সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর
প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে সিলেট কওমি মাদরাসা বোর্ডের শুকরিয়া মিছিল  » «   বিশ্বনাথে গোপন বৈঠক কালে ১৭ জামাত নেতা আটক  » «   হোটেল শ্রমিক উইনিয়নের বিক্ষোভ মিছিল  » «   জেলা পরিষদের অর্থায়নে সংযোগ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন-এড. লুৎফুর রহমান  » «   জগন্নাথপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় ২৫ জনের জামিন হওয়ায় এলাকায় স্বস্তি  » «   বিশ্বনাথে মাজার নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন  » «   সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ফয়জুল মুনির চৌধুরী’র মোটর সাইলেক শোডাউন  » «   চারখাই ত্রিমুখে ‘শহীদ নাহিদ চত্বর’র উদ্বোধন করলেন শিক্ষামন্ত্রী  » «   কমলগঞ্জের ধলই চা বাগানে মস্তকবিহিন নারীর লাশ উদ্ধার  » «   ওসমানীনগরে বাস চাপায় নিহত ২ : আহত ২  » «  

বিআরটিএ অফিসে দুর্নীতি সড়ক দুর্ঘটনার আরেক কারণ



জাবেদ এমরান:: পদে পদে ভোগান্তি। দালাল ছাঁড়া হয় না সিলেট বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) অফিসে কোনো কাজ। গুনতে হয় সরকার নির্ধারিত বাড়তি কয়েকগুণ টাকা। দালালের মাধ্যমে কাজ না করালে নানা অজুহাতে মাসের পর মাস ফাইল আটকে দেয়া হয়। হয়রানীর শিকার হয়ে তিক্তবিরক্ত ও অসহায় হয়ে পড়েন ভুক্তভোগীরা।

বিআরটিএ অফিসের দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলে র‌্যাব ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান হয়। প্রত্যেক অভিযানে স্বল্পসংখ্যক দালাল আটক করে কারাগারে প্রেরণ করার দু’দিন পর তারা বেরিয়ে আসে। মাস-পনেরোদিন বিআরটিএ অফিস দালালমুক্ত থাকলেও পরে তাদের দৌরাত্ম্য আগের মতো বেড়ে যায়। নিজেদের আখের গোছানোর জন্য দালাল পোষে রাখেন অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। হয়রানি আর সরকার নির্ধারিত ফি’র কয়েকগুণ টাকা বাড়তি দেয়ার ভয়ে অনেক যানবাহন মালিক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য চালকরা বিআরটিএ অফিসে যাচ্ছেন না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, যানবাহন ধরপাকড়ের কারণে ভীড় বেড়েছে বিআরটিএ অফিসে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য লার্নার ফরম নেয়া থেকে শুরু করে জমা দেয়া, লিখিত পরীক্ষা, ফিল্ড টেস্ট, বায়োমেট্রিক ছাপ, নবায়ন, গাড়ির ফিটনেস, রোড পারমিটসহ সব কাজ দালালের মাধ্যমে না করালে দিতে হয় ভুলের মাশুল । স্বাভাবিক নিয়মে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে যেখানে ৩মাস লাগার কথা সেখানে এক বছর সময় লেগে যায়।

তার উপর পেশাদার লাইসেন্স করতে যেখানে প্রায় ২ হাজার ও অপেশাদার এর জন্য ৩ হাজার টাকা ফি নির্ধারিত, সেখানে ৭ হাজার টাকার নিচে কোন লাইসেন্স হয় না। আবার একেবারে কোন কিছু না পারলেও ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকায় মিলছে লাইসেন্স। পদে পদে ভোগান্তি, দীর্ঘসূত্রিতা, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে না পেরে অনেকে সড়কে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়ে গাড়ি চালান। ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর অদক্ষ, লাইসেন্সবিহীন চালকের কারনে প্রতিদিন সড়কে যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে তার দায়ভার বিআরটিএ’র উপরও বর্তায়। পরিবহণ নেতারা প্রশাসনের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে বিআরটিএ অফিস দুর্নীতিমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে প্রথমে লার্নার নিতে হয়। ৩ মাসের জন্য লার্নার ব্যবহার করে গাড়ি চালানোর অনুমোদন দেয়া হয়। দুই মাস পরে পরীক্ষা নেয়া হয় (লিখিত-১০, ভাইভা-২০, ফিল্ড টেস্ট-৭০)। পরীক্ষায় পাশ করলে পুলিশ ভেরিফিকেশন, বায়োমেট্রিক ছাপসহ আনুসাঙ্গিক কাজে ৩ থেকে সাড়ে ৩ মাসে লাইসেন্স পাওয়ার কথা।

পেশাদার লাইসেন্স পেতে প্রায় ২ হাজার এবং অপেশাদার লাইসেন্স পেতে প্রায় ৩ হাজার টাকা লাগে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৭ হাজার টাকার নিচে কোন লাইসেন্স করা যায় না এবং ৮মাস থেকে এক বছরের আগে সেই লাইসেন্স পাওয়া যায় না।

ভুক্তভোগীরা জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্সের লার্নার ফরম সংগ্রহ থেকেই শুরু হয় ভোগান্তি। লার্নার ফরম অফিস থেকে দেয়ার কথা থাকলেও ফটোকপির দোকান থেকে সংগ্রহ করতে বলা হয়। জমা দেয়ার সময়ও পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। মোটরসাইকেল ৩৪৫ ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য (২টি একসাথে) ৫১৮ টাকায় লার্নার লাইসেন্স নিতে প্রায় হাজার টাকা ব্যয় হয়। দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় না করলে ড্রাইভিং পরীক্ষা দিলেও ফেল রাখা, পুলিশ ভেরিফিকেশন, বায়োমেট্রিক ছাপ দিতে দীর্ঘ লাইন অর্থাৎ লাইসেন্স প্রাপ্তির সকল ধাপে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। পরে লাইসেন্স পেতে ৪ পৃষ্ঠার একটি ইংরেজি ফরম পূরণ করতে হয়। যা অধিকাংশের জন্যই প্রায় অসম্ভব। কিন্তু বিকল্প পথে গেলে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা দিলে শুধু নির্দিষ্ট দিন উপস্থিত থাকলেই ধারাবাহিকভাবে সব কাজ হয়ে যায়। আবার একেবারে কোন কিছু না পারলে ও উপস্থিত না থেকেও ১৬ হাজার টাকা দিলে পাশ দেখিয়ে অল্প সময়ে মিলে লাইসেন্স।

সম্প্রতি বিআরটিএ অফিসে আসা কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা বলেন, দালাল দিয়ে কাজ করিয়েছেন। শুধু লাইসেন্সই নয়, গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেটের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি বাদে মোটরসাইকেলের জন্য দিতে হয় ৭শ টাকা, কার, মাইক্রোবাস, লেগুনা, হাইয়েস এর জন্য ১ হাজার টাক, বাস ২ হাজার এবং ট্রাকের জন্য দিতে হয় ৩ হাজার টাকা। একইভাবে রুট পারমিটের জন্যেও প্রত্যেক ক্ষেত্রে তাদের নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দিতে হয়।

দীর্ঘদিন থেকে গাড়ি ব্যবসার সাথে জড়িত রায়হান আহমদ বলেন, সিলেট বিআরটিএ দুর্নীতির আখড়া। এখানে সব অনিয়মই নিয়ম। দালাল ছাঁড়া কোন কাজ হয় না। ৮মাস পূর্বে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকার পরও নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়ে নির্ধারিত প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচের স্থানে ৭ হাজার টাকা খরচ করেছি। তার আগে টাকা বাঁচাতে নিজে নিজে চেষ্টা করে ৬মাসে নিজের শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করে সীমাহীন ভোগান্তিতে পরে দালাল দিয়ে করাতে বাদ্য হয়েছি। তিনি বিআরটিএ’র দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সুদৃষ্টি কামনা করেন। এদিকে সিএনজি চালক আলাউদ্দিন জানান, ২০০৫ সালের
পর ভোগান্তির কথা চিন্তা করে আর নবায়ন করা হয়নি। কিছুদিন পূর্বে সাড়ে ৭ হাজার টাকায় নতুন লাইসেন্স নিয়েছেন।

দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে প্রশ্ন তুললে সিলেট বিআরটিএ অফিসের মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি পুর্বে চট্রগ্রাম অঞ্চলে ছিলাম। সিলেটে জয়েন্ট করার পর দেখি এই অবস্থা। এখানের দালালরা স্থানীও ও অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে যাবার কোন পথ না থাকায় আমরা অনেকটা তাদের কাছে জিম্মি বলে জানান মামুন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দালাল বলেন, মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ নতুন আসা অফিসারদের বেঁধে দেয়া টাকা কম দিলে তারা ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। ফাইল ফেলে রাখেন টাকা না দেয়া পর্যন্ত। প্রতিটা কাজে আলাদা আলাদা রেট নির্ধারণ করা আছে। তিনি আরো বলেন, ভাই, এসব লেখালেখি করে কি হবে? আসেন- এক স্যারের সাথে কথা বলে একটা ম্যানেজ করে দেই বলে প্রতিবেদককে প্রস্তাব দেন। বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাক্ষাণ করলে অনেকটা ক্ষুব্ধের সুরে ওই দালাল বলেন, মাস শেষে অনেক সাম্বাদিকসহ (সাংবাদিক) কয়েক সংস্থার লোকজন অফিস থেকে খাম নিয়ে যান। এ যোগে সত্যের ভাত নেই।

এব্যাপারে নিরাপদ সড়ক চাই নিসচা এর কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেটের উপদেষ্টা মো. জহিরুল ইসলাম মিশু বলেন, বিষয়টি যখন সামনে চলে এসেছে তখন আর অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। নিরাপদ সড়ক এখন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সড়ক নিরাপদ করতে হলে চালকদের দুর্ভোগ লাঘব করতে হবে এবং বিআরটিএকে জনবান্ধব-স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তিনি বলেন, লাইসেন্স সবাই নিতে আগ্রহী। কিন্তু ভোগান্তির বিষয়টি যখন চিন্তা করে তখন অনেকে পিছু হটেন। বিআরটিএ তে কোন অনিয়ম থাকলে সরকারি সংস্থা র‌্যাব, দুদক ব্যবস্থা নিতে পারে। একই সাথে বিআরটিএ এর কাঠামোগত সম্প্রসারণে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।