বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কুসুম গরম পানি পানের ম্যাজিক্যাল সুফল



গ্রীষ্ম প্রধান দেশ বাংলাদেশ। গরমের উত্তাপের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন বাচাঁতে মানুষের কাছে এক গ্লাস ঠান্ডা পানিই যেনো কোনো কোনো সময় হয়ে উঠে পরম বন্ধু।

কিন্তু গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল ভিন্ন কথা বলে, প্রকাশ করে ভিন্ন রুপ। এক গ্লাস ঠান্ডা পানিই ধীরে ধীরে হতে পারে দেহের নানাবিধ ক্ষতির কারন।

পারতপক্ষে বিষয়টি জানা আছে অনেকেরই কিন্তু সচেতনার অভাব আমাদের চোখকে করে রেখেছে অন্ধ। পানির অপর নাম জীবন। সুস্থভাবে জীবনধারনের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীর দৈনিক ১.৫-৩.৫ লিটার (৬-১৪ গ্লাস) পানি পান করা আবশ্যক।

কিন্তু সেই পানি একদিকে যেমন হতে হবে জীবানুমুক্ত ও বিশুদ্ধ অপরদিকে পানি পানের সময় খেয়াল রাখতে হবে পানির তাপমাত্রাও। ঠান্ডা পানি পানের যেমন রয়েছে নানারকম ক্ষতিকর প্রভাব ঠিক তার বিপরীতে কুসুম গরম পানি পানে রয়েছে অনেক অপ্রকাশিত উপকারিতাও। সেই উপকারীতাগুলোর মধ্য থেকে অন্যতম প্রধান পাঁচটি (৫টি) উপকারীতা তুলে ধরা হলো।

১. এসিডিটি সমস্যা মোকাবেলা করতে সাহায্য করে:
বাংলাদেশের প্রতিটি বাসা-বাড়ীতে বিশেষতঃ শহর অঞ্চলের প্রতিটি বাসায় অন্তত একজন হলেও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় আক্রান্ত। এসিডিটি সমস্যা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাবার অন্যতম সহজ ও সুলফ উপায় হচ্ছে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক গ্লাস করে কুসুম গরম পানি পান করা।

যা দেহের অভ্যন্তরীন অংশ থেকে যাবতীয় ক্ষতিকর পদার্থ দেহের বাইরে বের করে আনতে সাহায্য করে, সাথে পরিপাকযন্ত্রের কার্য ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয় বহুগুনে। ফলে গ্রহণকৃত খাদ্য তাড়াতাড়ি হজম হয় এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমায় অনেকাংশে। বিপরীতভাবে, এক গ্লাস ঠান্ডা পানি গ্রহণের ফলে পরিপাকক্রিয়া বাঁধাপ্রাপ্ত হয় ফলে খাবার হজমে সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি খাবারে বিদ্যমান তেল/চর্বি দেহের অভ্যন্তরীনভাগে জমতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে তা ফ্যাট সেল হিসেবে আন্ত:প্রকাশ করে।

২. রক্ত পরিষ্কার করে ও ব্রন সমস্যা কমায়:
ঈষৎ উষ্ণ পানি পানের ফলে দেহের ক্ষতিকর পদার্থ দেহ থেকে বের হয়ে যাবার পাশাপাশি সারা শরীরে বিশুদ্ধ রক্ত প্রবাহের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মানুষের স্নায়ুযন্ত্রের (নার্ভাস সিস্টেম) সক্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। বিশুদ্ধ রক্ত প্রবাহের ফলে ব্রন সমস্যার মাত্রা কিছুটা কমে যায়। পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ত্বকের ছোটখাটো অনেক সমস্যা দূর হয় এবং ত্বক পুনরজ্জীবিত হয়।

৩. অনাকাংক্ষিত ওজন ও পেটের মেদ কমায়:
উষ্ণ পানি পানের সবচেয়ে বড় সুফল হচ্ছে এটি পেটের মেদ কমাতে সাহায্য করে। সাধারনত কুসুম গরম পানি এক/দুই চামচ লেবুর রসের সাথে মিশিয়ে পান করলে ভাল সুফল পাওয়া যায় কিন্তু শুধু কুসুম গরম পানি পানের মাধ্যমেও এই উপকারীতাটি পাওয়া যাবে। উষ্ণ পানি দেহে প্রবেশের সাথে সাথে পরিপাকযন্ত্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায় যা ফ্যাট বার্নিং প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে এবং মেটাবলিজম্ বাড়ায়, যা পরবর্তীতে পেটের মেদ ও ওজন কমাতে সাহায্য করে।

৪. অকালবার্ধক্য জনিত সমস্যা হ্রাস করে:
প্রতিনিয়ত উষ্ণ পানি পান স্বাভাবিকভাবে বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সচল রাখে, সাথে দেহের বিভিন্ন রাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী হওয়া ক্ষতিকর ফ্রি রেডিক্যালের কার্য ক্ষমতাও হ্রাস করে। যা অকালবার্ধক্য হবার প্রবণতা কমায় এবং পাশাপাশি আঘাতপ্রাপ্ত কোষগুলোকে পুনরজ্জীবিত করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ত্বকের ইলাস্টিসিটিও বৃদ্ধি পায়।

৫. ব্যথা কমায়:
মাসিকের দিনগুলোতে তলপেটে ব্যাথা কমবেশি সব মেয়েরই হয়ে থাকে। ব্যাথা কমাতে সাধারনত তারা খেয়ে থাকে নানাপ্রকারের ক্ষতিকর ব্যাথানাশক। গরম পানি পানের মাধ্যমে মাসিকের ব্যাথা থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়ার নিরাপদ এই প্রক্রিয়াটি আদিমকাল থেকেই প্রচলিত। গরম পানি পানের মাধ্যমে পেটের মাসল্ কিছুটা রিলাক্স হয় ফলে অসস্তি¡কর অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ মেলে। এছাড়াও দৈনিক কুসুম গরম পানি পান মাইগ্রেনের অ্যাটাক থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়।

সতর্কতা:
গরম পানি পানের উপকারীতা অনেক কিন্তু সেই উপকারীতা পেতে অতিরিক্ত পানি পান বা পানির তাপমাত্রা অতিরিক্ত হওয়া অবাঞ্চণীয়। এছাড়াও লেবুর রস মিশানোর সময় পরিমান বুঝে সর্তকভাবে মেশানো উচিত।
————————————————————

তামান্না তমা খান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পুষ্টি ইউনিট, পিবিআরজি উপ-প্রকল্প) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল
———————————————————————-