বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

হযরত শাহ্‌ জালাল ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহির সংক্ষিপ্ত জীবনী



বাংলাদেশ আসাম তথা বৃহত্তর বঙ্গ ইসলামের আলোকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে যাঁর নাম সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং

এদেশের সূফি, দরবেশ, আউলিয়াগণের মাঝে যাঁর প্রভাব ও মর্যাদা সবচেয়ে বেশী লক্ষ্যকরা যায় তিনি সুলতানুল বাংলা , হযরত আল্লামা শাহ্‌জালাল মুজার্‌রদ ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি। এতদঞ্চল ধর্ম-বর্ণ,শ্রেণীনির্বিশেষে জন সাধারণের মাঝে তাঁর প্রতি ভালবাসা ও নামের মাহাত্ম ব্যাপক ও অতুলনীয়।

নামঃ হযরত শাহ্‌জালাল মুজার্‌রদ ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পূর্ণ নাম জালালুদ্দীন

জালালুল্লাহ্‌ রহমতুল্লাহি আলাইহি। আপামর জনসাধারণের মাঝে প্রচলিত নাম হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি।

ঐতিহাসিক ও জীবনীকারগণের তথ্যগত বিচ্যুতি ও মতভেদের কারনে হযরত

শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি ও শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের জীবনেতিহাস নিয়ে

দ্বন্ধ সৃষ্টি হলেও উপরোক্ত বিষয়ের আলোকে আমরা বলতে পারি যে হযরত শাহ্‌

জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনিই ইবনে বতুতা বর্ণিত জালালুদ্দীন তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি যা সমসাময়িক

এবং পরবর্তি নির্ভর যোগ্য ঐতিহাসিক সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বহুমুখি গুণাবলি ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কারনে বাংলার মুসলিম সমাজে বহু লকব বা গুণবাচক উপাধি দ্বারা বিভূষিত। বিভিন্ন শিলালিপি, ঐতিহাসিক ও মনীষীগণের বর্ণনা ও গবেষকগণের রচনাবলীতে সাধারণত নিম্নলিখিত লকবগুলি পাওয়া যায়ঃ শেখ,শায়খুল মাশায়েখ, কুতুব, মুজার্‌রদ, মখদুম, সুলতানুল বাংলা, আরিফান বুয়দ, কুতুব বুয়দ, মাওলানা, জালালুদ্দীন,

তাবরিজী, ইয়েমেনী, কুন্যাভী,তাইজী, সিরাজী, প্রাচ্য-সূর্য, ইত্যাদি।

উনার কুনিয়াত হল কোরাইশী।

পিতার নামঃ হযরত শাহ্‌জালাল ইয়েমনী রহমতুল্লাহি আলাইহি এঁর পিতার নাম হযরত শেখ মুহাম্মদ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনি একজন কোরাইশ বংশীয় স্বনামধন্য খ্যাতিমান

দরবেশ ছিলেন। তিনি প্রখ্যাত দরবেশ হযরত আবু সাঈদ তাবরিজী উনার খলিফা ছিলেন। সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী আজমীরি রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মত বুজুর্গ ব্যক্তি হযরত আবু সাঈদ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফয়েজ হাসিল করেন। সুতরাং হযরত আবু সাঈদ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিলাফত পাওয়া যে কোন লোকের জন্য সহজ বিষয় ছিল না।

সম্ভবত এ কারণেই শেখ মুহাম্মদ কোরাইশী রহমতুল্লাহি আলাইহি জন্মগতভাবে ইয়েমেনী হলেও সূফী ধারা মোতাবেক নামের শেষে তাবরিজী উপাধি ধারণ করায় নাম হয়েছে শেখ মুহাম্মদ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি যা বিভিন্ন শিলালিপি ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। শায়খ শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি এঁর বিদুষী মাতা ছিলেন সাইয়্যেদ বংশীয় ।

হযরত শেখ মুহাম্মদ কোরাইশী রহমতুল্লাহি আলাইহি এঁর পিতার নাম ছিল হযরত শেখ ইব্রাহিম কোরাইশী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

জন্ম তারিখ ও স্থানঃ ঐতিহাসিক ইবনে বতুতার বর্ণনা অনুসারে গবেষকগণের মতে হযরত শাহ্‌জালাল ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি ৫৯৬ হিজরী সনে বিলাদত লাভ করেন এবং ৭৪৬ হিজরী সনে ১৯শে জিলক্বদ বিছাল লাভ করেন। তিনি জমিনে সুদীর্ঘ ১৫০ বছর অবস্থান করেন এবং হায়াত মুবারকের শেষ পর্যন্ত হিদায়তের কাজে আনজাম দেন। উনার জন্মস্থান হল ইয়েমেনের তাইজ নগরীর কুন্যা নামক স্থানে। এখানে একটি

বিষয় উল্লেখ্য যে, কোন কোন লেখক হযরত শাহ্‌জালাল ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে আলাদা দু জন দরবেশ বর্ণনা করেন এবং জালালুদ্দীন তাবরিজীর জন্ম ও ইন্তেকালের তারিখ এবং পান্ডুয়াতে উনার মাযার শরীফ বলে উল্লেখ করেছেন । কিন্তু যে সমস্ত গ্রন্থের সূত্রে তা বর্ণিত হয়েছে তার মূল গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়নিএবং পান্ডুয়াতে উনার মাযার শরীফ নেই বলে সেখানকার খাদেমগণই বর্ণনা করেন। সেখানে উনার জওয়াব সমাধি বা স্মৃতি সৌধ বিদ্যমান।

শিক্ষাঃ হযরত শাহ্‌জালাল ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতা-মাতা শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর লালন-পালন ও শিক্ষা-দীক্ষার ভার গ্রহণ করেন উনার বুযুর্গ মামা সৈয়দ

আহ্‌মদ কবির সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনি সোহ্‌রাওয়ার্দীয়া ত্বরিকার একজন প্রখ্যাত সুফি দরবেশ এবং মক্কার বিশিষ্ট আলেম ছিলেম। হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শিক্ষা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে তাঁর মুরীদ কর্তৃক মাওলানা সম্বোধন থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে তিনি বিদ্যা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন আলেম ছিলেন।(মুলত: ইলমে তাসাউফের উচ্চ মাকাম হাসিল কারি গন ইলেম লাদুনি প্রাপ্ত হন অর্থ্যাৎ আল্লাহ্ পাক উনার প্রদত্ত ইলিম হাসিল করেন। ইতিহাসে আমরা এরকম আরো নজির দেখতে পাই যেমন ইমান আবুল হাসান খারকানি রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কোন দুনিয়াবী শিক্ষক গনের কাছ থেকে ইলিম বা তালিম গ্রহন না করেও তিনি ইলিমে শরিয়ত ও ইলমে তাসাউফ উনার গভির ইলিম রাখতেন) এছাড়াও হযরত শায়খ্‌ আবু সাঈদ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত বাহাউদ্দিন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্‌তী রহমতুল্লাহি আলাইহি এঁর মত জগত খ্যাত তরিকতের ইমাম ও বুযুর্গ দরবেশ সাধকগণের শিষ্যত্ব ও সান্নিধ্যও হযরত কুতুব উদ্দীন বখ্‌তিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ফরিদ উদ্দীন শকরগঞ্জ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়ারহমতুল্লাহি আলাইহি, হাদীস বিশারদ হযরত

বাহাউদ্দীন যাকরিয়া মুলতানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত শেখ ফরিদ উদ্দীন আত্তার রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত

বোরহানুদ্দীন সাগরজী রহমতুল্লাহি আলাইহি এঁর মত যুগের দিকপাল মহান মনীষীগণের সাথে গভীর বন্ধুত্ব থাকাটাও প্রমাণ করে যে, হযরত শাহ্‌জালাল ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি আধ্যাত্মি অতিন্দ্রীয় জ্ঞান তো বটেই ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য জ্ঞান রাজ্যের বিভিন্ন শাখায় ও বুতপত্তি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

হযরতের শায়খ/পীরগনঃ হযরত শাহ্‌জালাল ইয়েমেনী রহমতুল্লাহি আলাইহি শৈশব থেকে প্রায় ২২/২৩/৩০

