শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কোতোয়ালী থানার প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত  » «   জগন্নাথপুরে ছাত্রদল নেতাকে ইউনিয়ন যুবলীগের আহবায়ক করায় ১১ সদস্যের পদত্যাগ !  » «   খাদিমনগরে ইউপি সদস্য দিলুকে জড়িয়ে মিথ্যাচারের প্রতিবাদে মানববন্ধন  » «   কারবালার আত্মাদান হলো জালিমের সামনে আল্লাহর বাণী প্রচারে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত: রেদওয়ান আহমদ চৌধুরী  » «   খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেই বিচার চালিয়ে যাওয়া ন্যায়বিচার পরিপন্থি: ফখরুল  » «   বিশ্বনাথে নারীদের ত্রি-মাসিক সেলাই প্রশিক্ষণের উদ্বোধন  » «   সিলেটে শিশু অপহরণ ও ধর্ষণ : ৬ দিনপর রংপুর থেকে উদ্ধার  » «   সিলেট আদালতে স্বীকারোক্তি : ধর্ষণের পর পানিতে চুবিয়ে রুমিকে হত্যা  » «   ওসমানীনগরে প্রানীসম্পদ ও ভেটেনারি হাসপাতালের নবনির্মিত ভবন উদ্ভোধন  » «   ছাতকে সেচ্ছাশ্রমে কাঁচা সড়ক সংস্কার  » «  

আদর্শবান মানুষ ছিলেন আব্দুল মুকিদ



পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ মরেও অমরত্ব লাভ করেছেন। তাঁরা বেঁচে আছেন নিজ কর্ম গুণে। নিজ নিজ কর্ম ক্ষেত্রে অবদানের কারনে খ্যাতির শিখরে আরোহন করেছেন অনেকেই। এমন একজন আদর্শবান মানুষের নাম আব্দুল মুকিদ। তাঁর অকাল মৃত্যুতে বিশ্বনাথ সহ দেশ বিদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মানবতার প্রতীক শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিদকে হারিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু- বান্দব সহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষ শোকাহত। কিন্তু কারো কিছু করার নেই। জন্ম নিলেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়। গত ১৯ আগষ্ট রবিবার বিশ্বনাথ উপজেলার দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিদ মধুবন সুপার মার্কেটে হিস্ট্রোকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

তিনি জোহরের নামাজ পড়ার জন্য মধুবন সুপার মার্কেটের সিড়ি বেয়ে ৪র্থ তলায় উঠে এক পা মসজিদের ভেতর ঢুকে পূর্ণরায় নিচে ফিরে এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সাথে সাথে তাঁকে চিকিৎসকের নিকট নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষনা করেন। এই তথ্য জানিয়েছেন তাঁর নিকটাত্মীয় সাংবাদিক মোসাদ্দিক হোসেন সাজুল। তিনি এসময় মধুবন মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ছিলেন। আব্দুল মুকিদ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ জনিত রোগে ভোগছিলেন।

এই দিন সিলেটে খুব বেশি তাপমাত্রা ছিল। তাঁর মৃত্যুর খবর মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে দেশে বিদেশে কান্নার রোল পড়ে যায় এবং তাঁর বাড়িতে শত শত শিক্ষার্থী, অভিভাবক , রাজনৈতিক, সামাজিক নেতৃবৃন্দ ও সহপাঠিগণ এসে ভিড় জমান। সুদৃর যুক্তরাজ্য থেকে সহপাঠি আযম খানও চলে আসেন। ঐদিন রাত ৯ টায় তাঁর প্রিয় প্রতিষ্টান দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ মাঠে তাঁর জানাজা শেষে পারিবারিক গুরুস্থানে দাফন করা হয়। এসময় অনেকেই অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়। স্বজনদের কান্নায় সেদিন আকাশ বাতাস ভারি হয়েছিল।

অধ্যক্ষ আব্দুল মুকিদ ১৯৭০ সালের ২৭ মার্চ সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দেওকলস ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কান্দি গাঁও গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৃত মো: আব্দুল বারি, মাতার নাম শিরিয়া বেগম, দাদার নাম মৃত মৌলভী ইরফান আলী। ৫ ভাই বোনের মধ্যে আব্দুল মুকিদ ছিলেন সবার বড়। আব্দুল মুকিদ কান্দি গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রের্ণী, এবং দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সহিত এসএসসি পাস করে সিলেট সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন।

তাঁর পর তিনি উদ্ভিদ বিজ্ঞানে চট্টগ্রাম বিশবিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে ১৯৯৬ সালে দেওকলস দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্টানটি সারা বাংলাদেশের মধ্যে সেরা প্রতিষ্টানের গৌরব অর্জন করে এবং তিনি শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন। তাঁর ছোট ভাই আব্দুল মুহিদ উদ্ভিদ বিজ্ঞানে মাষ্টার ও এমবিএ সমাপ্ত করেছেন। বড় ছেলে রুবায়েদ ছাদমান সাম এইচএসসি এবং ছোট ছেলে রাফায়েত আদমান সাদ সপ্তম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। প্রতিষ্টানটির অবকাটামো ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে দীর্ঘ ২২ বছর পরিশ্রম করেছেন তিনি।

ছোট বেলা থেকেই আব্দুল মুকিদ শান্ত প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি একেবারে সহজ সরল জীবন-যাপন করেছেন। তিনি কথা বলতেন কম শুনতেন বেশি। তাঁর অসীম ধৈয্য শক্তি ছিল। নীতি-নৈতীকতা মানবতা পরোপকার ছিল তাঁর চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট। তিনি ছিলেন নির্লোভ ও প্রচার বিমুখ। আর্থিক অনেক সুবিধা পেয়েও তিনি এ প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে যাননি। বিশ্বনাথ মাধ্যমিক পাবলিক পরিক্ষায় নকল প্রতিরোধ ও সরকারের সকল নিয়ম কানুন পালনে ছিলেন অনড়।

