মঙ্গলবার, ২১ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে সৌদি আরবে আজ ৯ জিলহজ পালিত হলো পবিত্র হজ  » «   কমলগঞ্জে পরকিয়ার জেরে পাষন্ড স্বামীর হাতে প্রাণ গেল এক গৃহবধুর !  » «   বিয়ানীবাজার থানায় বিত্তশালীদের মামলা রেকর্ড, দিনমজুরের মা লাঞ্ছিত!  » «   ধর্মপাশায় এক ব্যক্তির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার  » «   সেই গোপন অস্ত্র প্রদর্শণ করল হিজবুল্লাহ  » «   জগন্নাথপুরে জমে উঠেছে ঈদ বাজার  » «   ওসমানীনগরে পশু জবাই করার সরঞ্জামাদী তৈরীতে ব্যস্ত কামারিরা  » «   হা‌সিনা সরকার আবারো বিনা ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার নীল নকসা করছে: মিজানুর রহমান চৌধুরী  » «   জগন্নাথপুরে নব-বধূকে এসিড খাইয়ে হত্যার চেষ্টা  » «   সিলেটের সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু নামাচ্ছে চোরাকারবারী সিন্ডিকেট  » «  

আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষার জাতীয় অবস্থান- কিঞ্চিত আলোচনা



মাতা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের শ্রদ্ধা ও গৌরবের ধন। বলা হয়ে থাকে এ বিশ্বে আড়াই হাজার উর্ধ্বে সাত হাজারেরও বেশি ভাষা রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক ভাষা আপনা আপনি এ বিশ্ব থেকে হারিয়ে গেছে। অনেক ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুকির মধ্যে রয়েছে। তথাপিও এ বিশ্বের কোন জাতি-গোষ্টির মানুষকে তার মায়ের ভাষা,মুখের ভাষা রক্ষার জন্য রক্ত ঝরাতে হয়নি, প্রাণদিতে হয়নি। বাঙালিরাই বিশ্বে একমাত্র জাতি যারা তাঁদের মায়ের ভাষা, মুখের ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে ১৯৫২সালের ২১ ফেব্র“য়ারি প্রাণ দিয়েছিল। সেদিন সালাম, জব্বার, রফিক, সফিক, বরকতসহ নাম না জানা অনেকেই পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে শাহাদত বরণ করেছিলেন। তাদেঁর আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা সেদিন বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিলাম।

বাংলাভাষাকে রক্ষার জন্য শুধু বাংলাদেশের বাঙালিরাই আত্ম উৎসর্গ করেননি। এ ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমাদেরই আরো ১১ জন বাঙালি ভাইবোন যারা ভারতের আসাম রাজ্যের অধিবাসী, তাঁরা ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভারতীয় পুলিশের গুলিতে শহিদ হয়েছিলেন। এভাবে বাঙালি জাতি ১৯৪৮ থেকে শুরু করে নানা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালে এবং ভারতীয় বাঙালিরা ১৯৬১ সালে মায়ের ভাষা বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন।

এই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। বাংলা ভাষাকে উন্নত করা ও বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলা একাডেমি, বাংলা আকাদেমী আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ইত্যাদি।

বাংলা একাডেমি ইতোমধ্যে বাংলা ভাষার উন্নয়নে অনেক কাজ করেছে। যেমন উচ্চশিক্ষার বইপুস্তক বাংলায় অনুবাদ, অফিস-আদালতের পরিভাষা বাংলায় তৈরী, বিদেশী ভাষায় লিখিত ধর্মীয় ও জ্ঞান বিজ্ঞানের অনেক বই বাংলায় অনুবাদ, বাংলা ভাষার আধুনিক বিভিন্ন অভিধান রচনা, বাংলা প্রমিত বানানের নিয়ম ইত্যাদি। অবশ্য বর্তমানে বাংলা অনুবাদের হার অনেকটা কমে গেছে বলে মনে হয়। বাংলাদেশ সরকার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার জন্য অনেকগুলো আইনও করেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হয়নি। তাছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে অনুমোদন না থাকা সত্বেও জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে বংলাকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ আমাদের ২১ ফেব্র“য়ারি শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষনা করেছে। বর্তমানে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র আমাদের ২১ ফেব্র“য়ারিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। সেখানে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য বাংলাদেশ আবেদন করেছে যা বর্তমানে জাতিসংঘের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। এভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের বাংলা ভাষা মর্যাদার আসনে অধিষ্টিত হচ্ছে, বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করছে।