বছর পর্যন্ত মামা হযরত সৈয়দ আহ্‌মদ কবির সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহিএঁর নিবিড়

তত্ত্বাবধানে শরীয়ত ও তাসাউফে (মারফতের) গভির জ্ঞান লাভ করেন। এরপর তিনি আবু সাঈদ তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট বায়াত গ্রহন করেন এবং উনার সোহ্‌বতে প্রায় দুই বছর কাটান। এরপর হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি সোহ্‌রাওয়ার্দী ত্বরিকার ইমাম হযরত শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট মুরীদ হন। এ সূত্রে হযরত শেখ সাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি হন উনার পীর ভাই বাসতীর্থ। শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রায় ৭ বৎসর শিহাবুদ্দীন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সোহবতে কাটান। উনার বিসাল শরীফের পর হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সুযোগ্য পুত্র শায়খ হযরত বাহাউদ্দিন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট মুরীদ হন এবং দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর তাঁর খেদমতে

কাটান।

বুজুর্গগণের সাক্ষাতঃ ফারসী মালফুযাত ফাওয়ায়েদুল ফুয়াদ অনুসারে হযরত শায়খ্‌ জালালুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত শায়খ্‌ শিহাবুদ্দীন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি এঁর মুরীদ থাকাকালে বাগদাদে তিনি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্‌তী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে সাক্ষাত করেন। তারিখে ফিরিশতার বর্ণনা অনুসারে তিনি নিশাপুরে হযরত শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথেও সাক্ষাত করেন।

সফরঃ হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কর্মময় জীবনে বহু দেশ সফর করেন তিনি ইয়েমেন মিশর, তুরস্ক, ততকালীন জাজিরাতুল আরব, ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের ব্যাপক অঞ্চল সফর করেন। সে সময়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রগুলোর প্রায় সব জায়গা যেমন মক্কা, মদীনা, বাগদাদ, নিশাপুর, গারজু, সমরকন্দ, বোখারা, মুলতান, বদায়ুন, দিল্লী, আজমীর ইত্যাদি অঞ্চলগুলো সফর করেন।

পাক-ভারত উপমহাদেশে শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি একাধিকবার ভ্রমণ করেন। ঐতিহাসিক মিনহাজের ও তবকাতে নাসিরীর বর্ণনানুসারে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি মুলতানের সুলতান নাসিরুদ্দীন কুবাচা এবং দিল্লীর সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশের শাসনামলে বঙ্গ অঞ্চল সফর করেন। তখন তিনি হযরত শিহাবুদ্দীন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুরীদ ছিলেন। ধর্মপরায়ন সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ হযরত কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি এঁর মুরীদ ছিলেন। যখন সুলতান জানতে পারলেন যে শায়খ জালালুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি দিল্লীতে আগমন করছেন তখন সুলতান সভাসদগণ এবং দিল্লীর আপামর জনগণ হযরতকে সংবর্ধনার জন্য নগরের বাহিরে এগিয়ে গেলেন।শায়খ

জালালুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি সেখানে পৌঁছলে তাঁর সম্মানে সুলতান ঘোড়ার পৃষ্ঠ থেকে নেমে উনাকে স্বাগত জানালেন এবং স্ব-সম্মানে শায়খ জালালুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে রাজধানীতে নিয়ে আসেন। শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি এরূপ অভূতপূর্ব সংবর্ধনা পাওয়ায় দিল্লীর শায়খুল ইসলাম নজমুদ্দীন সুগরা ঈর্ষান্বিতহয়ে পড়েন। সুলতান ইলতুতমিশ হযরত ও সংগীদের থাকার জন্য শাহী ব্যবস্থা করতে চাইলে নজমুদ্দীন সুগরা শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে পরীক্ষার নাম করে বায়তুল জ্বীন নামে পরিত্যক্ত প্রাসাদে থাকার প্রস্তাব করে।

