মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কমলগঞ্জে সরকারি পুকুরের পানি দলিত জনগোষ্ঠীকে ৫০ বছর ধরে ব্যবহার করতে দেয়নি দখলদার প্রতিপক্ষ



আসহাবুর ইসলাম শাওন, কমলগঞ্জ থেকে:: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার ইউনিয়নের রাজদিঘীরপার বাজার সংলগ্ন বিশাল রাজদিঘীর অর্ধেক সরকারি জলাশয় উদ্ধারে দখলদার বাহিনী বাঁধা প্রদান করছে।

দখলদার কর্তৃক দিঘীরপারে গড়ে উঠা স্থানীয় শব্দকর সম্প্রদায়কে ৫০ বছর ধরে জলাশয়ে গোসল ও পানি ব্যবহারের অধিকার হরণ ও নানাভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার বিকালে সরেজমিনে গেলে এ চিত্র পাওয়া যায়। এ ঘটনায় এলকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকা রয়েছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও পতনঊষার ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২, ৩ ও ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রিপন ইসলাম ময়নুল, আং কুদ্দুছ, এখলাছ মিয়া ও সায়েক আহমদ জানান, রাজদিঘীরপার বাজার ঘেষা ৪ একর ৪৪ শতাংশ জলাশয় নিয়ে নিয়ে বিশাল দিঘীর ৫০ শতাংশ ২ একর ২২ শতাংশ সরকারি ও অবশিষ্ট ২ একর ২২ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন। এই সুযোগে দিঘীর আংশিক মালিক আসিকুর রহমান আসুক ও তার উত্তরাধীকারী মনসুর আহমদ, মুমিনুর রহমান দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের অধিক সময় ধরে পুরো দিঘীর জলাশয় দখলে নিয়ে এককভাবে ভোগ করছেন।
তারা প্রতিবছর সরকারকে ১১ হাজার টাকা রাজস্ব দিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকায় সাব লিজ প্রদান করেন। এই দিঘীতে স্থানীয় শব্দকর সম্প্রদায়সহ অন্য কারো ব্যবহারে তারা বাঁধা প্রদান করেন। শনিবার (২জুন) বিকালে সরেজমিনে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুছ আখন্দ, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন, সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা আসাদ উল্ল্যাহ ও সাংবাদিকরা সরকারি অংশের উদ্ধার কার্যক্রম দেখতে গেলে দখলদার মনসুর আহমদ, মোমিনুর রহমানসহ তাদের অনুসারী লোকজন আক্রমনাত্মক কথাবার্তা বলে সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের উপর মারমুখী হয়ে উঠেন। সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল থেকে চলে আসার পর দখলদাররা সরকারি জলাশয়ে কর্মরত শ্রমিকদের জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে প্রায় শতাধিক বাঁশের খুঁটি উপড়ে ফেলে দেয়। খবর পেয়ে কমলগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে দখলদাররা পালিয়ে যায়। রাজদিঘীর পারের ২২টি শব্দকর ও ৩২ টি সাধারণ মুসলিম পরিবার এ ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছেন।

রাজদিঘীর পারের শব্দকর বস্তির অনিমা শব্দকর, রবীন্দ্র শব্দকর অভিযোগ করে বলেন, দিঘীর সরকারি জলাশয়ে আমরা গোসল করতে, কিংবা পানি ব্যবহার করতে চাইলে দখলদারের লোকজন ও তাদের কেয়ারটেকার মোতালিব মিয়া আমাদের মারধর করে তাড়িয়ে দেন। আমরা পানির সুবিধার কারণে দিঘীতে গোসল করতে পারি না। রাজেন্দ্র শব্দকর বলেন, দিঘীতে বরশি নিয়ে মাছ ধরতে গেলে মোতালিব মিয়া লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমার স্ত্রী লক্ষ্মী শব্দকরতে গুরুতর আহত করেন। পরে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর আমার স্ত্রী মারা যায়।

তবে অভিযোগ বিষয়ে মোতালিব মিয়া বলেন, তিনি দিঘীতে গোসল করতে কাউকে বাঁধা দেননি এবং নির্যাতন করেননি। একটি চক্র এ ধরণের মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করেছে। মনসুর আহমদ ও মোমিনুর রহমান বলেন, দিঘীর জলাশয় একত্রিত থাকার কারনে আমরা সরকারকে রাজস্ব প্রদান করে লিজ নিয়ে ভোগ করছি। আমরা সরকারি অংশ দখল করিনি। এই অভিযোগ মিথ্যা। তবে এ সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতে স্বত্ব মামলার জন্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নোটিশ দেয়া হয়েছে।

শব্দকর সমাজ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি লেখক-গবেষক ও উন্নয়ন চিন্তক আহমদ সিরাজ বলেন, ঐতিহ্যবাহী রাজদিঘীটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র দীর্ঘদিন ধরে বহন করে আসছে। এখানে একদিকে হিন্দুদের শ্মশান ও মন্দির, অন্যদিকে মুসলমানদের কবরস্থান ও মসজিদ রয়েছে। এছাড়া দিঘী সংলগ্ন একটি বাজার রয়েছে। এই দিঘীকে কেন্দ্র করে এখানে অসাম্প্রদায়িক মানুষের একটি মেলবন্ধন তৈরী হয়েছে। রাজদিঘীর পারে বসবাসকারী ৫৪টি পরিবারের গরীব হিন্দু-মুসলমানদের জন্য এই দিঘীটি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের আর্থ সমাজিক উন্নয়নে কাজে লাগানো প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

কমলগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, রাজদিঘীর পারে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে ১২ লক্ষ ৯০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়ে খোঁজ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে বিশাল দিঘীর জলাশয়ের সরকারি অংশ উদ্ধারে কার্যক্রম শুরু করি। তাতে দখলদাররা বিভিন্নভাবে বাঁধা প্রদানের চেষ্টা করেন। এই প্রকল্পের সুফল পাবে স্থানীয় শব্দকরসহ দিঘীর পারে বসবাসকারী ৫৪টি পরিবার।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, সরেজমিন রাজদিঘীর বিশাল জলাশয় দেখে ও জলাশয়ের অর্ধেক মালিকদের ডেকে সরকারি অংশ ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। তারা তাতে রাজি হওয়ায় দিঘীর সরকারি জলাশয় উদ্ধারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সার্ভে শেষ করে ইতিমধ্যে দিঘীর মাঝামাঝি বাঁশের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। এখন যদি জলাশয়ের সরকারি অংশ উদ্ধারে কেউ বাঁধা প্রদান করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।