (রহ.)-এর কবর। সেখানেই টিলার পার্শ্বে দাফন করা হয় নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়াকে। শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীরউত্তমের কবরকে কানাইঘাটবাসী ‘ক্যাপ্টেন নিজামের কবর’ নামে চেনেন। তাঁরা এখনো তাঁর গল্প করেন। তাঁদের বিশ্বাস, সেনা অফিসার ছাড়া এত বিক্রম সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রদর্শন করা সম্ভব নয়।