বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সিলেটে চিকিৎসা সেবায় বাড়ছে নৈরাজ্য : অনুসন্ধানী পর্ব-৩



জাবেদ এমরান:: সিলেট নগরীসহ জেলা শহরের অধিকাংশ ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা সেবার নামে স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশীদের সর্বশান্ত করার অভিযোগ বিস্তর। যত্রতত্র একটার পাশে আরেকটা বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গজিয়ে উঠায় অনিয়ম-দুর্নীতি চরমে উঠেছে।

পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থায় এখন চলছে মালিক, চিকিৎসকের স্বেচ্ছাচার ও চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণা। স্বাস্থ্যসেবা এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

অনবিজ্ঞ লোকবল ও ভুয়া ডিগ্রীধারী ডাক্তার দ্বারা ওইসব হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে কি নৈরাজ্য বিরাজ করছে, তা তুলে ধরা হয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণার প্রতিবেদনে।

১২ জুলাই এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, দেশের সরকারি হাসপাতালে সেবা বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে হচ্ছে প্রতারিত।

সর্বত্রই বাড়ছে নৈরাজ্য : দ্রুত গজিয়ে উঠা এসব হাসপাতালে নেই বিদ্যমান আইনের কোনো প্রয়োগ। মালিক-চিকিৎসকদের নিজস্ব আইনে পরিচালিত হচ্ছে ক্লিনিকগুলো। তারা ‘মেডিকেল প্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ না মেনে রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ফি আদায় করছেন। অথচ রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।

সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকার মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে সে ব্যবস্থা অপ্রতুল। আর এ সুযোগে দেশজুড়ে গজিয়ে উঠেছে অনুমোদিত ও অননুমোদিত অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অধিক ব্যয়সাপেক্ষ এসব বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ তেমন সেবা পাচ্ছে না। বরং সেবার নামে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিক অর্থ আদায়, প্রতারণা, ভুল চিকিৎসা, লাশ বানিজ্য ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। চিকিৎসা ফি, বেড ও কেবিন ভাড়া, অপারেশন, প্যাথলজি টেস্টের ও ইত্যাদি ফি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করছে।

নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনা খরচের নামে তারা চিকিৎসার খরচ বাড়াচ্ছেন। তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে জিম্মি রোগীরা। ব্যবসায়িক নির্মম মানসিকতার বলি হয়ে অনেকে নিঃস্ব হচ্ছেন, অনেকে ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়ার ঘটনা পত্রপত্রিকায় শিরোনাম হচ্ছে। একই চিকিৎসার ফি ক্লিনিক ভেদে ভিন্ন। সরকারি নীতিমালার তুলনায় ফি কোথাও শতগুণ, কোথাও হাজারগু বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যর্থতার কারণে দেশের শতকরা ৬৮ ভাগ লোক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তার অদক্ষতা, অবহেলা, উদাসীনতার সুযোগে মালিকরা চালাচ্ছেন স্বেচ্ছাচারিতা। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা করার নামেই সরকারের অনুমোদন নেয়। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ আমদানিতে সরকারি ভর্তুকিও পেয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। এজন্য সরকার আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করার কথা থাকলেও তা আদায় করা হচ্ছে বিপদগ্রস্থ রোগীদের কাছ থেকে। যা অসাংবিধানিক ও বেআইনি। রোগী ভর্তি ফি, বেড, কেবিন, সিসিইউ, আইসিইউ ভাড়া, ডায়লাইসিস, নানা টেস্ট, অপারেশনে একেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে একেক রকম বিল। এখানে সরকারি নীতিমালা অবহেলিত।

নামসর্বস্ব স্বাস্থ্যকেন্দ্র : দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল নামসর্বস্ব। সেগুলোতে সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, অস্ত্রোপচার কক্ষ, চিকিৎসার জরুরি যন্ত্রপাতি, ওষুধ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি ইত্যাদি নেই। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানেও তা ধরা পড়ে। এসব হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হলেও থিয়েটার, দরকারি যন্ত্র ও পর্যাপ্ত লোকবল নেই।

সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রাখার নিয়ম থাকলেও ফোন করে ডাক্তার ডেকে এনে চিকিৎসা করানো হয়। অধিকাংশ হাসপাতাল মালিকানার সঙ্গে প্রভাবশালী, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় নীতিমালা না মেনেও সরকারের অনুমোদন পায় বলে জানা যায়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব মতে দেশে বৈধ ২ হাজার ৬০৮টি আর অবৈধ আছে ৫ হাজার ১শ‘ ২২টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক (স্বাস্থ্যকেন্দ্র)। তালিকা থাকলেও অবৈধ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো কার্যক্রম নেই।
আইন না মানার প্রবনতা : বেসরকারী হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনের তোয়াক্কা করছে না। ’৮২ সালের অধ্যাদেশ ৩-এর ধারা অনুযায়ী ফি কেউ নেয় না । আইনে উল্লেখিত ফি’র তুলনায় শতগুণ, এমনকি হাজারগুণ বেশি নেয়া হচ্ছে। যেমন, গলব্লাডার অপারেশন ফি সাড়ে ৩ হাজার ও অ্যাপেনডিক্স অপারেশন খরচ ১ হাজার ৬শ’ টাকা। বিভাগীয় শহরের কোনো কোনো হাসপাতাল গলব্লাডারে কমপক্ষে ৩০ হাজার ও অ্যাপেনডিক্স অপারেশনে ২৫/৩০ হাজার টাকা নিচ্ছে। অধিকাংশ মালিকের অজুহাত, ’৮২ সালের অধ্যাদেশটি আজকের প্রেক্ষাপটে অবাস্তব ও অচল।

