মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

রহস্যঘেরা মোগলাবাজারের মজম্মিল হত্যা মামলা




সুলতান সুমন:
: যে দিন মজম্মিল খুন হন। সে দিনটি ছিল পবিত্র রমজান মাসের শেষ শুক্রবার। জুমা’র নামাজ শেষে মসজিদের টাকার হিসাব-নিকাশ নিয়ে ব্যাস্ত ছিলেন মসজিদ কমিটির সদস্যরা।

তখন মসজিদে হঠাৎ খবর আসে ছতিঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় দুপক্ষের সংর্ঘষ হচ্ছে। তাৎক্ষণিক মসজিদ কমিটির সকল সদস্যরা মিলে গিয়ে সংর্ঘষ থামান।

আর আহতদেরকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠান। এদের মধ্যে গুরুতর আহত মজম্মিল আলী গেদা পাঁচ দিন পর চিকিৎসাধীন থাকাস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বলে জানিয়েছেন জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ছত্তিঘর জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি কনর মিয়া ও সহ-সভাপতি মকবুল হোসেন।

তারা জানান, ছত্তিঘর গ্রামের সাবেক মেম্বার আবদুল হাই লিলু মিয়া গ্রামের বিদ্যালয়ে দাতা হিসেবে ২৬ শতক ও মস্তকিন আলী ৯ শতক ভ’মি দান করেন। ওই দাগের অবশিষ্ট প্রায় ৬ শতক ভ’মিসহ অন্যান্য ভুমিতে ক্ষেত করতে বাধা দিতেন মজম্মিল আলীগংরা।

এছাড়া আবদুল হাই লিলু মিয়ার মালিকানা বাগান বাড়ির (বাবুর বাড়ি) কাজ কর্মেও বাধা সৃষ্টি করতেন নিহত মজম্মিলের লোকজন। এ কারণে ২০০৫ সালে বাড়ির তত্বাবধায়ক পরবর্তীতে সেই মামলা আপোষ মিমাংসা হয়।

পরবর্তীতে লিলু মিয়া তার জমিতে ট্যাক্টর দিয়ে হাল চাষ করাতে শ্রমিক পাঠালে বাধা দেন মজম্মিল আলী ও তার ছেলেরা। এ বিষয়ও সালিশে নিস্পত্তি হয়।

স্থানীয়দের বক্তব্যে জানা যায়, ঘটনার দিন স্থানীয় মোগলাবাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন লিলু মিয়ার প্রতিবেশী সম্পর্কীয় চাচা আশিক মিয়া। ফেরার পথে মৃত মজম্মিল আলী, জয়দু, টিপু,আবদুল বাছিত, সাহেদ, লাহিনসহ আত্মীয়রা মিলে তাকে মারপিট করেন। খবর পেয়ে আশিকের পক্ষের আশিক, ফয়ছল, জুয়েল, রাহেল, রুবেল, কামরান, নাঈম, হাসান, রাসেলসহ আরো দুই তিনজন গিয়ে সংর্ঘষে লিপ্ত হন।

এতে উভয় পক্ষের লোকজন আঘাত প্রাপ্ত হন। সংর্ঘষের সময় ছত্তিঘর মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার সাবেক মেম্বার আবদুল হাই লিলু মিয়া ও তার চাচা শফিকুর রহমান মসজিদের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। বাবার সাথে মসজিদে অবস্থান করছিলেন লিলু মিয়ার ছেলে ইমনও। আর লিলু মিয়ার চাচাতো ভাই এমরান ছিল গোলাপগঞ্জে তার মামার বাড়িতে। এই চার জন সংর্ঘষে যুক্ত ছিলেন না, দাবি স্থানীয়দের।

তাদের দাবি, মজম্মিল খুনের ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে যারা জড়িত, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। তবে মারামারির ঘটনায় যাদের অযথা জড়ানো হয়েছে তারা যেনো হয়রানীর শিকার না হন।

গ্রামের মুরব্বী ও বাজার কমিটির সভাপতি নিমার আলীর দাবি, মজম্মিল আলী হত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে লিলু মিয়া জড়িত ছিলেন না। তবে তার পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয় ছত্তিঘর গ্রামের মাহমদ আলী, ছালেহ আহমদ ও আনা মিয়ার ইন্দনে মামলা হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনায় এ তিন জনের কোনো হাত নেই। তথ্যগত ভুলে তাদের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে মনে করেন তিনি। খুনের ঘটনায় জড়িত প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দাবি করেন তিনি।

