সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আইনজীবী সহকারীগণকে আইনী কাঠামোতে আনতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আকুল আবেদন



প্রতিটি পেশায় স্বকীয়তা স্বাধীনতার প্রথম অঙ্গিকার। স্বাধীনতার অঙ্গীকার মোতাবেক প্রতিটি পেশাজীবীকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে আইন প্রণয়ন ও যুগের প্রয়োজনে সংশোধন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। অতীব দুঃখের বিষয় যে, বিচার বিভাগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আইনজীবী সহকারী (Advocate’s Clark) সম্প্রদায়ের জন্যে তাদের কাজের পরিধি ও সাংগঠনিক রূপরেখা বর্ণনা করে তাদের নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে অদ্যাবধি কোন আইন প্রণয়ন করা হয়নি।

বিচার কার্য সম্পাদনে একজন আইনজীবীর চিন্তাধারা, লেখনী, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ নানামুখী কর্মধারা লিখিত আকারে প্রস্তুত করা হয়। অত্যন্ত মেধাবী, ধীরস্থির ও তীক্ষ্ন দৃষ্টি সম্পন্ন এক বা একাধিক ব্যক্তি দ্বারা। তারা কুটিনাটি পরীক্ষা করেন। দাঁড়ি কমা থেকে শুরু করে সবকিছু সাঁটলিপিকার মারফত সুসম্পন্ন করে মাননীয় আইনজীবী বরাবরে পেশ করেন। বিজ্ঞ বিচারকের সম্মুখে উপস্থাপনের জন্যে এই জাতীয় অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি যে ব্যক্তিটি পালন করেন তাকে আদালত অঙ্গনে বিচরণ করতে দেখা যায় সর্বক্ষণ, সর্বত্র এবং জরুরী দলিল দস্তাবেজ হাতে। তিনি বা তারা কখন, কোথায় আবার যেকোনো মামলার তথ্য তালাশ বা সংবাদ সংগ্রহ ক্রমে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সাহেবকে অবহিত করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট আদালতে হাজির হতে প্রয়োজনীয় কার্য সম্পাদন করে থাকেন। যোগ্য ব্যক্তির যোগ্যতার কাজ হিসেবে একটিকে আদালত অঙ্গনে আইনজীবীদের সহচর হিসেবে একটি পরিচালিত কর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। এ জাতীয় কর্মে সহকারীদেরকে আমরা অভিহিত করে থাকি আইনজীবী সহকারী হিসেবে। মুহুরী সাহেব, এডভোকেট’স ক্লার্ক যাই বলিনা কেন, আইনজীবী সহকারী পদবীটিই হলো যথাযথ। শুধু লেখনি নয় আপন মেধা, কর্মনিষ্ঠা আর আইনী ফাঁকফোকড় সম্বন্ধে নির্দিষ্ট মাত্রার জ্ঞান তাদেরকে দান করেছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। আইনজীবী সহকারীগণ আদালত প্রাঙ্গনে যেমন কর্মব্যস্ত বিভিন্ন সেরেস্তার দোড়াদৌড়িতে তেমনি তারা ব্যস্ত বিচারালয়ের অভ্যন্তরে। কখনোবা তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রমাণপত্র বা সমজাতীয় বিষয়বস্তু এগিয়ে দিচ্ছেন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনরত আইনজীবীদের। অন্যদিকে একজন আইনজীবী সহকারী নিরন্তর ব্যস্ত থাকছেন কখন, কোথায় ও কোন তারিখে নির্দিষ্ট মামলাটি উপস্থাপিত হবে সে বিষয়টি জানাতে। তারা মক্কেলদের কাছে যেমন সমাদৃত নির্দিষ্ট তথ্যের প্রয়োজনে তেমনি সমাদৃত আইনজীবীদের কাছে সহায়তা প্রদানকারী হিসেবে।

বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারতের মতো আমাদের দেশটিতেও আইনজীবী সহকারী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন প্রায় লক্ষাধিক কর্মী। শিক্ষানবীস হিসেবেও রয়েছেন আরো অনেক। তারা আজ সংঘবব্ধ, তাদের রয়েছে নিজস্ব সংগঠন আর নিজস্ব অবস্থান। তাদেরও রয়েছে নানা প্রকার দুঃখ দুর্দশা আর ক্লেশ। পারিশ্রমিকের হার নগণ্য, বসার জায়গা অপ্রতুল আবার অনেক জায়গা জরাজীর্ণ দশায় পরিণত হওয়ায় অনেক আইনজীবী সহকারী নির্দিষ্ট শেড ছেড়ে কোন বারান্দায় আর না হয় খোলা আকাশের নীচে দৈনিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। মানবেতর জীবন যাপন এই দুঃখ দুর্দশা লাঘব করার উদ্দেশ্যে একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা মাথায় রেখে ১৯৭৯  সালে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সহকারী সমিতি নামকরণে একটি বলিষ্ট সংগঠনের রূপদান করার লক্ষ্যে ১ম পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই সংগঠনটি ১৯৮২ সালে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৫ সালে