মঙ্গলবার, ২১ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে সৌদি আরবে আজ ৯ জিলহজ পালিত হলো পবিত্র হজ  » «   কমলগঞ্জে পরকিয়ার জেরে পাষন্ড স্বামীর হাতে প্রাণ গেল এক গৃহবধুর !  » «   বিয়ানীবাজার থানায় বিত্তশালীদের মামলা রেকর্ড, দিনমজুরের মা লাঞ্ছিত!  » «   ধর্মপাশায় এক ব্যক্তির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার  » «   সেই গোপন অস্ত্র প্রদর্শণ করল হিজবুল্লাহ  » «   জগন্নাথপুরে জমে উঠেছে ঈদ বাজার  » «   ওসমানীনগরে পশু জবাই করার সরঞ্জামাদী তৈরীতে ব্যস্ত কামারিরা  » «   হা‌সিনা সরকার আবারো বিনা ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার নীল নকসা করছে: মিজানুর রহমান চৌধুরী  » «   জগন্নাথপুরে নব-বধূকে এসিড খাইয়ে হত্যার চেষ্টা  » «   সিলেটের সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু নামাচ্ছে চোরাকারবারী সিন্ডিকেট  » «  

দোয়ারায় ফসলরক্ষা বাধের টাকায় সড়কের কাজ



এক পিআইসি নিজেই জানেন না তিনি পিআইসি সদস্য
আল আমিন, সুনামগঞ্জ :: দোয়ারাবাজার উপজেলায় ফসল রক্ষা বাঁধের নামে অ-প্রয়োজনীয় বাঁধ দেয়া হচ্ছে বরাদ্ধ কাজের চেয়ে বেশি। উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের রাবারড্যামের ভাঙ্গনের উত্তর সীমানা থেকে প্রায় দের কিলোমিটার বাদ দিয়ে উপরের দুই কিলোমিটার বাঁধের কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু এই ফসল রক্ষা বাঁধের প্রধান সমস্যা রেখে কাজ হচ্ছে অন্যস্থানে।

রাবারড্যামের পাশে প্রায় একশত মিটার ভাঙ্গন রেখে উপরের অংশে বোর ফসলের কোন রখম উপকারে আসবেনা এই বাঁধে। তবে একটি উপকারের আসবে মানুষের রাস্তার কাজে ব্যবহ্যত করতে।

জানা যায়, উপজেলার খাসিয়া মারা নদীর বাম তীর প্রকল্প নং ১১৩ এই কাজের জন্য বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, খাসিয়া মারা নদীর ডাম তীর প্রকল্প নং ১১৪ এই কাজের জন্য বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে ২৫ লাখ টাকা, খাসিয়া মারা নদীর ডাম তীর প্রকল্প নং ১১৫ এই কাজের জন্য বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে ১৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

আরোও জানা যায়, এই বেড়িবাঁধে কাজে ব্যাপক আকারে কাজে অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে। কাজ হচ্ছে পি-আইসি মাধ্যমে কিন্তু পিআইসি নিজেই জানেননা তার বাঁধের কাজের বরাদ্ধের পরিমান কত। খাসিয়ামারা খাল বাম তীরে সরকার প্রচুর পরিমানে টাকা বরাদ্ধ দিয়েছে। আর পিআইসিতে অন্যান্য সদস্যরা জানেনা তাদের নাম পিআইসির তালিকায় আছে কি না? কাজ প্রায় শেষের দিকে স্থানীয়দের মুখে সমালোচনায় জানতে পারেন তার নাম পি-আইসি তালিকায় রয়েছে। তিনি খাসিয়ামারা খাল রাবারডাম্প টিলাগাঁও পানি ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. আনফর আলী নিজেই জানেন না তার নাম পিআইসিতে অন্তভুক্তি করা হয়েছে। এই তিনটি বেড়িবাঁধে যে মাটির কাজ হচ্ছে সেটিতে অতিরিক্ত অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে বলে তিনিসহ স্থানীয়রাও অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন,‘এই বাঁধে যে কাজ হচ্ছে বাঁধের পাশে সাইনবোর্ড টাঙ্গানোর কথা কিন্তু এখানে সাইনবোর্ড টাঙ্গানো হয়নি। তার একটাই কারণ সাধারণ মানুষজেনে যাবে এখানো কতটাকার কাজ হচ্ছে, কারা কারা পিআইস। এই বাঁধের কাজ যারা করছেন তারা বেশির ভাইগই স্থানীয় ইউপি সদস্য। এই ইউনিয়ন পরিষদের কিছু মেম্বাররা এক একটি পিআইসর সভাপতি কেউ সদস্য। কিন্তু কাজ নিয়ন্ত্রন করছে পর্দার আড়ালের কিছু লোকজন।

