মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা আব্দুল লতিফের ২০ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ



ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিনিধি:: মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ফেঞ্চুগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের প্রতিস্টাতা সাধারণ সম্পাদক, আমৃত্যু সভাপতি, সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের তিন মেয়াদে সহ সভাপতি, মুজিবনগর সরকারের ফেঞ্চুগঞ্জ থানার প্রশাসনিক কমিটির চেয়্যারম্যান, ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ ও ফেঞ্চুগঞ্জ ফাউন্ডেশনের প্রতিস্টাতা সদস্য, সর্বজন স্মরনীয় ও বরনীয় ব্যক্তিত্ব মো: আব্দুল লতিফ’র ২০ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ।

এ উপলক্ষে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগ আগামীকাল শনিবার বিকাল ০৪ টায় স্থানীয় প্রেসক্লাবে স্মরণসভা ও বাদ মাগরিব ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে তাঁহার আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছেন।

এদিকে মরহুমের পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুদিবসে বাদ মাগরিব হযরত শাহমালুম ( র:) ‘র মাজার শরীফে পবিত্র কোরআন পাঠ, মিলাদ, দোয়া ও জিয়ারতের আয়োজন করা হয়েছে ।

জানা যায়, তৎকালীন ফেঞ্চুগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক, পরবর্তীতে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের আমৃত্যু সভাপতি, সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সহ সভাপতি, ‘৭১ এর বিল্পবী সরকারের ফেঞ্চুগঞ্জ থানার প্রশাসনিক কমিটির চেয়ারম্যান, ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ ও ফেঞ্চুগঞ্জ ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জননন্দিত জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ।

আওয়ামীলীগ যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই পশ্চিমা স্বৈরাচারী শাসকরা আওয়ামীলগের প্রকাশ্যে রাজনীতি নিষেধাজ্ঞা করে দেয়, তা উপেক্ষা করে জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ তাঁহার সামান্য ক’জন সঙ্গী সাথীদের নিয়ে আওয়ামীলীগের কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকেন। বিধায় তাঁহার উপরে শুরুতেই ঐ জালিম সরকার হুলিয়া জারী করে দেয়। কিন্তু তিনি এতে কোন প্রকার ভ্রক্ষেপ না করে সেই হুলিয়া নিয়েই দলের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন।

তখন তারা তাকে হুলিয়াদেশসহ মামলা করে দিয়েছিল। তিনি আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠা থেকে ১৯৮১ ইংরেজী পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী আওয়ামীলীগের ফেঞ্চুগঞ্জ থানার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮১ ইংরেজী হইতে আমৃত্যু (২৭/০৪/১৯৯৮) পর্যন্ত ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি আওয়ামীলীগের দীর্ঘ সংগ্রামী ঐতিহ্যের পথ অতিক্রম করেন। ১৯৪৯ সালের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংগ্রামী ভূমিকা থেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সুত্রপাত ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠনে মুসলিমলীগের ভরাডুবি সাধন ৬৬ সালের ৬ দফা আান্দোলন ৬৯ এর গণ আন্দোলন এবং ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে যে রক্তাত্ত স্বাধীনতা অর্জনে অত্র ফেঞ্চুগঞ্জ থানার অভিবাবক হিসেবে সর্বত্র নেতৃত্ত্ব দিয়েছিলেন জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ তৃনমূল পর্যায় হতে শুরু হয়েছিল পাড়া , মহল্লা, গ্রাম, থানা পর্যায়ে লাখো মুক্তিকামী মানুষকে স্বশস্ত্র যুদ্ধের অংশিদার হতে স্ব স্ব অবস্থান হতে নেতৃত্ত্ব দিয়েছিলেন তিনি। সেই সুপরিচিত জনগণের সহিত সম্পৃক্ত নেতারা পাড়া ,মহল্লা, গ্রাম ও থানা হতে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে উদ্বোদ্ধ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিলেন জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে বাংলাদেশের সকল থানা বা পৌর এলাকায় আওয়ামীলীগ নেতাদের ন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জ থানার মুক্তিযুদ্ধে গমনেচ্ছুকদের জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ সনাক্ত করে দিতেন। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ভারতে ফেঞ্চৃুগঞ্জের ছাত্র, যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে যাবতীয় ট্রেনিং, নাম রেজিষ্ঠ্রেশন, আবাসনসহ সকল প্রকার কাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।

দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবে তৎকালীন ফেঞ্চুগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ তিনি জেলার উর্ধ্বতন কমান্ড দেওয়ার অর্পিত ক্ষমতায় সমস্ত বলীয়ান ছিলেন। সমগ্র ফেঞ্চুগঞ্জ থানার একমাত্র দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছিলেন জননেতা আব্দুল লতিফ। তাঁহার নির্দেশেই ফেঞ্চুগঞ্জ থানার কমান্ড ছিল। তাঁহার উপরের কর্তা ব্যক্তি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও গোলাপগঞ্জের নির্বাচিত এম এন এ মোহাম্মদ আতাউল গনী ওসমানী এবং অপরজন ছিলেন বালাগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জের এম পি এ জননেতা এডভোকেট লুৎফুর রহমান। যিনি বতর্মান সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত। সম্ভবত একমাত্র তিনিই আওয়ামীলীগের জন্মলগ্নের ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসেবে বতর্মানে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দু-লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হলো আমাদের আকাংকিত স্বাধীনতা। ফিরে পেলাম লাল সবুজের পতাকা আমাদের সোনার বাংলাদেশ।

জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ স্বাধীনতা উত্তর আওয়ামীলীগ যখন ক্ষমতায়, তখন তিনি ফেঞ্চুগঞ্জ থানার প্রসাশনিক চেয়াম্যান ও ফেঞ্চুগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক। যুদ্ধবিধ্বস্থ বাংলাদেশে চারিদিকে শুধু হাহাকার। তার মাঝেও তাঁহার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার হইতে মাইজগাঁও পর্যন্ত কাচা সড়কটি পাকা রাস্তায় রূপান্তরিত করেন। পাহাড় কেটে মাইজগাঁও ফুটবল খেলার মাঠকে বড় ও খেলার মাঠে উপযোগি করেন হয় এবং কাসিম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে তখন অবস্থিত ফেঞ্চুগঞ্জ কলেজকে মাইজগাঁও বি আই ডি সি রোডের মধ্যেবর্তী স্থানে বিশাল এলাকাজড়ে স্থানান্তরিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন। এ রকম বড় বড় কাজসহ ফেঞ্চুগঞ্জকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে তখন অগ্রসর হচ্ছিলেন ঠিক তখনই ১৫ ই আগষ্ট ১৯৭৫ জাতির ইতিহাসে আরেক জঘন্য ট্রাজেডী নেমে আসলো। স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন। স্থম্ভিত ও থমকে গেল বাংলাদেশ। আবার পশ্চাদপা বাংলাদেশের। শুরু হলো আওয়ামীলীগ নিধনে হত্যা, জেল-জুলুম, নির্যাতন। এ থেকে জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফও মুক্তি পেলেন না।

তাহাকেও ঐ স্বৈরশাসক ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৫ ইংরেজীতে বিশেষ ক্ষমতা আইন মামলায় গ্রেফতার করে জ্বেলে প্রেরন করেন। তিনি ঐ হীন রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় দীর্ঘদিন কারা বরন করেন। আওয়ামীলীগের এই চরম দুর্দিনে তিনি অসীম সাহসীকতার সহিত দলের একমাত্র পরিক্ষীত কান্ডারী হিসাবে সারাদেশে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের ওপর নেমে আসা জেল, জুলুম, অত্যাচার আর নির্যাতনসহ সে সময়ের সামরিক সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ফেঞ্চুগঞ্জের মাটিতে আওয়ামীলীগকে পূর্নগঠিত করতে নিরলস কাজ করে যান তিনি । সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১০ দলীয় জোটের নেতৃত্ত্বে দূর্বার আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলেন ফেঞ্চুগঞ্জের মাটিতে।

১৯৭৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে বি এন পির কারচুপির মাধ্যমে জয় জয়কার হলেও ফেঞ্চুগঞ্জ – বালাগঞ্জ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ইনামুল হক চৌধুরী (বীর প্রতীক) ৩ হাজার ৫৭৩ ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী ফেঞ্চুগঞ্জের সন্তান ফতেহ ইউনুস খানকে হারিয়ে সংসদ নির্বাচিত হন। ঐ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থীকে বিজয়ী করতে মরহুম জননেতা মোঃ আবদুল লতিফ জানবাজি রেখে কাজ করেন মাঠে ময়দানে।

১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ সামরিক শাসক এরশাদের অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রমের সামনের কাতারে থেকে তিনি ১৫ দলীয় জোটের পক্ষে নেতৃত্ত্ব দেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ৮৬ সালের নির্বাচনে ঐক্য জোটের প্রার্থী ত্যাগী জননেতা পীর হবিবুর রহমানকে নির্বাচিত করতে নেতৃত্ত্ব দেন জননেতা আব্দুল লতিফ এবং বিএনপি প্রার্থী শফি চৌধুরীকে হারিয়ে পীর হবিবুর রহমান সিলেট- ৩ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সনে আবারও স্বৈরাচার এরশাদের আমলে তথাকথিত ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা পুড়ানো মিথ্যা মামলায় জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফকে আসামী করে মামলা করা হয়, সাথে তাহাঁর ২য় পুত্র বাবলুকেও মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯০ এর গণ আন্দোলনে স্বৈরাচার এরশাদ শাহীর পতন হলে ১৯৯১ ইংরেজীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তাঁহাকে মনোনয়ন প্রদান করিলে তিনি আর্থিক অপ্রতুলতার জন্য মনোয়ন গ্রহন করেননি। পরবর্তীতে আতিকুর রহমান আতিককে আওয়ামীলীগ মনোনয়ন প্রদান করে।

১৯৯৫ সনে তিনি বয়োবৃদ্ধি ও বার্ধক্য জনিত কারনে পতিত হন এবং ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে ফেঞ্চুগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের অতি প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের পুরোধা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জননেতা মোঃ আব্দুল লতিফ ১৯৯৮ সালের ২৭ শে এপ্রিল সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। মৃত্যু কালে তার বয়স ছিল প্রায় ৭৫ বছর । তিনি স্ত্রী, ৩ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তান সহ অসংখ্য আতীয়-স্বজন রেখে যান। (অসমাপ্ত )