সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর
প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে সিলেট কওমি মাদরাসা বোর্ডের শুকরিয়া মিছিল  » «   বিশ্বনাথে গোপন বৈঠক কালে ১৭ জামাত নেতা আটক  » «   হোটেল শ্রমিক উইনিয়নের বিক্ষোভ মিছিল  » «   জেলা পরিষদের অর্থায়নে সংযোগ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন-এড. লুৎফুর রহমান  » «   জগন্নাথপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় ২৫ জনের জামিন হওয়ায় এলাকায় স্বস্তি  » «   বিশ্বনাথে মাজার নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন  » «   সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ফয়জুল মুনির চৌধুরী’র মোটর সাইলেক শোডাউন  » «   চারখাই ত্রিমুখে ‘শহীদ নাহিদ চত্বর’র উদ্বোধন করলেন শিক্ষামন্ত্রী  » «   কমলগঞ্জের ধলই চা বাগানে মস্তকবিহিন নারীর লাশ উদ্ধার  » «   ওসমানীনগরে বাস চাপায় নিহত ২ : আহত ২  » «  

সিলেটের সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু নামাচ্ছে চোরাকারবারী সিন্ডিকেট



* পশুর চাহিদা ৫ লাখ * অবৈধভাবে গরু প্রবেশে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শংকিত * অবৈধ পশু হাটের নেতৃত্বে সরকারদলীয় নেতারা * হোন্ডা-গুন্ডা দিয়ে বাধ্য করা হচ্ছে অবৈধ হাটে গরু নামাতে * জমেনি এখন্ও পশুর হাট
* অনলাইনে পশু বিক্রির ব্যাপকতা বাড়ছে

ফয়সাল আমীন:: সিলেটের সীমান্ত দিয়ে নামছে ভারতীয় গরুর ঢল। সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে কোনবানী ঈদকে টার্গেট করে। বিশেষ করে সীমান্তের বিছানকান্দি এলাকা গরু চোরাচালানের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়ে উঠছে। সীমান্ত পেরোনোর পর কিছুটা নৌপথ ও কিছুটা সড়কপথ হয়ে শহরে বাজার গুলোতে ঢুকছে এ গরুগুলো। কেবল বিছনাকান্দি দিয়েই প্রতিদিন প্রায় পাঁচশ গরু অবৈধভাবে আসছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে নানা হম্বিতম্বি, প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের হুশিয়ারি সত্ত্বেও ঠেকানো যায়নি অবৈধ পশুর হাট। ঈদের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে নগরজুড়ে বসেছে অবৈধ পশুর হাট। নগরীতে অন্তত ১৫টি অবৈধ পশুর হাটের তথ্য পাওয়া গেছে। সবগুলোর পেছনেই সরকার দলীয় নেতাদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। দলীয় নেতারা হোন্ডা আর গুন্ডা ( দলীয় ক্যাডার বাহিনী) লেলিয়ে জোরপূর্বক পশুবাহী গাড়ি আটকিয়ে বাজারে গরু তুলতে বাধ্য করছেন বেপারীদের বলে জানা গেছে।

চলমান এ পরিস্থিতির মধ্য্ওে এখন্ও জমে উঠেনি প্রবাসী অধ্যূষিত সিলেটের কোরবানী বাজার। প্রতিকুল আবহ্ওায়া সহ নানাবিধ কারন রয়েছে এর নৈপথ্যে। বিশেষ করে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ নির্ভর কোরবানী পালন হয় সিলেটে। সেকারনে নিকট অতীতে জমজমাট থাকতো বাজারগুলো। কিন্তু ইদানিং দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারনে দেশ বিমুখ হয়ে উঠছে সিলেটের প্রবাসীরা। বেশিরভাগ প্রবাসীরা সেই দেশের কোরবানীর ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন। যেকারনে দেশে কোরবানীর দ্ওেয়ার প্রবনতা ক্রমশ: হ্রাস ঘটছে তাদের চিন্তা ধারায়।

তবে কোরবানী বাজারে এবারকার আকর্ষন হয়ে উঠছে অনলাইনে পশু বেচাকেনা। গত কয়েকবছর ধরে চলে আসল্ওে এবার ব্যাপকতা পেয়েছে। এর আগে খামারের উদ্যোক্তা কিংবা হাটের ইজারাদাররা পশু বিক্রির প্রচারণা চালালেও। এবার সেই কেনাবেচা বিস্তৃতি পেয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ে। অনেকে শুধুমাত্র কোরবানির আগে স্বল্পসংখ্যক পশু কিনে তা অনলাইনে বিক্রি করে আয় করে নিচ্ছেন। অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুধু সিলেট শহরেই নয় সিলেটের বিভিন্ন উপজেলাতেও এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

এদিকে, কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেট, সিলেট কার্যালয় সূত্র জানায়, ভোরত বৈধভাবে বাংলাদেশে গরু রপ্তানি করে না। তবু প্রতিবছর ঈদুল আযহার মৌসুমে সিলেটের সীমান্তগুলো দিয়ে ভারত থেকে আসে অসংখ্য গরু। এসব গরু আমদানি বন্ধ করতে না পেরে গতবছর সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তে চারটি করিডোর খোলা হয়েছে।

এসব করিডোর নিয়ে আনা গরু মাত্র ৫শ’ টাকা রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশের বৈধতা প্রদান করা হয়। তবে চোরাকারবারিরা এই পাঁচশ’ টাকা ফাঁকি দেওয়ার জন্য করিডোর দিয়ে না এনে অন্যান্য সীমান্ত নিয়ে অবৈধভাবে দেশে গরু নিয়ে আসছে। এই চোরাচালানে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি)-এর স্থানীয় দায়িত্বশীলরা জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠেছে।

স্থানীয় প্রশাসন আর রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিজিবির প্রশ্রয়ে বন্ধ করা যাচ্ছে না এই গরু চোরাচালান। তবে বিজিবির কর্মকর্তা গরু চোরাচালানের বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছেন, সরকারকে নির্ধারিত রাজস্ব দিয়ে বৈধভাবেই আসছে গরু।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয়ের উপ পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন আহমদের দাবি, সিলেটে কোরবানির চাহিদা পূরণের মতো যথেষ্ট গবাদিপশু রয়েছে। ফলে গরু আমদানির প্রয়োজন নেই। আমদানি করলে স্থানীয় খামারিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সিলেট বিভাগে এই ঈদে প্রায় ৫ লাখ গবাদিপশু কোরবানি দেওয়া হবে বলে ধারণা তাঁর।

বিছনাকান্দি স্থানীয় সূত্র মতে, সীমান্তের ওপারের ভারতীয় টিলা থেকে দলবেঁধে নেমে আসছে গরু। টিলা থেকে নেমে ঝর্ণার জলে সাঁতরে গরু প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। ওপারের টিলার উপর থেকে কয়েকজন এদিকে ছেড়ে দিচ্ছেন গরুগুলিকে। এপারে আসার পর আরও কয়েকজন গুণে গুণে গরুগুলি ইঞ্জিন নৌকায় তুলছে। তারপর গরু নিয়ে আসা হচ্ছে সিলেটের নগরী অভিমুখে। আশপাশেই বিজিবিই সদস্যরা টহল দিলেও এ ব্যাপারে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তাদের।

সূত্র আরো জানায়, গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি দিয়েই সবচেয়ে বেশি গরু চোরাচালান হচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া একই উপজেলার পাংথুমাই, জাফলং, বিয়ানীবাজারের শ্যাওলা, সুনামগঞ্জের বড়ছড়াসহ কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে অবৈধপথে আসছে গরু। জানা যায়, গত বছর থেকে সিলেট ভোলাগঞ্জের মাঝেরগাও, হবিগঞ্জের বাল্লা ও সুনামগঞ্জের ছাতকে গরু আমদানির জন্য করিডোর উন্মুক্ত করে রাজস্ব বিভাগ।