নাম প্রকাশে একাধিক স্থানীয়রা বলেন,‘এই বেড়িবাঁধে যে পরিমানের মাটি পালানো হচ্ছে এটি সাধারণ মানুষকে শান্তনা দেয়ার কাজ। যে পরিমানে সরকার বরাদ্ধ দিছে এই টাকা দিয়ে এর চাইতে ভাল বাঁধ বাঁধা যাবে। কিন্তু এই পিআইসিগুলো কাজের নামে সরকারের টাকাগুলো ভাগবাটোয়ারা করে খাওয়ার জন্য এই রখম কাজ করতেছেন। আমরা কতৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাব যাতে এই ভাঙ্গনটা বেঁধে আমাদের এই ৩০-৪০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের বোরো ফসল রক্ষার করার জন্য। তবে যারা এই টাকা লুটপাট করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ জানান তিনি। এই অনিয়মের সাথে একটি প্রভাবশালি মহল জড়িত আছেন। তারা এই সবকিছুর নিয়ন্ত্রন করেন।

বাঁধে মাটি কাটার সর্দার বক্তারপুর গ্রামের কুদরত আলী বলেন,‘এই কাজে যে অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে বলার বাহিরে। আমরাত বলতে পারি না কারণ আমরা কাজ করিতে খাই, আমরারে পিআইসিরা যেভাবে কাজ করতে বলে আমরাত এই রখম ভাবে কাজ করতে হয়। তাদের বাহিরে যাওয়া যায় না।

তিনি আরোও বলেন,‘আমাদের নিজেদের এই কাজ কিন্তু এই কাজে এই রখম অনিয়ম করে ইতা কল্পনা করার মত না। এইখানে প্রশাসনের অনেকই আসেন কিন্তু কেউ কিছু বলে নি। তারা দেখেও না দেখার বান করেন।
বাধে কাজ করার সময় আব্দুল কাদির নামের আরেক শ্রমিককের সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি বলেন, আমার একহাজার মাটি খাইটা দিলে ২ হাজার থেকে ২৫০০ টাকা পাই। আমরা কাজের মানুষ দিনে আনিতে খাই। প্রতিবেদককে বলেন, আমি যে এই কথা বলতেছি ইতা পত্রিকায় আইলে আমারের তারা টাকা দিত না। কিতা করমু ভাই যে বাঁধ করা অইর ইতা বাধ বেশিদিন টিকতনা। বাঁধে অনিয়মের শেষ নাই।

খাসিয়ামারা খাল রাবারডাম্প টিলাগাঁও পানি ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও ১১৩ নং পিআইসির সদস্য আনফর আলী বলেন,‘কাজের শেষ দিকে লক্ষিপুর বাজারে লোক মুখে জানতে পারি আমার নাম ১১৩নং পি আইসিতে অন্তভুক্তি করা হয়েছে। আমি খোজ খবর নিলাম দেখি আমার নাম পিআইসিতে। পরে আমি বাঁধ সম্পর্কে খোঁজ খবর নিলাম নিয়ে দেখা যায় বাধের কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। রাবার ড্যামের পূর্ব পাশে যে ভাঙ্গা এই ভাঙ্গা মেরামত না করে টাকা লুটপাঠের জন্য বেড়িবাঁধের কাজ করছেন। আমাদের সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে এই ভাঙ্গনের বাঁধটি মেরামত করার। কিন্তু এই ভাঙ্গা বাঁধ না বেঁধে দুর্নীতি করার বাঁধ বাঁধা হচ্ছে। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করব এই ভাঙ্গা বাঁধ মেরামত করার জন্য।

তিনি আরোও বলেন,‘খাসিয়ামারার যে অংশে কাজ করা হচ্ছে এখানে বাঁধের প্রয়োজন ছিলনা। রাবারড্যামের পাশে প্রায় একশত মিটার ভাঙ্গন রয়েছে। গত দুই বছর যাবৎ ভাঙ্গন থাকার কারণে আমাদের এলাকার কোন বোর ফসল রক্ষা করা যাচ্ছে না। এত বড় ভাঙ্গন থাকার পর ভাঙ্গন এলাকা থেকে প্রায় দের কিলোমিটার বাদ দিয়ে উপরের অংশে দুই কিলোমিটার প্রয়োজন ছাড়া কাজ করা হচ্ছে কার সার্থে কাজ করা হচ্ছে বোঝতে পারছিনা।

