শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কমলগঞ্জে বিরল রোগে আক্রান্ত একই ঘরে দুই ভাই-বোন



আসহাবুর ইসলাম শাওন, কমলগঞ্জ থেকে:: বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলা যাওয়া মুক্তা মনির পর সম্প্রতি কমলগঞ্জের আরেক প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্মামী পরিত্যক্তা অসহায় খাতুন বেগমের কন্যা মৃত্যু পথযাত্রী বাবলী আক্তারের পর আবারো

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের উত্তর তিলকপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের দুই সন্তানই অজ্ঞাত জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে ।
জানা যায়, তিলকপুর গ্রামের মো: ফকরুল ইসলাম ও  শিরী বেগম দম্পতির পুত্র মো: সিরাজুছ ছালেকিন (১৮) ও কন্যা আবেদা আক্তার রিমা (১৫) জন্মের ৩ বছর পর থেকে দুই সহোদর অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়।

অজ্ঞাত রোগে আক্রান্তের পর চোখের সামনে ছেলে মেয়ের এমন করুণ অবস্থা দেখে তাদের বাবা তাদেরকে গ্রাম্য কবিরাজের কাছে নিয়ে গিয়ে ঝাড়ফুঁক করান। আর এই পরিবারের অন্ধবিশ্বাসের কারণে ছালেকিনের মুখমন্ডল ও শরীরে রোগটি ক্রমাগত বাড়তে থাকে,একসময় রোগটি মারাত্মক রূপ ধারন করে। অন্যদিকে রিমার রোগটি বেড়ে গিয়ে মুখ ও শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

এই অবস্থাতে ঘরের বাইরে বের হওয়া এ দু’জনার খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পরে। তাদের মধ্যে কেউই সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। ভাই-বোন দীর্ঘদিন যাবত এই ভয়ংকর রোগের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও অজ্ঞতার কারণে অসহায় ফকরুল দম্পতি কোনো সু-চিকিৎসা করাতে পারছেন না তাদের। ভাল কোনো ডাক্তারও দেখাতে পারেননি আজব্দি। একদিকে রোগের যন্ত্রনা অন্যদিকে সংসারের অনটনে চিকিৎসার অভাবে যেন তাঁরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৬ ভাই-বোনের মধ্যে সিরাজুছ ২য় ও রিমা ৩য়। ৬ সন্তানের মধ্যে এ দুজনই বিরল রোগে আক্রান্ত আর বাকিরা সুস্থ্য। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ফকরুল ইসলাম (৫০) কৃষিকাজ করেই খেয়ে না খেয়ে ৮ জনের সংসার চালাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা পায়নি এই অসহায় পরিবার।

প্রথমে সিরাজুছের মুখে একটি ক্ষতচিহ্ন ও সাদা সাদা দাগ দেখা যায়। পরে তা মারাত্মক রূপ ধারন করে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে । সে তরল জাতীয় খাদ্য ছাড়া কিছুই খেতে পারে না। রিমার শরীরে ও মুখে প্রথমে কিছু সাদা সাদা দাগ ছিল । পরে তা পুরো মুখে ও শরীরে ছড়িয়ে পড়ে মারত্মক কালো রূপ ধারন করে।

সূর্যের আলোতে ঠিকমতো সে ঠিকমত তাকাতে না পারায় তার অভিভাবকরা স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে চিকিৎসক রোগটি সনাক্ত করতে পারেননি। স্থানীয়দের পরার্মশে পরবর্তীতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর ডাক্তাররা সঠিক রোগটি সনাক্ত করতে না পারায় এবং সুনিদিষ্ট কিছু না বলায় রোগাক্রান্ত ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন বাবা ফকরুল ইসলাম। এখন মা শিরী বেগম ও বড় ভাই শামসুল আরেফিন তাদের দেখাশুনা শুরু করেন।

এ বিষয়ে রোগাক্রান্ত ছেলে-মেয়ের বাবা মো: ফকরুল ইসলাম এর রোগের বিষয়ে কথা বললে তিনি অসহায়ের মত কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ছেলে মেয়েদের চিকিৎসার প্রধান সমস্যা হচ্ছে অর্থনৈতিক বাঁধা। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, এঅবস্থায় নিজের চোঁখের সামনে ছেলে মেয়ের এ করুণ আর্তনাদ দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই তাদের।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ ৫০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সৈয়দ শওকত আলী আলাপকালে তিনি জানান, এটি জিনগত সমস্যা হতে পারে। রোগীর চামড়ার কোষে মেলানিন না থাকায় সূর্যের আলোর অতিবেগুনী রশ্মিতে কোষের DNA নষ্ট হয়ে যায়। ক্রমাগত অতিবেগুনী রশ্মির সম্মুখীন হলে DNA নষ্ট হয়ে এক সময় এটি ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
প্রাথমিকভাবে তিনি ধারনা করছেন রোগটি (Xeroderma Pigmentosam) হতে পারে। এটি একটি বিরল ধরনের রোগ। ছেলে ও মেয়েটি দু’জন কে সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ অথবা পিজি হাসপাতালে পাঠানো যেতে পারে।

রোগাক্রান্ত ছেলে-মেয়ের বাবা সরকারের কাছে তার ছেলে-মেয়ের চিকিৎসার জন্য আকুল আবেদন জানান। সরকার বা সমাজের বিত্তশালীরা এগিয়ে এসে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে যদি এই অসহায় ভাই-বোনের চিকিৎসার দায়িত্ববার গ্রহণ করেন, তাহলেই হয়তো নতুন জীবন ফিরে পেতে পারে বিরল রোগে আক্রান্ত ছালেকিন ও রিমা।

উল্লেখ্য বিরল রোগে আক্রান্ত শিশু বাবলীর চিকিৎসার জন্য গরীব এন্ড এয়াতিম ফান্ড ট্রাস্ট ইউকে শাখার চেয়ারম্যান সহযোগীতার হাত বাড়ালেও,বিরল রোগে আক্রান্ত এ দুই ভাই-বোন ছালেকিন ও রিমা সু-চিকিৎসার জন্য উদাহরতা দেখাবে কে…?