সোমবার, ২০ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর

মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘কোটা’: “ইশশ আগে যদি জানতাম কার্ডটি বানিয়ে রাখতাম”



বয়স মনে হচ্ছিল ৭৫ বা ৮০ এরকম হবে। হঠাৎ একজন মুরব্বি বয়সের ভদ্রলোকের সাথে দেখা। উনাকে সালাম দিলাম, উনিও সালামের উত্তর দিলেন। শরীর স্বাস্থ্য দেখতে বেশ শূক্ক মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে উনার ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া হয়নি। রোগাক্রান্ত শরীর যেনো এখন অলসের বসবাস। ভিক্ষে করতেও মন মান ছিলো না। মনটি যেনো সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। তবুও সবার সাথে সমমনা করে চলার তীব্র একটা আকাঙ্খা ছিলো উনার মনে।

দৈনন্দিন জীবনে মানুষ তাদের ব্যবহৃত যে স্থানকে ডাস্টবিন বলে আখ্যায়িত করেন সেখানে পথের ধারে পোঁকা-মাকঁড়ের সাথে বাসকৃত অবস্থায় দেখা হয় ঐ মুরব্বি চাচার সাথে।

অবশেষে উনাকে নিয়ে একাকীত্ব হয়ে ঐ স্থান থেকে সরে আরেকটি নির্জন স্থানে বসে পড়লাম। মনের মধ্যে আকুলতা সৃষ্টি হয়ে গেলো মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে জানতে। উনার বয়স ৭৫ বা ৮০ হতে পারলে অবশ্যই উনার কাছ থেকে জানার অনেক কিছু আছে।

প্রথমেই ভদ্রলোককে বললাম আপনি কি এই দেশের স্বাধীনতা ও বিজয় দেখেছেন…..? উনি উত্তরে বললেন কি বলো বাবা স্বাধীনতা ও বিজয়ের প্রতিটি কণায় কণায় আমাদের ত্যাগ রয়েছে।

তারপর উনাকে আবার বললাম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় কি…..? উনি উত্তরে বললেন যারা এই দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে মৃত্যুবরণ করেছেন তারা বীর শহীদ আর যারা এখনও বেঁচে আছেন তাদের পরিচয় হলো কার্ডবিহীন নামধারী একজন মুক্তিযোদ্ধা।

তখনই ঐ ভদ্রলোক বললেন, “ইশশ আগে যদি জানতাম কার্ডটি বানিয়ে রাখতাম”। তাহলে এখন অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারতাম। বসে বসে খেতে পারতাম। নাতি-পুতিদের পড়ালেখা সব কিছুতেই বেশি অগ্রাধিকার পেতাম।

কেবল ঐ ভদ্রলোক নয় আমাদের সমাজে এরকম আরো অনেক ব্যক্তি আছেন যারা মুক্তিযোদ্ধে আত্মত্যাগ দিয়েছিলেন কিন্তু ঐ কার্ডটি নেই বলে তাদের আজ অস্বীকৃতি দেয়া হয়। তাদের বলা হয় মুক্তিযোদ্ধা কি আপনার বাপের টাকা দিয়ে কেনা।

বর্তমান বাংলাদেশে এই একটি সমস্যা ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে যেখানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক মূল্যায়ণ করা হয় না। দেখার মাঝে দু-একজন।

যাদের অবস্থান রেললাইন, ডাস্টবিন বা পথের ধারে। প্রকৃত মৃক্তিযোদ্ধাদেরকে যদি এদেশে সঠিক মূল্যায়ন না করা হয় তাহলে কিভাবে বিশ্বাস করবো এই কোটা ভোগকারীরা বাংলাদেশের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতি-নাতনী।

মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ণ করা হোক আমি চাই তবে বংশব্যাপী এবং অতিরিক্ত মাত্রায় নয়। কারণ আমি যখন দেখি একটি ছেলে মাস্টার্স পাশ করে চাকরির জন্য হাহাকার করছে, ঘরে বসে আছে তখনই মনে হয় এটা কোটা নয় মানবাধিকার লঙ্গন।

আমাদের এই দেশে দিন দিন বেকারত্বটা বেড়েই চলছে। তার মূল কারণ হিসেবে আপনি কোটা পদ্ধতিকে একটু বেশিই দোষারূপ করতে পারেন। কিন্তু কতদিন দেশে এরকম চলবে…..?