করিডোরের চাইতে অবৈধপথেই বেশি গরু আসছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেট, সিলেটের কমিশনার শফিকুল ইসলাম। করিডোরের বাইরে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবেই বেশি গরু আসছে। কিন্তু সীমান্ত দেখভালের দায়িত্ব তো আমাদের নয়। তাই আমরা এগুলো ঠেকাতে পারছি না।
করিডোরের বাইরে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু প্রবেশের কথা স্বীকার করেছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

বিশ্বজিৎ পালও। এব্যাপারে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিছনাকান্দিসহ কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে গরু আসছে। এগুলো বন্ধে আমি অনেক চেষ্টা করেছি। বিজিবিকেও বলেছি। তারর্পও থামছে না গরু প্রবেশ

এব্যাপারে বিজিবি ৪৮ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মহসেনুল হক কবির জানান, সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি রয়েছে। অবৈধভাবে কোনো গরু নিয়ে আসলে বিজিবি তা আটক করে নিকটবর্তী রাজস্ব কার্যালয়ে হস্তান্তর করে।

অপরদিকে, নগরীতে বৈধ হাট রয়েছে ১২টি হল্ওে এর বাইরে নগরী ও নগরীর আশপাশে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অবৈধ পশুর হাট। নগরীর লালটিলা, কয়েদির মাঠ, আম্বরখানা (আবাসন হাউজিং), টিলাগড়, শাহী ঈদগাহ (দলদলি চা বাগান), উপশহর, চৌকিদেখি, আখালিয়া, মেন্দিবাগ (জালালাবাদ গ্যাস অফিসের পেছনে), তেররতন, দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুল, কদমতলী (ফল মার্কেটের সামনে), লাক্কাতুরা, মাদিনা মার্কেট, পাঠানটুলা, হাউজিং এস্টেট (দর্শন দেউড়ি), কুমারগাঁও, শাহী ঈদগাহ, রিকাবীবাজার এলাকায় অবৈধভাবে পশুর হাট বসানো হয়েছে।
গত শনিবার সন্ধ্যায় রিকাবীবাজারের অবৈধ পশুর হাটে পুলিশের সাথে ছাত্রলীগের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। আর বিকেলে দলদলি চা বাগানের অবৈধ হাট উ”েছদ করে সদর উপজেলা প্রশাসন। তবে একটি হাট উ”েছদ করলেও বাকি অবৈধ পশুর হাট উ”েছদে নেই প্রশাসনের কোনো তৎপরতা।
জানা যায়, বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা পশুর হাটের নেতৃত্বে রয়েছে সরকার দলীয় প্রভাবশালী কিছু নেতা। টিলাগড় পয়েন্টে বিশাল সামিয়ানা টানিয়ে বাঁশ বেঁধে তৈরি করা পশুর হাট।
অন্যদিকে নগরীর প্রবেশ মুখ কুমারগাঁও তেমুখী এলাকায় গড়ে তোলা অবৈধ অস্থায়ী পশুর হাটের নেতৃত্বে রয়েছেন সরকারদলীয় স্থানী কিছু নেতা।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, বৈধ পশুর হাট ছাড়া রাস্তায় গর“র হাট বসানো যাবে না। এমন নির্দেশ ঢাকা থেকে পাওয়ার পর বিষয়টি পুলিশ কমিশনারকে জানানো হয়েছে। এখন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন।
তবে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুহম্মদ আব্দুল ওয়াহাব জানান, নগরীর কাজিরবাজারসহ ১১টি হাট বসানোর অনুমতি দেয়া হয়েছ। এর বাইরে কোথাও হাট বসতে দেয়া হবে না।
কাজির বাজার পশুর হাটের ম্যানেজার সাহাদাত হোসেন লুলন অভিযোগ করে বলেন, দেশের বিভিন্ন ¯’ান থেকে ট্রাকে করে সিলেটে গর“ নিয়ে আসেন বেপারীরা। গর“বাহী ট্রাক বিভিন্ন সড়ক দিয়ে প্রবেশ করার পরপরই মোটরসাইকেল দিয়ে ট্রাককে ঘিরে ধরে অথবা বিভিন্ন ক্যাডার বাহিনী দিয়ে জোরপূর্বক হুমকি-ধামকি দিয়ে অবৈধ বাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে করে বেপারীতের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।