মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমানের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল



এম. শামীম আহমেদ:: ইসলামি আন্দোলনের কিংবদন্তি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির, জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজিরবাজার মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন)। শুক্রবার (১৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাষ ত্যাগ করেন। সিলেট নগরীর বাসায় তাঁর ইন্তেকাল হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। ১৯৪৯ সালে সিলেটের গোলাপগঞ্জে তাঁর জন্ম।

প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমানের জানাজা উপলক্ষে সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠ জনতার ঢল নামে। আলিয়া মাদরাসা মাঠের চার পাশ থেকে লাখ মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। নামাজের পূর্বে মরহুমের জীবনী নিয়ে দেশ বরেণ্যে রাজনীতিবিদ, আলেম-উলামারা বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্যে তারা বলেন, প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান ছিলেন একজন সংগ্রামী আলেমে দ্বীন ও বহুগুণে গুণান্বিত শ্রদ্ধাভাজন মানুষ। দ্বীনি শিক্ষার প্রচার-প্রসার ও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে ইসলামি রাজনৈতিক অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।
বক্তারা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

দল মত নির্বিশেষে সকলই হাবিবুর রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। সিলেটের এ সিংহপুরুষ ছিলেন ইসলামী প্রগতিশীল আন্দোলনের সফল সৈনিক। যখনই কোন মুরতাদ ইসলামের বিরুদ্ধে কিছু বলতো প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতেন।

মরহুমের জানাযায় লাখো লাখো মানুষের ঢল নামে। আলিয়া মাদ্রাসা কানা কানায় ভরে যায়। চৌহাট্টা পয়েন্ট থেকে রিকাবী বাজার পয়েন্ট পর্যন্ত মানুষ জড়ো হয়। একনজর হুজুরকে দেখতে এতো মানুষের সমাগম দেখে বুঝা যায়, হুজুর ছিলেন সকলের হৃদয়ের মনি।

কওমি মাদরাসার প্রধানের পরিচয় মুহতামিম হলেও, তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন প্রিন্সিপাল হিসেবে। তিনি দেশের প্রাচীনতম আলিয়া গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ি মাদরাসায় ফাজিল পর্যন্ত পড়েছেন। কামিল দিয়েছেন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা থেকে।
প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত সিলেটের জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজির বাজার মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদ তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি বাঙালকে নিশ্চিত করেছেন। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় সিলেট সরকারী আলীয়া মাদরাসা মাঠে তাঁর নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান দীর্ঘদিন থেকে ডায়াবেটিস ও হাই প্রেশারসহ শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ৭ অক্টোবর তিনি চিকিৎসার জন্য ভারত গিয়েছিলেন। সেখান থেকে দু’দিন আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
১৯৯৪ সালে বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়ে সারা দেশে ধর্মপ্রাণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান। তার সংগঠন সাহাবা সৈনিক পরিষদের ব্যানারে সিলেটে অসংখ্য সভা-সমাবেশ করেন। এছাড়াও দেশের নাস্তিক-মুরতাদবিরোধি আন্দোলনের সবসময়ই তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৭৪ সালের জুনে দেশের শীর্ষ আলেমদের তত্ত্বাবধানে সিলেটের কাজির বাজার এলাকায় সুরমা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজির বাজার মাদরাসা। দারুল উলুম দেওবন্দের নীতিতে পরিচালিত এই মাদরাসা শুরু থেকেই সিলেবাসে বাংলা, ইংরেজিসহ জাগতিক বিষয় যুক্ত করে নতুন ধারার সূচনা করে।
অভিভক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতি থেকে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ খেলাফত মসজিলের আমির নির্বাচিত হন প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান। ২০১২ সালে ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশে খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক মৃত্যুবরণ বরণ করার পরে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তে দলের আমির নিযুক্ত হন মাওলানা হাবিবুর রহমান।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক স্ত্রী, চার ছেলে ও তিন কন্যা সন্তানের জনক। তার বড় ছেলে মাওলানা মুসা বিন হাবীব জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল। দ্বিতীয় ছেলে মাওলানা ইংল্যান্ড প্রবাসী। তৃতীয় ছেলে তারেক বিন হাবীব সিলেট মহানগর ছাত্র মজলিসের সভাপতি, চতুর্থ ছেলে তায়েফ বিন হাবীব ইংল্যান্ড প্রবাসী। তাঁর বড় জামাতা মাওলানা তাজুল ইসলাম, দ্বিতীয় জামাতা মাওলানা আতাউর রহমান ইংল্যান্ড প্রবাসী, ছোট জামাতা মাওলানা সহল আল রাজি ব্যবসায়ী ও সিলেট জেলা পরিষদের সদস্য।

এদিকে হুজুরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সিলেটে রাজনৈতিক, সামাজিক সহ সকল অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এড. লুৎফুর রহমান, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, জেলা সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য ইয়াহিয়া চৌধুরী, ড. একে আব্দুল মোমেন প্রমুখ।

এছাড়াও সকল ইসলামী রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ মরহুমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।