শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সিলেট সিটি নির্বাচনের দলীয় মনোনয়নে আ’লীগ ৬, বিএনপি ৬



মো. নাঈমুল ইসলাম:: সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের উত্তাপ এখন সর্বত্র। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই প্রচার-প্রচারণায় মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। এই প্রথম দলীয় প্রতিকে সিসিক নির্বাচন হওয়ায় সবার দৃষ্টি আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রার্থীর দিকে। কে পাচ্ছেন এই বড় দুই দলের সমর্থন তা নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। উভয় দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ চলছে। মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীরা শীর্ষ পর্যায়ে লবিং করছেন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় দলগুলোও প্রার্থী বাছাইয়ে তোড়জোড় শুরু করেছে। দলীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সিলেট সিটিতেই মেয়র ও কাউন্সিলর পদে একাধিক প্রার্থী মাঠে আছেন। মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী সংখ্যা কিছুটা কম হলেও কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের ছড়াছড়ি। ফলে সব জায়গায় একক প্রার্থী নিশ্চিত করা দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। এদিকে সরকারের শেষ সময়ে সিটিতে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণে মরিয়া আওয়ামী লীগ। সিলেট সিটিতে যেমন জয় চায় আওয়ামী লীগ তেমনি জয় চায় বিএনপিও।

এজন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করতে এখনই প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত দলের হাইকমান্ড। তবে দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সিটি নির্বাচন নিয়ে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্ধ আছে। গতকাল বুধবার (২০ জুন) নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে বিএনপির মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন সিলেট সিটি বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, সহ-সভাপতি ও প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং যুবদল নেতা ছালাহউদ্দিন রিমন।

অপরদিকে দলের শীর্ষ নেতারা চেয়ে আছেন গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ফলাফলের দিকে। সেখানে অনিয়ম হলে সিলেট সিটি নির্বাচন থেকে সরে আসতে পারে দলটি এমন গুঞ্জন শুনাযাচ্ছে। সিটি নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল বুধবার চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে আগামী ২৭ জুন পরবর্তী জোটের শীর্ষ বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে বৈঠক সূত্র নিশ্চিত করে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুসারে ৩০ জুলাই সিলেট সিটিতে হবে ভোট গ্রহণ। ১৩ জুন থেকে মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু হয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২৮ জুন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ১ ও ২ জুলাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষ তারিখ ৯ জুলাই। ১০ জুলাই সিটি নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর শুরু হবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। সিটি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে উভয় দল। আওয়ামী লীগ ১৮ জুন থেকে দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি শুর করেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে এই ফরম বিক্রি হবে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। কাল দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ৫ নেতার নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়। গত সোমবার (১৮ জুন) মহানগর আওয়ামী লীগের এক বর্ধিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠক চলাকালীন সময়ে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য মেয়র পদে নিজেদের প্রার্থিতার ঘোষণা দেন ৫ নেতা। এ পাঁচ নেতারা হলেন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল আনোয়ার আলাওর, অধ্যাপক জাকির হোসেন এবং শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ।

সভার প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে বলেন, যেহেতু মেয়র পদে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দল থেকে মনোনয়ন চাইছেন, আমার অনুরোধ থাকবে বাকিরা তাদেরকে সমর্থন দিয়ে দলের মনোনয়ন চাওয়া থেকে সরে দাঁড়াবেন। মিসবাহ সিরাজের এই কথার সাথে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন সহমত প্রকাশ করলেও বাকিরা সেটি না মানায় সভায় মনোনয়ন প্রত্যাশী ৫ নেতার নামই শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদের পরিচালনায় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ।
তবে গতকাল বুধবার আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল আনোয়ার আলাওর, অধ্যাপক জাকির হোসেন ও ক্রীড়া সংগঠক মাহিউদ্দিন সেলিম। আজ বৃহস্পতিবার মনোনয়ন সংগ্রহ করবেন মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ।

দলীয় কোন্দল নিরসনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতারা কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী নির্ধারণে নাম আহ্বান করেছেন। জয় নিশ্চিত করতে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ নিরসনে কাজও করছেন তারা। এছাড়া কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিরোধ ও জোট শরিকদের পাওয়া না পাওয়ার কষ্ট প্রশমনে ব্যস্ত সময় পার করছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা।
সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, একক প্রার্থী হিসেবে আমি মাঠে রয়েছি এবং থাকব। যারাই দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন তারাও দলের নির্দেশে আমার সঙ্গেই থাকবেন। তৃণমূল নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। ইাতমধ্যে ভোটারদের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি।

সিলেট সিটিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জামায়াত ইসলামীকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দলটি। জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর শাখার আমীর অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে সভা সমাবেশ সহ বিভিন্ন ভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সিলেট সিটিতে দলীয় মনোনয়ন কে পাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের পর সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দলীয় প্রার্থী চুড়ান্ত হবে। তবে বিগত নির্বাচনের প্রার্থীরা মনোনয়ন তালিকায় অগ্রাধিকার পাবেন।
এদিকে গত মঙ্গলবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আগ্রহীরা বুধবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সকাল ১০টা থেকে ৪টা পর্যন্ত দলীয় মনোনয়নপত্র উত্তোলন করতে পারবেন। এবং আজ বৃহস্পতিবার তা জমা দেওয়ার জন্য বলেন, তিনি আরও বলেন, আগ্রহী প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম কিনতে হবে ১০ হাজার টাকায়, জমা দেয়ার সময়ে জামানত হিসেবে ২৫ হাজার টাকা দিতে হবে। প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার কবে হবে তা পরে জানানো হবে বলেও জানান রিজভী।

২০১৩ সালের ১৫ জুন সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে সিলেট সিটিতে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বিজয়ী হন।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী ও দু’বারের নির্বাচিত মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়ে চমক দেখান বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তবে বর্তমান মেয়র ছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। এছাড়াও মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী ও টানা তিন বারের সিটি কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদীও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী।

বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মানুষের রায় নিয়ে গত নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ২ বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলাম। বাকি সময়ে প্রতিশ্রুত উন্নয়নকাজ শেষ করার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি দলীয় কাজেও সময় দিয়েছি। দল নিশ্চয়ই এসব বিবেচনা করে মনোনয়ন দেবে।
সিলেটে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ১৮৯ জন :
সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীরা। তবে মেয়র পদের চেয়ে এ মুহূর্তে সিটি নেতারা বেশি ব্যস্ত কাউন্সিলর মনোনয়ন নিয়ে।
গতকাল বুধবার পর্যন্ত মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ১৮৯ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৪ জন, ২৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৩৮ জন ও ৯টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৪৭ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।