তিনি একজন সাংকৃতিক মনা মানুষ ছিলেন। প্রতি বছর শীতকালে বিদ্যালয় মাঠে ৩ দিন ব্যাপী সাংকৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। আব্দুল মুকিদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয় দিয়ে লালন পালন করতেন এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধের হারিয়ে যাওয়া তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতেন।

তিনি উপজেলা আওয়ামীলীগের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। মহাকবি ইসহাক রেজা চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহচর যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্য তম সংগঠক মরহুম গাউছ খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম ইফতেখার হোসেন শামিম, সিরাজুল ইসলাম বীর প্রতীক অনেক গুণী লোকের জন্ম এ ইউনিয়নে। তিনি তাদের জীবনাচার ও নীতি নৈতিকতাকে অনুসরন করে অজোপাড়াগায়ে জন্ম নেয়া মানুষটি অকালে হারিয়ে যাবেন তা কেউ ভাবতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুতে সবাই বাকরুদ্ধ।

অধ্যক্ষ আব্দুল মুকিদ বয়সে আমার ছোট হলেও জ্ঞানে-গুণে শিক্ষা-দীক্ষায়, আচার ব্যবহারে ছিলেন অনেক দুর এগিয়ে। প্রায় ৩০ বছরের চলা ফেরার জীবনে আব্দুল মুকিদকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। মৃত্যুর প্রায় সপ্তাহ খানেক পূর্বে সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম খায়েরের বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে আমার বাসায় এক বৈঠকে আব্দুল মুকিদ ৫ তলা সিড়ি বেয়ে এসে প্রচুর ঘামছিলেন এবং বলছিলেন এত কষ্ট দিয়ে আমাকে উপরে তুলে আপনার লাভ কি? উত্তরে আমি বলেছিলাম, তুমি শিক্ষিত হয়েছ পরের জন্য নিজের জন্য নয়।

তোমার শরীররের ওজন বেশি হয়েছে, উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা। চিকিৎসা না করালে সন্তান গুলোকে এতিম করে চলে যাবে। কাল থেকে নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখবে। আমার মুখ ফসকে গিয়ে এবস কথা বলেছিলাম। এ দিনই তাঁর সাথে আমার জীবনের শেষ কথা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে আমি প্রচন্ড ভাবে আঘাত পেয়েছি। এমন কথা তাঁকে বলায় সারা জীবন আমাকে পীড়া দেবে।

১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ আজিজুর রহমান। সেই নির্বাচনে প্রচারের একমাত্র হাতিয়ার ছিল, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং এক সময় সিলেটে পাকিস্তানের তথা কথিত লৌহ মানব আইয়ুব খানকে শাহ আজিজুর রহমান জুতা নিক্ষেপ করেছিলেন। এমন প্রচারনায় শাহ আজিজ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের খুব কম সংখ্যক লোক প্রচারনায় যুক্ত হয়েছিলেন। দেওকলস ইউনিয়নে প্রচার কালীন সময়ে আমি অধ্যক্ষ আব্দুল মুকিদ, আজম খান (যুক্তরাজ্য প্রবাসি), খলিলুর রহমান ও সমসিদ খান (যুক্তরাষ্ট প্রবাসি) সহ অনেকেই ছিলেন। আমি আযম খানের বাড়িতে ৩ দিন রাত্রী যাপনও করেছিলাম। শেষ দিনটি ছিল শুক্রবার।

ফজরের নামাজের পর থেকে শাহ আজিজকে নিয়ে ঘরে ঘরে ভোট চেয়ে জুমার নামাজের সময় কান্দিগ্রাম মসজিদে এসে সমবেত হই। এসময় শাহ আজিজুর রহমানের দুই পা’দিয়ে প্রচুর রক্ত ঝরছিল। আমার পেন্ট ছিড়ে যায় এবং আব্দুল মুকিদের জুতা কোথায় পড়ে ছিল তার কোন খবর ছিলনা। আব্দুল মুকিদ তখন শাহ আজিজের দু’পায়ের রক্ত নিজ হাতে মুছে দিয়ে তাঁকে নামাজ পড়ার সুযোগ করে দিয়ে ছিলেন। এমন ঘটনা মসজিদের অনেকেই দেখছিলেন।

নিরহঙ্কার এ মানুষটি মৃত্যুর পর বার বার এই স্মৃতি স্মরণ হচ্ছে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দেখিয়ে আব্দুল মুকিদ নিজেই সম্মানী হয়ে ছিলেন। আওয়ামীলীগের কোন বৈঠকে বসলে সবাই তাঁর মুখের দিকে চেয়ে থাকতেন। তিনি মূল্যবান কথা বলতেন। দেওকলস স্কুল এন্ড কলেজকে তিলে তিলে নিজের মত করে গড়ে ছিলেন প্রতিষ্টানটিকে। তাঁর এ শুন্যতায় প্রতিষ্টানটি যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে এলাকাবাসিকে। তাঁর এতিম সন্তান গুলোর খোজ খবর রাখলে চীর কৃতজ্ঞ থাকব। পরিশেষে শিক্ষাবিদ আব্দুল মুকিদের বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করছি।

এ এইচ এম ফিরোজ আলী
লেখক, সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সমাজ বিশ্লেষক
মোবাইল: ০১৭১১ ৪৭৩১৫৫