সরকারপন্থী চিকিৎসক নেতাদের বিরোধিতা ও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে যুগোপযোগী আইন হচ্ছে না- এমনই অভিযোগ করে থাকেন বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকে মালিকপক্ষ। কেউ কেউ আবার আরেক ধাপ এগিয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নৈরাজ্যের জন্য সরকারকে দায়ি করেন।
আইন প্রণয়ের নামে অপচয় : বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে ’৮২ সালের অধ্যাদেশ যুগোপযোগী করতে উদ্যোগ নেয় বিভিন্ন সরকার। এজন্য খসড়াও তৈরি হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, ‘১৯৯৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সাতবার এ উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন আইন প্রনয়নের নামে সরকারি টাকার অপচয় হলেও কোনো খসড়া আলোর মুখ দেখেনি। মহাজোট সরকারও ক্ষমতারোহনের প্রথম বছরেই নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়। এ সরকারও পারেনি আইনটি প্রণয়ন করতে।

জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে বাণিজ্য : বিস্তর অভিযোগ, হাসপাতাল-ক্লিনিকে নকল ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ফুড সাপ্লিমেন্টারি নামে এক ধরনের ভেজাল ওষুধের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারিত করছে বিভিন্ন অখ্যাত-কুখ্যাত ওষুধ কোম্পানি। কিছু অসাধু ক্লিনিক মালিক ও চিকিৎসক এসব ওষুধ বিপণনকারীদের প্রলোভনে পড়ে রোগীদের লিখে দিচ্ছে এবং রোগীরা উচ্চমূল্যের কিনে সর্বস্বান্ত হচ্ছে।

মেডিসিন জার্নালের খবরে প্রকাশ, চীন, তাইওয়ান, আমেরিকা, জার্মানি, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফুড সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে আমদানি হচ্ছে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ। ইদানিং সিলেটসহ দেশে নকল ঔষধ কারখানায় তৈরি হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী নানা প্রকার ঔষধ। ভেজাল, নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর ওষুধ গ্রহণ করে মানুষ সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরো বেশি অসুস্থ হচ্ছেন, এমনকি বহু ক্ষেত্রে জীবনও দিচ্ছেন। হেপারিন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ।

আসল ওষুধের পরিবর্তে নকল হেপারিন প্রয়োগ করলে জীবন যেতে পারে। দেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। অথচ নকল ম্যালেরিয়ার ওষুধের কারণে হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। প্রপাইলিন গ্লাইকলের পরিবর্তে বিষাক্ত ডাই ইথালিন গ্লাইকল ব্যবহার করার কারণে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ, হাইতি, নাইজেরিয়া, ভারত ও আর্জেন্টিনাতে পাঁচ শতাধিক শিশু মারা যায়। ওষুধ সেবনের পর কাঙিক্ষত ফলাফল পাওয়া না গেলে রোগী ভাবেন তার রোগ নির্ণয় ঠিক হয়নি।

তখন রোগী অন্য ডাক্তারের কাছে যান, পুনরায় বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে নকল ভেজাল ক্ষতিকর ওষুধের কারণে কারো স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে বা মৃত্যু হলে দোষ হয় রোগের, নতুবা ডাক্তারের অথবা হাসপাতালের। রোগীরা কখনো ভাবেনা নকল ভেজাল, নিম্নমানের ওষুধের কারণে রোগী মারা গেছেন। ওষুধের দোকানে অভিজ্ঞ ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসক নেই। অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ ব্যবহারের পর লেবেল, ওষুধের কৌটা বা শিশি, মোড়ক, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ বা গ্লাভস ব্যবহারের পর এগুলো রিপ্যাক করে বাজারজাতে অভিযোগ রয়েছে।

এসব বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কঠোর হস্তে দমন উচিৎ বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। অপরাধের ধরন অনুযায়ী অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তির আওতায় আনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে অন্যরা এক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতে সাহস পাবে না। এর ফলে সাধারণ মানুষের নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত হবে।
সিলেট ড্রাগনিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ড্রাগ সুপারেন্টেন্ড শফিকুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে সঠিকভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হয় না। তারপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাথে নিয়ে অভিযান দিয়ে অর্থদ- ও কারাদ- দেয়া হচ্ছে। অচিরে আবারো অভিযান দেয়া হবে।