তবে পিআইসির সভাপতি তিনি নিজেই জানেন না বাঁধের কাজে কতটাকা বরাদ্ধ হয়েছে। এ ব্যাপারে খাসিয়ামারা খাল বাম তীর প্রকল্প নং-১১৩ এর সভাপতি ও লক্ষিপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান সদস্য জিরারগাঁও গ্রামের আব্দুল হাই মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে প্রতিবেদককে বলেন,‘ ‘বরাদ্ধের পরিমান কত তিনি নিজেই জানেন না। বরাদ্ধ যে পরিমান চেয়ারম্যান সাব আমাকে বলেছেন, ২৩ লখ টাকা, আমি পুরোটা জানিনা। আমি আপনাকে পরে যানাইতেছি। আমাকে কোন দিন ইঞ্জিনিয়ার সাব বলেনও নাই এখানে কত টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। পিআইসি কমিটি গঠন করার পর আমাদের নিয়া সভা করার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, কাজ শেষ করা হোক পরে সবকিছু জানাব। সাইনবোর্ডের না লাগানোর ব্যাপারে বলেন, বার বার প্রশাসনকে বলার পরও এখানে কোনো কাজের সাইনবোর্ড দেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে অপর আরেক খাসিয়ামারা খাল ডান তীর প্রকল্প নং-১১৫ এর সভাপতি ও লক্ষিপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নয় ওয়ার্ডের বর্তমান সদস্য বক্তারপুর গ্রামের শরীফ উল্লা এই প্রতিবেদনকের কাছে কাজে অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন,‘আমাদের সব কাজ খুবই ভাল হয়েছে। কোনো অনিয়ম নাই। এই রখম ভাল কাজ এর আগে কখনো এই এলাকায় হয়নি। আমরা সাইনবোর্ড টাঙাইয়া কাজ করতেছি। এই বিষয়ে পরে কথা হবে। তবে তিনি দেখা করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, একদিন আসেন বসে কথা হবে। তিনি নিজেই জানেন না কত নাম্বার পিআইসতে আছেন জানতে চাইলে বলেন, কাগজ দেখে বলতে হবে।

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কমিটির আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর বলেন,‘আমরা জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ও সিনিয়র সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান এই হাওর রক্ষা বাঁধ পরিদর্শনে গিয়ে দেখি এই বেড়িবাঁধে যে কাজ করানো হচ্ছে এটি দায় সাড়া কাজ এবং সরকারের টাকাগুলো মেরে খাওয়ার দান্ধা। যে টাকার কাজ হচ্ছে বুঝা যায় ইতা লোক দেখানোর কাজ হচ্ছে।

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন,‘এই যে বাঁধে ব্যাপক আকারে অনিয়ম হচ্ছে তা দেখে আমরা জেলা প্রশাসককে মোবাইল ফোনে অবগত করি। বাঁধে কোনো সাইনবোর্ডও নেই। এই বাঁধে যে কাজ হচ্ছে এখানো আমরা কোনো পিআইসির সদস্যদেরকে দেখতে পাইনি। বিকালে লক্ষীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিরুল হককে আমরা জিঙ্গাস করলাম এই বাঁধে যে অনিয়ম হচ্ছে এগুলো কি হচ্ছে। তিনি কোনো কথার উত্তর দেন নি। পরে এইদিনেই জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম এই বাঁধ পরিদর্শন করেন।

তিনি আরোও বলেন, হাওর রক্ষা বাঁধের টাকা দিয়ে হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় একটি সড়কের কাজ। কিন্তু এই হাওর রক্ষা বাঁধের নামে সরকারের লাখ লাখ টাকার অপচয় হচ্ছে। এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা তারা নিজেরাই পিআইসি। এই সরকারের টাকাগুলো অপচয়ের কারণে ও হাওররক্ষা বাঁধের নামে যারা অনিয়ম, দুর্নীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে মামলা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই অনিয়ম দুর্নীতির জবাব দিতে হবে তাদের।

এ ব্যাপারে দোয়ারাবাজার উপটজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন,‘রাবার ড্যামে যে ভাঙ্গন রয়েছে সেই কাজ করবে এলজিইডি। আমরা উপরের অংশে কাজ করছি দুই কিলো মিটার বাকি ভাঙ্গন অংশে এলজিইডি কাজ করলে পুরোটা বাঁধ সম্পুর্ণ হবে।

অনিয়মের বিষয়টি তিনি স্বীকার করে বলেন,‘ খাসিয়া মারা নদীর বাম তীর ও ডান তীরে পিআইসি ১৩,১৪,১৫ এই ৩টি পিআইসি বেড়িবাঁধের কাজ করছে। আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে এই বেড়িবাঁধে অনিয়ম হচ্ছে বলে বিষয়টি জেনেছি। আমরা বাঁধটিতে তদারকি করছি। যাতে এই বাঁধটি টিকমত হয় এবং কাজটি যাতে দ্রুত সময়ের বিতরে শেষ হয় সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যদি কেউ অনিয়ম করে তাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে গতকাল সোমবার এই কাজ দেখার জন্য উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার বিশ্বাসসহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন ম্যাজেস্ট্রেট এসে পরিদর্শন করেছেন।
রাবার ড্যামের পাশে বড় ভাঙ্গন রেখে কাজ করা হচ্ছে, এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন,‘বড় ভাঙ্গনের জন্য আমরা প্রস্থাবনা পাটিয়েছিলাম এই বাঁধের বরাদ্ধ আসেনাই। আর এই এলাকা আমাদের এলাইনম্যান্টে নাই।

কাজে অনিয়মের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা এই ব্যাপারে খোজ খবর নিচ্ছি, কেউ কাজে অনিয়ম করে তাকলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থ্যা নেব।