বিশে^র প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মুখের বাংলা। বাংলা ভাষা হচ্ছে বর্তমান বিশে^র ৬ষ্ঠ বা ৭ম স্থানীয় ভাষা। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। বর্র্তমানে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে যে জাতি যত উন্নত হয়েছে সে জাতি তার ভাষাকে তত উন্নত করেছে, তত বেশি বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। ভাষার উন্নতি ছাড়া কোন জাতি উন্নত হতে পারেনা। এ প্রসঙ্গে গ্রীক, ইংরেজ ইত্যাদি সভ্যতার উদাহরণ টানা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আত্মত্যাগী বাঙালি জাতির বর্তমান প্রবণতা কি বাংলার পক্ষে ? উত্তর- না। উদাহরণ অসংখ্য। সরকার অনুমোদিত অনেক প্রতিষ্টান যার নামকরণ করা হয়েছে বা হচ্ছে বিদেশি ভাষায় বা দেশি- বিদেশি ভাষার সংমিশ্রণে। বর্তমানে দেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারী চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, বেসরকারী ব্যাংক- বীমা, টেলিভিশন চ্যানেল, অন্যান্য মহাবিদ্যালয়, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, বিপনি- বিতান ইত্যাদির নাম লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ৯৯% বা তারও বেশি প্রতিষ্ঠানের নাম হয় বিদেশি ভাষায় নয়তো দেশি -বিদেশি ভাষার মিশ্রণে রাখা হয়েছে। যেমন সাউথ ইস্ট ইউনিভাসিটি, ড্যাফোডিল ইউনির্ভাসিটি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি, নথ-ইস্ট মেডিকেল কলেজ, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ, উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এটি এন বাংলা, একটি এন নিউজ, আরটিভি, আইডিয়াল ক্যাডেট মাদ্রাসা, স্কয়ার গ্রুপ, ফ্রেস পানি/ সয়াবিন তেল, আল হামরা শপিং কমপ্লেক্স, আল হারামাইন হাসপাতাল ইত্যাদির নামকরণ লক্ষনীয়। সেদিন একটি বেসরকারী টেলিভিশনের টকশোতে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক জানালেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাভিত্তিক বিষয় ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নও ইংরেজিতে করা হয় এবং পরীক্ষার্থীরা ইংরেজিতে উত্তর লিখলে পরীক্ষকরা খুশি হন। অনেক সময় বাংলা ভাষায় লিখিত উত্তরপত্র মূল্যায়নই করা হয়না বা করা হলেও নম্বর কম দেয়া হয়। বাঙ্গালি সংস্কৃতির লালন ও বিকাশের জন্য যে সংগঠনটি প্রতিষ্টা করা হয়েছে তার নাম ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’। এই হচ্ছে বর্তমানে আমাদের বাংলাভাষা প্রীতি অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে বা এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা ফেব্র“য়ারি মাস এলে বা ২১ ফেব্র“য়ারিতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান, গণমাধ্যমে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেন বা বিজ্ঞাপন দেন এবং সভা সমাবেশ করে সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু করার জন্য বড় বড় বক্তৃতা বিবৃতি দেন। স্ব-বিরোধিতা কাকে বলে।
তাছাড়া বৃটিশ আমলে সৃষ্ট বাংলা বানান জটিলতার সমাধান এখনো হয়নি। এমন কি সমাধানের কোন উদ্যোগ ও নেওয়া হয়নি। বৃটিশরা বাংলা উচ্চারণ সঠিকভাবে করতে না পারায় আমাদের চট্টগ্রামকে চিটাগং, যশোরকে যেশোর, বগুড়াকে বগরা বা চট্টোপাধ্যায়কে চ্যাটার্জি, বন্দোপাদ্যায়কে ব্যানার্জি, পালকে পাউল উচ্চারনে লিখত এখনো আমরা সেভাবে লিখছি, কিন্তু কেন ? ব্যাক্তি বা স্থানের নাম বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি সকল ভাষায় এক থাকার কথা। এক সময় আমাদের দেশে জমিদারী প্রথা চালু ছিল। জমিদারের প্রজাদের কোন সন্তানের জন্ম হলে নাকি প্রজারা এসে জমিদারকে সে সুসংবাদ জানাতো এবং জমিদারের কাছে তার সন্তানের একটি নাম চাইত। তখন জমিদার সাহেবের মুখদিয়ে যে শব্দটা বের হত সেটাই হতো প্রজার সন্তানের নাম। সে সময়কার জমিদারদের প্রজাদের নাম এই কারণে তই, ছই, টই ইত্যাদি ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে জমিদারিও নেয়, প্রজাও নেই এসব নামও নেই। বৃটিশরা একসময় আমাদের জমিদার ছিল তথা শাষক ছিল। তাদেরকে আমরা সেই ১৯৪৭সালে বহু সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এদেশ থেকে তাড়িয়েছি। অথচ তাদের ভুল উচ্চারন আমরা গর্বভরে এখনো বহন করছি কোন যুক্তিতে ?

একজন বঙ্গালি তার সন্তানের নাম, বাসা-বাড়ির নাম কি রাখবেন সেটা তার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার হতে পারে কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের নাম যার অনুমোদন দিয়ে থাকেন সরকার বা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় বা সংস্থা। বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বা একুশের চেতনার পরিপন্থী নামীয় কোন প্রতিষ্ঠানকে যদি অনুমোদন দেয়া না হয় তাহলে আপনা আপনি এ প্রবণতা রোধ হতে বাধ্য।

জাতীয় স্বার্থে সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্টান, সর্বোপরি সকল বাঙালির এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া সময়ের দাবী নয় কি?

মোঃ আব্দুল মালিক