কথায় আছে স্বাধীনতা অর্জন করার চাইতে রক্ষা করা বেশ কঠিন। আমাদের গর্বিত মুক্তিযোদ্ধারাই এর প্রতীক। কিন্তু তাদের মৃত্যুর পরও তাদেরকে নিয়ে এই দেশে রাজনীতি করা হয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং কৌশল অবলম্বন করে শুধু মাত্র টাকা আয় করার জন্য।

আমাদের এই দেশে দুর্নীতি নামকও একটি কোটা আছে তা আমরা সবাই ভুলে যাই।

উদাহরণস্বরূপ একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কথা ধরে নিতে পারি। মনে করতে পারেন মেডিকেল কলেজে ভর্তি। সিট আছে ১০০০। ভর্তি পরীক্ষার্থী ১০ লাখ। ঐ ১০ লাখের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পড়ালেখার সুযোগ পায় মাত্র ৫০০ পরীক্ষার্থী। বাকি ৫০০ কোথায়….? বাকি সিটের মধ্যে কোটা ভিত্তিক চলে যায় ১৫০টি সিট। আর বাকি ৩৫০টি….? তার মধ্যে কাহিনী আছে অনেক। এই ৩৫০টি সিট আমাদের মাননীয় মন্ত্রী-এমপি বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ হয়ে যায় অবৈধা ব্যবসা করার জন্য। এক একটি সিট নিম্নে ২০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়।

একটি গরিব পরিবারের সন্তান দিন-রাত পড়ালেখা করে, সেলুনে নাপিতের কাজ করে, বাবা-মা সবার ভরণ-পোষণ করে অনেক মেধার সাথে যখন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পায় আর যখন এডমিশন ফর্ম পূরণ করবে তখন যদি তাকে শুনতে হয় আপনাকে ভর্তি হতে টাকা লাগবে ১০ লক্ষ। তখন সেই মেধাবী ছাত্রকে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। সেই একই সিট ভর্তি পরীক্ষায় না টিকেও একটি মূর্খ ছাত্র টাকার প্রভাব বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিনে নেয়।
আমি সিট নিয়ে ব্যবসা করার এই কোটার নাম দিলাম দুর্নীতি। যেটি শুধু সংস্কার নয় বাতিল চাই।

সোনার বাংলা গড়তে কিসের প্রয়োজন। কারা গড়তে পারবে এই সোনার বাংলা। আগে বুঝতে হবে কারা এই সোনার ছেলেরা। ছাত্রলীগ, যুবলীগ তাদের দিয়ে গড়বেন সোনার বাংলা। কখনোই সম্ভব না। সোনার ছেলেরা তারা যারা এই কোটা নিয়ে আন্দোলনে ব্যস্ত। কেনো এই দেশের ছেলেরা পড়ালেখা করে বিদেশে চলে যায় তার কারণ হলো এই কোটা পদ্ধতি। তাদেরকে সঠিক মূল্যায়ন দেই না বলে, তাদের প্রতি মূল্যবোধ নেই বলে, মেধাবীদের মূল্যায়ন নেই বলে তারা বিদেশে চলে যায় এবং ভিনদেশীদের গোলামী করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টকশো’র আলোচনা থেকে যতোটুকু জানতে এবং বুঝতে সক্ষম হয়েছি তাতে দেখা যাচ্ছে যে, কোটা ব্যবস্থা অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার ৩০%, নারী ১০%, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ৫%, জেলা ১০% এবং প্রতিবন্ধীদের ১%, মোট এই ৫৬%-কে সংস্কার করে একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নিয়ে আসার দাবিতে তরুণদল আন্দোলন করছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুক্তিযোদ্ধাদের এই ৩০% অত্যন্ত বেশি এবং অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।

বাংলাদেশকে একটি উন্নয়ণশীল এবং প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে অবশ্যই এই কোটা পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে এবং সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনে সাড়া প্রদান করতে হবে।

কারণ আমি সহ্য করতে পারবো না যখন একটি ছেলে আত্মহত্যা করবে তা দেখে, আমি সহ্য করতে পারবো না একটি গরিব সন্তানের বাবা-মায়ের আর্তনাদ দেখে, আমি সহ্য করতে পারবো না যখন একটি ছেলে এসে প্রশ্ন করবে ভাইয়া দেশ কি আমাদের আপন মনে করে না…?

দুটি লাইন বলে শেষ করতে চাইঃ
ওরা অধিকার চাইলো,
ওদের রাজকার বানিয়ে দেয়া হলো…!!

মো: নাঈমুল ইসলাম
ছাত্র ব্যক্তিত্ব সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট ও সংগঠক।