কেন্দ্র্রীয় সংগঠনের প্রচার দেশব্যাপী বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারতে এ সময়ে ১৯৮৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ ল-ক্লার্ক এসোসিয়েশন কলকাতা, তাদের আহুত রাজ্য সম্মেলনে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সহকারী সমিতি প্রতিনিধিবর্গকে আমন্ত্রণ জানানো হলে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সহকারী সমিতি ও বাংলাদেশ আইনজীবী সহকারী সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে ০৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল পশ্চিমবঙ্গ ল-ক্লার্কস এসোসিয়েশন এর রাজ্য সম্মেলনে যোগদান করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া অল-ইন্ডিয়া ল-ক্লার্কস ফেডারেশনসহ অন্যান্য প্রদেশে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরী করে ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে ভারতের জাতীয় সংসদে আইন পাশ করে তাদের পেশায় স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধিবদ্ধ কাঠামো তৈরী করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশ অনুরূপভাবে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ৬৪টি জেলা শহরে সাংগঠনিক সফর করে সংগঠনকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যে ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে ১ম মহাসম্মেলন করেন। ঐ মহাসম্মেলনে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় বক্তাগণ তাদের দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে বক্তব্য প্রদান করেন। দ্বিতীয় মহাসম্মেলন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে ১৯৯১ সালে ২৪ ও ২৫ মে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে তৎকালীন স্পীকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করে আইনজীবী সহকারীদের প্রস্তাবিত আইনের প্রতি একমত পোষন করেন। এছাড়াও বিগত ০৬-০৮-১৯৯৩ সালে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকাকালীন বলেছিলেন, তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে আইনজীবী সহকারীগণকে একটি আইনী কাঠামোর মধ্যে এনে আইন করে দেওয়ার জন্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অতঃপর ১৯৯৭ সালের ১৩ জুন ৩য় মহাসম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে তৎকালীন মাননীয় মন্ত্রী আইন ও বিচার সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু, তৎকালীন মাননীয় ডেপুটি স্পীকার এডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ এবং তৎকালীন মাননীয় এটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার কে.এস. নবী উপস্থিত থেকে আইনজীবী সহকারীদের যৌক্তিক দাবি সম্পর্কে অভিন্ন মত প্রদান করেন এবং অনধিক ০৩ মাসের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র আইন প্রণয়নের ঘোষনা প্রদান করেন। বিগত ১২-১০-২০০০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইন মন্ত্রণালয়, আইন সংস্কার কমিশনে একটি রেফারেন্স পেশ করেন। ফলশ্র“তিতে আইন সংস্কার কমিশন পূর্ণাঙ্গ আইনের রূপরেখা প্রস্তুত করে। উক্ত রূপরেখা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন যাহা “www.lc.gov.bd, Report on providing a legal framework for established a statutory association for the Advocate’s Clarks S1-60 & 61” বর্তমানে চলমান রয়েছে। বিগত ২০১২ সালে সিলেট বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথি তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন হযরত শাহজালাল (রহঃ), হযরত শাহপরাণ (রহঃ) এবং শ্রী চৈতন্য এর পূণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে তাদেরকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন আগামী শীতকালীন অধিবেশনে তাদের প্রস্তাবিত আইনটির বিষয়ে মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে বিল আকারে প্রণয়ন করা হবে সেটিও গণমাধ্যম প্রচার হয়েছে। অতঃপর ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে ৪র্থ মহাসম্মেলনে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় ডেপুটি স্পীকার মোঃ ফজলে রাব্বী, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় মন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক এমপি, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এডভোকেট মোঃ কামরুল ইসলাম এমপি, মাননীয় এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট ব্যারিস্টার রফিকুল হক, সিনিয়র এডভোকেট আব্দুল বাছেত মজুমদার, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, সাবেক এমপি এডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু, সিনিয়র এডভোকেট জয়নুল আবেদীন, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এ.এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন, অল-ইন্ডিয়া ল-ক্লার্কস ফেডারেশনের সভাপতি বাবু অশোক কুমার মন্ডলসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্যে আইন পাশে বিলম্বের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে দ্রুততম সময়ে উহা পাশের অঙ্গীকার পূনর্ব্যক্ত করেন যাহা প্রিন্ট ও ইলেকট্রোনিক্স মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। আইনজীবী সহকারীগণ শুধু কথার ফুলঝুড়িতে আশ্বস্ত হয়ে অপেক্ষমান রয়েছেন। এখন পর্যন্ত মহান জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত আইনটি বিল আকারে উপস্থাপন করা হয়নি এবং আইনজীবী সহকারীগণ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে, বার কাউন্সিলের মতামত, আইন কমিশন ও সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির লিখিত মতামত দেওয়ার পরও আইনের কোন সুরাহা হয়নি। আইনজীবী সহকারীগণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করতে যেমন তাদের প্রয়োজন অনস্বীকার্য, তেমনি তাদের দুঃখ দুর্দশা লাঘব করাও একান্ত প্রয়োজন। দেশের বরেণ্য আইনজীবীগণ সেখানে অতিথি হিসেবে যোগদান করে তাদের সম্মেলনটিকে আলোকিত করেছেন আবার তাদের দাবি দাওয়ার প্রতিও একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। আইনজীবী সহকারীগণ যে অপরিহার্য কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন সেটি যেমন বাস্তব তেমনি নানা প্রতিকূল পরিবেশে তারা তাদের কর্ম সম্পাদনা করছেন সেটিও বাস্তব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: অদ্যাবধি এই সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যে ৩১ বছর পরও কোন আইন প্রণীত হয়নি। আইনজীবী সহাকারীদের কাজের পরিধি ও সংগঠন করার অধিকার দিলে বা সংবিধিবদ্ধ স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করলে কার কি ক্ষতি হবে এ বিষয়টি কারও বোধগম্য নয়। মানুষকে অধিকারবিহীন রাখলে স্বাধীনতা কখনও পরিপূর্ণ হয় না এবং এর জবাবদিহীতা সচেতন মানুষের উপরই বর্তায়। অনেক আইনজীবী সহকারীরা আশায় বুক বেঁধে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় আর্তনাদ করে দিনাতিপাত করছেন। সমাজের কর্ণধার ও আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা আইনজীবী সহকারী স¤প্রদায়ের মুক্তির জন্যে এগিয়ে না আসলে অনাগত দিনে এর দায় থেকে আমরা কেহই রেহাই পাবনা। বাংলাদেশের সংবিধানে ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে উলে­খ রয়েছে যে, কোন নাগরিক আইন অনুযায়ী যে কোন কাজকে নিজের পেশা হিসেবে বাছাই করতে পারবে। সমাজে মর্যাদাসম্পন্নভাবে বেঁচে থাকতে একজন মানুষের যেসব অধিকার সেগুলো প্রতিটি দেশের সংবিধানেই বিষয়টি সুস্পষ্ঠভাবে উলে­খ রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আজ সময় এসেছে দাবি দাওয়ার প্রতি সুদৃষ্টি প্রদানের।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা মানবতার জননী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আকুল আবেদন এই যে, অবহেলিত আইনজীবী সহকারীগণদের খসড়া প্রণীত “আইনজীবী সহকারী কাউন্সিল আইন” পাশ করার জন্য সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক,
শাকিল আহমদ
উচ্চ পরিষদ সদস্য,
সহ সভাপতি-বাংলাদেশ আইনজীবী সহকারী সমিতি
কেন্দ্রীয় কমিটি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক
সিলেট জেলা শাখা।