এছাড়া মেম্বার লিলু মিয়া ও তার ছেলেকে মামলায় আসামি করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রীকে হয়রানী ও গৃহবিন্দর ঘটনা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাজার কমিটির সভাপতি নিমার আলী। তিনি বলেন, শুরু থেকেই তিনিও সংর্ঘষ থামাতে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘটনা ঘটে গেলো।

তিনি বলেন, গ্রামে পঞ্চায়েত থাকতে এ ধরণের ঘটনা ঘটতেই পারে না! শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া লিলু মিয়ার মেয়ে মোগলাবাজার থানায় নিরাপত্তা চেয়ে একটি আবেদনও করেছেন।

ছত্তিঘর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মকবুল হোসেন জানান, সংঘর্ষে গুরুতর জখম হয়ে মজম্মিল আলী মারা যান। ঘটনাটি মর্মান্তিক। তবে সংর্ঘষের সময় লিলু মিয়া ও শফিক মিয়া মসজিদের হিসাবে ব্যস্ত ছিলেন। মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, মারামারি থেমে যায়।

ছত্তিঘর গ্রামের ছালেহ আহমদ জানান, আবদুল হাই লিলু মিয়ার মেয়ে লতিফা তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন। তা মিথ্যা ও বানোয়াট। তিনিও চান প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি দাবি করেন।

মোগলাবাজার থানার ছত্তিঘর গ্রামের আবদুল হাই লিলু মিয়ার মেয়ে মোছা. লতিফা বিনতে লিলু জানান, তার আত্মীয় স্বজন সবাই প্রবাসি। তাদের বসতবাড়ি, বাগান বাড়িসহ বিশাল সহায় সম্পত্তি রয়েছে। এসব সম্পত্তি গ্রাস করতেই তার ভাই ও বাবাকে হত্যা মামলায় ঢুকিয়ে বাড়ি ছাড়া করা হয়েছে। এ সুযোগে প্রতিপক্ষের লোকজনের ভয়ভীতি দেখানোর কারণে বাইরে বেরোতে পারছি না। ফলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছেন না। তার ছোট ভাইটিও স্কুলে যেতে পারছে না।

এসএমপি’র মোগলাবাজার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, গত রমজান মাসে রোযারত অবস্তায় খুন হন মজম্মিল আলী। সেই ঘটনায় মোগলাবাজার থানায় মামলা (নং-০৯(০৬)১৮) দায়ের করা হয়। মামলায় যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। আর যারা জড়িত না, তাদেরকে কোন ধরণের হয়রানীও করা হবে না।

এদিকে, ৭ অক্টোবর লিলু মিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া মেয়ে লতিফা বিনতে লিলু সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, মামলার বাদি পক্ষের লোকজনের হুমকীতে তারা নিরাপত্তা হীন। তিনি ও ছোট ভাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না।

ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ১৫ জুন বেলা ২টার দিকে গ্রামের শফিকুর রহমানের ছেলে রাহেল মিয়া ও মজম্মিল আলীর ছেলে আমির হোসেনের মধ্যে পুকুরের মাছধরা নিয়ে মারামারি হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তার পিতা লিলু, ভাই ইমন আহমদ, চাচা এমরান আহমদ ও আরেক সম্পর্কীয় চাচা শফিকুর রহমানকে আসামী করেন আমির হোসেন।

অথচ তারা ওইদিন জুমা’র নামাজ শেষে ইমামের টাকা উত্তোলন ও মসজিদের নিলাম কাজে ব্যস্ত ছিলেন। যা অনুসন্ধানকালেও এলাকার লোকজন সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে মাছ ধরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়, মূলত; আশিক মিয়াকে মারধর করায় তার ভাতিজা রাহেল মিয়াগংদের সাথে মজম্মিল আলীর ছেলে আমির হোসেন ও তার লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় আহত হয়ে পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মজম্মিল আলী মারা যান। এই মামলায় আবদুল হাই লিলু মিয়াসহ ১৪ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি এখনও তদন্তাধীন।