মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বুশরাদের হাতে নতুন বই, মুখে রাজ্যের হাসি



ডেস্ক রিপোর্ট::  নতুন বই হাতে খুশিতে বাড়ি মুখি বুশরা, সুরাইয়া ও কামরুল। জিজ্ঞেস করতে সহসাই সুরাইয়ার জবাব-`আমরা তিনজন টু-তে পড়ি’। হাটতে হাটতে নতুন বইয়ে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলো চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র রুহুল আমিন ও তার দুই সহপাঠি।

মাইলখানেক দূরে থেকে মীরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের বই নিতে আসা। এই প্রাঙ্গনে দেখা যায় শিশু শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি। বই নিতে কার্ড হাতে উচিয়ে আনন্দে-উল্লাসে মাতোয়ারা শিশুদের
কেউ নতুন বই হাতে পেয়ে খুশিতে দৌড়ে বাড়ি মুখি। কেউ ক্লাসে বসে কিংবা হাটতে হাটতে নতুন বইয়ে বুলিয়ে নিচ্ছে চোখ- কি আছে নতুন বইয়ে!

শহরের বিদ্যাঙ্গনের মতো বর্ণিল আয়োজন নেই গ্রামের এসব বিদ্যালয়ে। শিশুদের পোষাকেও নেই চাকচিক্য। কারো পরণে শুধুই সেন্ডো গেঞ্জি, কারো পরণের ফ্রক-শার্ট ময়লাতে মলিন। যেমন খুশি, তেমন পোষাকে আগমন বিদ্যালয়ে। এসব কাপড় পরেই উৎসবে অংশ নেওয়ার দৃশ্য গ্রামের বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা মিলে।

সেসব বিদ্যালয়ে নেই কোনো অতিথি। শহরের ন্যায় আনন্দ আয়োজন না থাকলেও ছিল নতুন বইকে ঘিরে খুশির জোয়ার। বই উৎসবে মুখরিত ছিল সিলেটের গ্রাম-মহল্লার বিদ্যালয়গুলো। নতুন বই পেয়ে শিশুদের মুখে ফুটে রাজ্যের হাসি।

তবে শহরের বিদ্যাপীঠের ন্যায় গ্রামে শিশুদের এগিয়ে নিতে নেই অভিভাবকের কোলাহল। কেননা, গ্রামের মানুষকে যেখানে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরে জীবিকা তাগিদ। সেকারণে বই উৎসব দেখা মিলেনি অভিভাবকদের।

সরেজমিন দেখা যায়, সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই দপ্তরি। খোদ প্রধান শিক্ষক বাদল চন্দ্র আচার্য্য বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির বাড়ি থেকে বইয়ের বুঝা নিয়ে আসছেন বিদ্যালয়ে। তাকে সহায়তা করছেন শিশু শিক্ষার্থীরা।

উপজেলার তবলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ১০টায় এক শিশুর হাত দিয়ে চলছিলো জাতীয় পতাকা উত্তোলন। বিদ্যালয়ের চিত্র ও শিশু শিক্ষার্থীদের দেখেই অনুমেয় দারিদ্রতার কষাঘাতে বেড়ে উঠছে তারা। তবুও নতুন বইয়ের আনন্দে স্বাদ নিতে আত্মহারা শিশুরা। হাতে বই পাওয়ার পরই খোলে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেনো-শুরুতেই সব পারে তারা!

এনজিও সংস্থা এফআইবিডিবি তবলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে আসলেও প্রকল্প শেষ হওয়ায় তারা ছেড়ে যায় ২০১৪ সালে। এরপরও হাল ছাড়েননি তিন শিক্ষিকা।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির যত সামান্য বেতনে ১২৪ শিক্ষার্থী নিয়ে তাদের পথ চলা থেকে নেই জানালেন প্রধান শিক্ষিকা সাবানা বেগম। জানালেন-এবার বিদ্যালয়ের ফলাফলও শতভাগ পাশ।

জরুরী কাজে ঢাকায় অবস্থান করলেও বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি রইছ আলী মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমাদের গ্রামটির মানুষ হতদরিদ্র। সবাই খেটে খায়। এই গ্রামের ছেলে-মেয়েরা আগে অন্যগ্রামের বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়তো। এফআইবিডিবি স্কুলটি চালু করলেও প্রোজেক্ট বন্ধ হওয়ায় ফেলে যায়। সেই থেকে বিদ্যালয় কমিটির খরচেই পরিচালিত হচ্ছে। বই উৎসবে তার বদলে বই বিতরণ করে যাওয়ারও অনুরোধ করেন তিনি।

সিলেট সদর উপজেলার মীরপুরে হাজি এলাহি বকশ উচ্চ বিদ্যালয় দ্বিতীয় শাখার উদ্বোধন ছিলো সোমবার (১ জানুয়ারি)। ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিদ্যালয়ে বই বিতরণ করেন প্রতিষ্ঠাতা আতাউর রহমান ও প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসাইন। শিক্ষক ও কঁচিকাচা শিশুদের নিয়ে ছোটখাটো বই উৎসব হলেও ছিলো রাজ্যের আনন্দ।

মীরপুর সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সুমনা চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ১০৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে এবার ৪৩০ জন ছাত্র-ছাত্রী পিইসি পরিক্ষায় অংশ নিয়ে সকলেই কৃতকার্য হয়েছে। গ্রামের স্কুল হলেও শহরের অনেক বিদ্যালয়ের চেয়ে ফলাফলের দিকে এগিয়ে রাখছেন তার এই বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান।