মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

চলে গেলেন জ্ঞান সাগর গীতিকার রনধীর সরকার



বিপ্লব রায়, সুনামগঞ্জ থেকে:: প্রায় শত বছরের শেষ প্রান্তে এসে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘ এক মাস। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানলেন ‘অপরাজেয় বাংলার হাওড়পাড়ের অবহেলীত গীতিকার রনধীর সরকার।

তাঁর সৃষ্টি তাকে অমরত্ব দান করেছে। পঁচানব্বই বছর বয়সে নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে হাওড়পাড়ের ধামাইল, পৌরাণিক যাত্রার রূপকার হিসেবে স্থান করে নিলেন তাঁর সংস্কৃতির মাঝে।

গত মঙ্গলবার বিকেলে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তিনি। পরে সনাতন ধর্মমতে মহাশ্বাশান ঘাটে উনার দেহের সৎকাজ করা হয়। মৃত্যুকালে উনার বয়স ছিল ৯৫ বছর। চার ছেলে ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিলেন এই গীতিকার।

হাওড়পাড়ের প্রতিটি প্রান্তে প্রান্তে পৌরাণিক যাত্রপালার স্বনামধন্য গীতিকার হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। গানের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে শতশত শিষ্য।  এই সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে হাওড়পাড়ের মানুষের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন তিনি।

তিনি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা জেলার সতালগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৭১এর আন্দোলনের পরে পরিবারসহ চলে আসেন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আনন্দপুর গ্রামে। সেখান থেকেই তিনি গড়ে তোলেন যাত্রাপালার একটি দল। এই দলটি ধর্মীয় নাটকের মাধ্যমে ওস্তাদ রণধীর সরকারের পরিচিতি ছড়িয়ে দেন হাওড়পাড়ের আনাচে কানাচে।

তবে এই গীতিকার লেখাপড়ায় প্রাথমিকের গন্ডি পেরুতে পারেনি। শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও জ্ঞান ও মেধা দিয়ে তিনি জয় করে নিলেন সংস্কৃতি জীবন। অসংখ্য ধর্মীয় গান, পৌরাণিক যাত্রাপালা, বাউল, মুর্শীদি ও ধামাইলগানে তিনি জ্ঞান সাগর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন হাওড় এলাকায়। মৃত্যুর প্রায় ৬ মাস আগে এই জ্ঞান সাগরের সাথে এপ্রতিবেদকের সরজমিনে সাক্ষাত হয়। সেই সময় তিনি জানান

দারিদ্র্যেও মধ্যেই কঠোর পরিশ্রমের করে বেড়ে উঠেছেন তিনি। শৈশব থেকেই পৌরাণিক যাত্রাপালা করা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সঙ্গীতের প্রতি তিনি এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে তা ছেড়ে কোনো কাজে রাজি মনোযোগী ছিলেন না তিনি। ফলে কাটেনি তাঁর দারিদ্র্য এবং বাধ্য হয়ে নিয়োজিত ছিলেন কৃষিশ্রমে।

জীবন কেটেছে সাদাসিধেভাবে। তবে কোনও কিছুই তাঁর সঙ্গীতপ্রেম ঠেকাতে পারেনি। হঠ্যাৎ কথার মধ্যে তিনি গেয়ে উঠলেন, শোন শোন প্রাণ সখি কেমনে যৌবনও রাখি, বল সখি করি কি উপায়? এই  গানটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী সুরবালা সরকার ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী। তার সহযোগীতার মধ্য দিয়েই আমি এতটুকু জায়গায় পৌঁছেছি। তিনি আরো বলেন, আমার স্ত্রীর আর আমি প্রায় সময়ই এই গানটি সুর তুলতাম। এই গানটি দুজনের প্রিয় ছিল।

তবে দুঃখের বিষয় প্রাণের সুরবালা অনেক আগেই উনাকে ছেড়ে চির বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। এছাড়াও এই জ্ঞান সাগরের রয়েছে, বল আমি কি করি উপায়, না ভজে গোবিন্দ, বৃথা জনম যায়। এই গানটি হাওড়পাড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। শধু তাই নয় তিনি আরো লিখেছেন, ভাবরে মন শ্রীকৃষ্ণ ধন ভক্তি ভরে, সেরে বিষয়বাসনা মনস্কামনা, সব শ্রদ্ধাঞ্জলী দাও না তারে।

এই সব গানগুলোর মধ্যে দিয়ে জ্ঞান সাগর রণধীর সরকার সারাটি জীবন কাটিয়ে গেলেন। হাওড়পাড়ের এই গীতিকারকে দেয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মাণনা। উনার বড় ছেলে রনজিত সরকারের সাথে কথা হয় এপ্রতিবেদকের। এসময় তিনি জানান, আমার বাবা সারাজীবন অসহায় নীপিড়িত মানুষের দুঃখ দুর্দশার জন্য গান গেয়ে গেছেন। উনার গানের ঐতিহ্যকে আমরা ধরে রাখব। তবে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তিনি দাবী জানান, জ্ঞান সাগরের নামে একটি স্মৃতিচারণ করার জন্য।