বায়তুল জ্বীন, জ্বীনদের দখলাধীন আবাসস্থল হওয়াতে সেখানে কোন লোকজন থাকতে পারতো না এবং দিনের বেলায়ও সেখানে যেতে সাহস করতো না। প্রভাবশালী সুগরার প্রস্তাবে সুলতান যখন ইতস্ততঃ করছিলেন তখন শায়খ জালাল নিজেই বায়তুল জ্বীনের চাবি চেয়ে নেন। তিনি তাঁর মুরীদ দরবেশ আবু তোরাবের (তাঁর মাজার সিলেট শহরে অবস্থিত) হাতে চাবি দিয়ে বললেন, তালা খুলে ঘরেপ্রবেশ করে উচ্চস্বরে জ্বীনদেরকে বলবে, শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি এখানে এসেছেন তোমরা অনেক দিন পর্যন্ত এখানে আছ, এখন তিনি অবস্থান করবেন, তোমরা অন্য কোথাও চলে যাও। একথা বলে আমার এই হামায়েল শরীফ (ক্ষুদ্র কোরআন শরীফ) সে ঘরে

ঝুলিয়ে দিও। কথামত কাজ হল। জ্বীনরা প্রাসাদ ছেড়ে গেল এবং শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি নির্বিঘ্নে সেখানে অবস্থান করলেন। ফওয়ায়েদুস সালেকীন গ্রন্থ অনুসারে হযরত খাজা

কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বর্ণনায় এ সময়ের আরেকটি ঘটনায় নজমুদ্দীন সুগরার ঈর্ষাকাতরতা ও হযরত শাহ্‌জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বুযুর্গী সম্পর্কে জানা যায়। তিনি বলেন- শায়খুল ইসলাম (নজমুদ্দীন সুগরা) জালালুদ্দীন তাবরিজী সম্পর্কে অপবাদ রটনা করলেন। সুলতানের নিকট অভিযোগ পেশ করা হল। শায়খ্‌ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিচার চাইলেন এবং একজন বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব করলেন। নজমুদ্দীন সুগরা উনি প্রস্তাবে সম্মত হয়ে বললেন, “শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনি যাকে বিচারক ঠিক করবেন তার প্রতি আমারও আস্থা থাকবে। শায়খ জালাল বললেন, আমি শায়খ বাহাউদ্দীন যাকারিয়া উনাকে বিচারক মানলাম। বাহাউদ্দীন যাকারিয়া মুলতানী তখন দিল্লীতে ছিলেন না। নজমুদ্দীন সুগরা অন্য কাউকে বিচারক ঠিক করার জন্য বললেন এজন্য যে শায়খ যাকারিয়া মুলতানী কবে দিল্লী আসেন ঠিক নেই। শায়খ জালাল

বললেন, আগামীকালই তিনি এখানে এসে উপস্থিত হবেন। এ কথায় সবাই অবাক হয়ে গেলেন। পরের দিন দরবার শুরুর পর সবাই বিচারকের অপেক্ষায়। হঠাত শোনা গেল বাহাউদ্দীন যাকারিয়া মুলতানী রহমতুল্লাহি আলাইহি আসছেন। রাজ দরবারে উপস্থিত হবার পর তিনি প্রথমে হযরত জালালুদ্দীন তাবরিজীর জুতা মোবারক সামনে পেয়ে হাতে নিলেন, চুমু খেলেন ও চোখে লাগালেন। এতে সকলের নিকট শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বুযুর্গী প্রকাশ পেল। অপরাধীরা যার যার অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইলেন শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রত্যেককে ক্ষমা করে দিলেন। অন্য আরেক বর্ণনায় জানা যায় এ ঘটনার পর সুলতান ইলতুৎমিশ নজমুদ্দীন সুগরাকে শায়খুল ইসলাম পদ হতে অব্যাহতি দেন। এ ঘটনার

পর শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি ততকালীন ইসলামি ক অন্যতম ভূমি বদায়ুন চলে যান। এ সময় তিনি দিল্লীতে অল্প কিছুকাল অবস্থান করে ছিলেন। বদায়ুন মতান্তরে মুলতান অবস্থানকালে শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলেন,“এখানে কোন ওলী-দরবেশ আছেন কি? লোকজন বলল, এখানে কাজী বাচ্চা দিওয়ানা নামক একজন দরবেশ আছেন। তিনি তাঁর সাথে সাক্ষাত করলেন এবং একটি আনার/বেদানা দিলেন। এ বাচ্চা দিওয়ানা হলেন হযরত শায়খ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর রহমতুল্লাহি আলাইহি। এটা ছিল উনার উপাধি যদিও তিনি বয়সে বাচ্চা ছিলেন না। আখবারুল আখিয়ার কিতাবের বর্ণনায় আরো জানা যায় যে, সেদিন শায়খ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর রহমতুল্লাহি আলাইহি রোযা রেখে ছিলেন। এ কারণে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে আনারটি ভাগ করে দেন শুধু

নিজের জন্য একটি দানা রেখে দেন। ইফতারের সময় ঐ দানাটি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে অভূতপূর্ব এক আধ্যাত্নিক জয্‌বা দেখা গেল। তিনি ভাবলেন আহা! সবটা আনারই যদি খেতে পারতাম তাহলে কতইনা সৌভাগ্য হত। পরবর্তীকালে স্বীয় মুরশীদ কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলে তিনি বললেন, আফসোসের কি আছে? প্রকৃত পক্ষে ফলটির একটি দানাই যথার্থ ছিল যা তুমি খেয়েছে। শায়খ ফরিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বর্ণনায় বদায়ুনের আরেকটি ঘটনা জানা যায়, শায়খ ফরিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমরা একটি ঘরে বসেছিলাম, এক দই বিক্রেতা সেই পথ দিয়ে অতিক্রম করছিল। প্রকৃত পক্ষে সে ছিল একজন চোর। হযরত শায়খ তাবরিজীর রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রতি তার দৃষ্টি পড়তেই তার ভিতরটা একেবারে পরিবর্তিত হয়ে গেল। সে ইসলাম গ্রহন করলে তার নাম রাখা হয় আলী। এই শায়খ আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শিক্ষার আঁচলে বাধা পড়ে আত্মজ্ঞানের জগতে এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেন যে

বদায়ুনের লোকদের শ্রদ্ধার কেন্দ্রে পরিণত হয়ে যান। বদায়ুনে খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শিক্ষা সমাপ্তির পর দস্তারবন্দির(পাগড়ী পরানো) সময় উনার ওস্তাদ

হযরত আলাউদ্দিন উসুলী এবং শায়খ আলী বা মওলা আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা মাথায় পাগড়ী বেধে দেন। সমসাময়িক ইসরারুল আউলীয়া ও আখতার দেহলভীর তাযকিরায়ে আউলিয়ায়ে হিন্দ অনুসারে জানা যায়, শায়খ জালালুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি কিছুদিন বদায়ুনে অবস্থানের পর আল্লাহ্‌র হুকুমে বঙ্গাভিমুখে রওয়ানা হন। শায়খ আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গে আসতে চাইলে তিনি শায়খ আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে বললেন, আল্লাহ্‌র হুকুমে তোমাকে এই শহরের কুতুব নিযুক্ত করলাম। এ কথা শুনে শায়খ আলী থাকতে রাজি হন। মাওলানা উসুলীও প্রারম্ভিককালে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটি বাড়ির সদর দরজায় এসে পৌঁছান। এখানে শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজী রহমতুল্লাহি আলাইহি শায়খ সোহ্‌রাওয়ার্দীর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে অবস্থান করছিলেন। শায়খ তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দৃষ্টি তার প্রতি নিবদ্ধ হয়। আর উনার অন্তনির্হিত শক্তি ও যোগ্যতা অনুভব করে গৃহমধ্যে আহবান করে তিনি তাকে উনার

কোর্তাটি প্রদান করেন ও নিরুদ্দেশ্য জীবনের সদুদ্দেশ্য জানিয়ে দেন । মাওলানা উসুলী বিদ্যার্জনের প্রতি প্রবৃত্ত হন এবং কিছুদিনের মধ্যে কঠোর পরিশ্রমের পর তিনি বিদ্যান রূপে পরিগণিত হন। বদায়ুন থেকে হযরত শায়খ জালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি মুসলিম বাংলার প্রথম রাজধানী লখনৌতি বা লক্ষণাবতী আগমন করেন। তখন বাংলার গর্ভণর ছিলেন

ইলতুৎমিশের পুত্র নাসিরুদ্দীন মাহমুদ।