রবিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সিলেটের শাহী ঈদগাহ যেন মোঘল আর আধুনিক সময়ের যোগসূত্র



এম. শামীম আহমেদ :: সিলেটের শাহী ঈদগাহ। কয়েক শত বছরের ঐতিহ্য। উপমহাদেশের প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান ক্ষেত্র ছিল শাহী ঈদগাহ। দেশের প্রাচীনতম ঈদগাহ হিসেবেও পরিচিত এটি। মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহায় প্রতি বছর লাখো লাখো মানুষের সমাগম হয় ঈদগাহ ময়দানে। ঈদের নামাজ আদায় করেন তারা। পাহাড়ের টিলায় সবুজ আচ্ছাদিত পরিবেশে এ ঈদগাহ কেবল শুধুই ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারকই নয়, নগর জীবনে প্রশান্তির কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে।

সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ে জানা যায়, সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছে সিলেটের প্রাচীন ঐতিহ্যের এ নিদর্শন। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে মনোমুগ্ধকর কারুকার্যময় এ ঈদগাহটি মোগল ফৌজদার ফরহাদ খাঁ নির্মাণ করেন। এখানে একসঙ্গে প্রায় দেড় লাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করতে পারেন।

জানা যায়, এখানেই হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে ইংরেজ বিরোধী প্রথম অভ্যুত্থান হয়েছে। ভারতের অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের মতো নেতারা এখানে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। অতীতে সিলেটের বড় বড় সমাবেশের স্থানও ছিল একমাত্র এটি।

পাহাড়, টিলা আর হাজারো বৃক্ষরাজির মধ্যে এর মনোমুগ্ধকর অবস্থান যে কারো নজর কাড়ে। ঈদগাহের উত্তরে শাহী ঈদগাহ মসজিদ, পাশে সুউচ্চ টিলার ওপর বন কর্মকর্তার বাংলো, দক্ষিণে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সিলেট উপ-কেন্দ্র, পূর্ব দিকে হযরত শাহজালাল (র.) এর অন্যতম সফরসঙ্গী শাহ মিরারজী (র.) এর মাজার এবং এর পাশের টিলার ওপর রয়েছে সিলেট আবহাওয়া অফিস। ঈদগাহের চারপাশ পাকা সড়কপথ আর সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ঈদগাহ ঘিরে রয়েছে দেশি-বিদেশি কয়েকশ’ প্রজাতির বৃক্ষারাজি। স্থানটি এখন নানা কারণে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়।

এ সম্পর্কে লেখক ও গবেষক এবং মদন মোহন কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ জানান, ১৭৮২ সালের মহররম মাসে ঈদগাহ ময়দানে প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। তখন সিলেটের কালেক্টর ছিলেন রবার্ট লিন্ডসে। সেখানে মহরম মাস উপলক্ষে ঈদগাহ ময়দানে তাজকিয়া মিছিল চলছিল। তবে রবার্ট লিন্ডসের কাছে খবর যায়, ঈদগাহ ময়দানে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা চলছে।

তিনি জানান, এ মিছিলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর তখনই শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। রবার্ট লিন্ডসের পিস্তলের গুলিতে শহীদ হন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী ও তার ভাই মাহদী নামে দুই ধর্মীয় নেতা। মূলত তারাই উপমহাদেশের ব্রিটিশ আন্দোলনের প্রথম শহীদ বলেও উল্লেখ করেন গবেষক ফতেহ ফাত্তাহ। শাহী ঈদগাহের পাশে নয়াসড়ক মাদ্রাসার ঠিক পূবর্দিকে এবং গীর্জার পশ্চিমপাশে তাদের দুই ভাইয়ের কবর রয়েছে।

ঐতিহাসিক কালপ্র্যবাহে সিলেট শহরের প্রাচীনত্ব এখন ৭০০ বছরের বেশি। সিলেটের আর্থ-সামাজিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দুতে শহর সিলেটের অবস্থান। আর এসবের অন্যতম সাক্ষী সিলেটের শাহী ঈদগাহ।

সরেজমিনে শাহী ঈদগাহ ঘুরে দেখা যায়, প্রাচীনতম স্থাপত্যশৈলীর এই নিদর্শন ঈদগাহের মূল ভূ-খণ্ডে ২২টি সিঁড়ি মাড়িয়ে উঠতে হয়। উচু টিলার ওপরই ১৫টি গম্বুজ সজ্জিত মূল ঈদগাহ। টিলার মূল ঈদগাহের সামনের দিকে ৮টি গুম্বুজ। নিচে বিস্তৃত বৃক্ষ ছায়ায় বিস্তৃত মাঠ এবং সীমানা প্রাচীরের চারদিকে রয়েছে-ছোট বড় ১০টি গেট। তবে ঈদগাহের সামনের দিকে রয়েছে মূল তিনটি গেট। এ মূল তিনটি গেইটে মুঘল আমলের স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। ২০০১ সালে বড় পরিসরে ৩টি গেটের নির্মাণ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজারীবাগ নীরু মঞ্জিলের বাসিন্দা জহির উদ্দিন তারু মিয়া। পরে ঐ বছরের ১৫ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এর উদ্বোধন করেন।

আর্কিটেক্ট গওহর-উজ-জামান লস্করের ডিজাইনে তিন ধাপে তৈরি মিনারটির উচ্চতা ২০০ ফুট এবং বেদি প্রায় ১৯৬০ বর্গফুট ভূমিজুড়ে অবস্থিত।

ঈদগাহের ভেতরের ফলক অনুযায়ী, ২০০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান পুকুরের চারদিকে ঘাট নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১০ সালের ২৯ অক্টোবর বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মহিত ঈদগাহে বিদ্যুতায়ন, সংস্কার ও চারদিকে ফুটপাত নির্মাণ করেন। সিলেট শাহী ঈদগাহ ময়দানের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাবেক ও বতর্মান দুই অর্থমন্ত্রীর অবদান থাকলেও নেই সিসিক কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি।

এছাড়া এর আকর্ষণ ঈদগাহের ভেতরের সামনের দিকে ওজু করার জন্য রয়েছে বিশাল পুকুর। পুকুরে স্থাপন করা আছে কৃত্রিম ফোয়ারা। তবে ফোয়ারাটি এখনা অযতœ-অবহেলায় অচল।

দীর্ঘদিন ধরে ঈদগাহের দেখাশোনা করছে ৪৫ সদস্যের একটি ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি। এর মোতোয়াল্লি স্থানীয় বিশিষ্ট মুরব্বী জহির বক্ত।

বর্তমানে সিলেটের প্রধান ঈদের জামাত শাহী ঈদগাহেই অনুষ্ঠিত হয়। আর সিলেটে আসা ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকরাও একবার ঘুরে যান নিরিবিলি পরিবেশের শাহী ঈদগাহ থেকে।