বুধবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর
নিসচা মহানগরের সভাপতি ইকবাল’র জন্মদিন পালন  » «   ফলিক খানের অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রীর মিটানো নাম নতুন করে অঙ্কন  » «   গোলাপগঞ্জে যুবদলের ৩৯তম প্রতিষ্টা বার্ষিকী পালন  » «   বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ারের মৃত্যুতে সিলেট সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের শোক  » «   জগন্নাথপুরে টাকা দেয়া হলেও চাল দেয়া হয়নি  » «   জগন্নাথপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ব্যবসায়ী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে  » «   ২৬ নং ওয়ার্ড তালামীযের অভিষেক ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন  » «   সোশ্যাল মিডিয়ায় দুই নায়িকার মেকআপ রুমের ছবি ফাঁস!  » «   কমলগঞ্জে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস পালিত  » «   জগন্নাথপুরে নুর আলীর খুনিদের ফাসির দাবিতে সোচ্চার এলাকাবাসী  » «  

রাষ্ট্রীয়ভাবে শব্দদূষণের দিকে দৃষ্টিপাত করা অত্যন্ত জরুরী: সৈয়দ মবনু



শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী, হৃদরোগী, গবেষক, কম্পিউজিটার, কপিরাইটার, নামাজি, পূঁজারী, জিকিরকারি, কোরআন-বাইবেল-গীতা পাঠকারি, অফিসের প্রকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারী, সকালের স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, অফিস কিংবা কোথাও যাওয়ার জন্য একটু দ্রুত ঘুমে যাওয়ার প্রত্যাশী, হাসপাতাল অথবা বাড়ির রোগীকে যদি প্রশ্ন করা হয় মাইকের আওয়াজে জালাতন কত প্রকার এবং কি কি? তখন তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকেন, কোন উত্তর দিতে পারেন না।

কষ্ট যখন পাথর হয় তখন মানুষ হয়ে যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমি ওদের সবার চোখে টলটল জল দেখেছি মাইকের আওয়াজের জালাতনে। শহরে কিংবা গ্রামে আমি কত দেখেছি ছেলে-মেয়েরা মাইকের আওয়াজে অতিষ্ট হয়ে রিতিমত হাউমাউ করে কাঁদছে। কারণ পরেরদিন তাদের পরীক্ষা।

আমাকে অনেক ছেলেমেয়ে প্রশ্ন করছে প্রতিদিন, আমরা সারা বছর এত কষ্ট করে লেখাপড়া করলাম, এত টাকা খরচ করে প্রইভেট পড়লাম, উদ্দেশ্য একটাই-পরীায় ভালো ফলাফল। আর আজ পরীার সময় মাইকের শব্দে পড়তে পারছি না। কত বৃদ্ধ এবং রোগীর মুখে আমি লানত শোনেছি এই মাইক ব্যবহারকারীদের প্রতি।

আমি সেই ব্যাক্তিকে কাঁদতে দেখেছি, যিনি একটু ঘুমের প্রত্যাশায় টেবলেট খেয়ে বিচানায় চটপট করছেন কিন্তু শব্দের জন্য ঘুমাতে পারছেন না। কত মাকে দেখেছি বাচ্চাকে ঘুম পারাতে একটু নীরবতার প্রত্যাশায় অতিষ্ট হয়ে কপালে হাত দিয়ে কাঁদতে। আমি শুধু মুসলমান পরিবারের কথা বলছি না। আমি এই অবস্থাগুলো দেখেছি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মণিপুরী ইত্যাদি পরিবারগুলোতে। আমি দেখেছি ধনী এবং গরীব সবার মধ্যে বিষয়টি কষ্ট সঞ্চার করে।

সিলেট জেলা প্রশাসকের সেমিনারকে একবার এক মতবিনিময় সভায় আমি জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেছিলাম, জেলার শব্দ দূষণের মাত্রা হ্রাসের চেষ্টা করতে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং হাসপাতাল এলাকায় ওয়াজ, পূঁজা, গান, রাজনৈতি-অরাজনৈতিক ইত্যাদি মিটিং-এ মাইকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। আমার দাবীকে আরও শক্তিশালী করতে সিলেটের বিশিষ্ট্য মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় সদররুদ্দিন তাঁর এলাকায় পূঁজা চলাকালিন সময়ে তিন-চার দিন মাইক আর গান-বাজনার নির্যাতনের একটা চিত্র বর্ণনা দিয়ে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেন শব্দ দূষণকে নিয়ন্ত্রণ করতে।
জেলা প্রশাসক সেদিন বলেছিলেন, তিনি চেষ্টা করবেন। তবে তিনি চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয় না। কিংবা চেষ্টা করলে ব্যর্থ হয়েছেন তা প্রমাণ করছে।

আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি, দয়া করে দেশে শব্দ দূষণের মাত্রা হ্রাসের চেষ্টা করুন। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং হাসপাতাল এলাকায় ওয়াজ, পূঁজা, গান, রাজনৈতি-অরাজনৈতিক মিটিং-এ আউটডুর মাইকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করুন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমরা দেখেছি বড় বড় গণসমাবেশ হয়, কিন্তু মাইকের শব্দ তার নির্দ্দিষ্ট এলাকার বাইরে যায় না। অথচ আমাদের দেশে অনুষ্ঠানস্থল থেকে মাইকের লাইন টেনে নিয়ে যাওয়া হয় আরও মাইলখানেক। অতঃপর আওয়াজ যায় আরও মাইলখানেক।

এসব নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের দায়িত্ব। তবে এেেত্র সরকারিদল এবং তাদের শাখা সংগঠনগুলোকে প্রথমে সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতঃপর ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের কর্তাদেরকে ডেকে পরামর্শের ভিত্তিতে বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। কারণ, এসব েেত্র ফ্যাটিকরা খুবই স্পর্শকাতর। ধর্মীয়রা বিষয়টাকে ধর্মবিদ্বেষ এবং রাজনীতিকরা অপপ্রচার করবে প্রতিপকে দমন। তাই সরকারকে প্রথমে চেষ্টা করতে হবে মানুষের মনে দয়াদর্শন জাগানোর।

আমাদের দেশে সর্বস্থরের মানুষের হৃদয়ে এখনও দয়াদর্শন জেগে ওঠেনি। বেশিরভাগ মানুষ যেকোন বিষয়কে জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্ম এবং প্রেমের সমন্বয়ে বিবেচনা করতে শিখেনি। ফলে মানুষের মনে বুদ্ধি থেকে বেশি আবেগ কাজ করে। অন্যের ইন্ধনে বেশিরভাগ মানুষ আবেগে আপ্লত হয়। চিল কান নিয়েছে শোনলে, কানে হাত না দিয়ে চিলের পিছনে দৌঁড়তে থাকে। এখানে বেশিরভাগ ধার্মিক এবং রাজনীতিকরা জ্ঞান ও বুদ্ধির সমন্বয়শূন্য প্রেমিক কর্মকার।

যেখানে জ্ঞান ও বুদ্ধির সমন্বয় ছাড়া কর্মের আগে প্রেম জেগে ওঠে সেখানে শাস্ত্র থেকে শাস্ত্রিকের বক্তব্যের মূল্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে মানুষকে আবেগে আপ্লুত করে। শাস্ত্র (কোরআন-হাদিস, বাইবেল, গীতা, রাষ্ট্রের সংবিধান ইত্যাদি) বলছে, তুমি তোমার কর্মে (ইবাদত, পূঁজা, প্রার্থনা, মিটিং ইত্যাদির জন্য) অন্যকে কষ্ট দিও না। আর শাস্ত্রিকরা প্রতিদিন অসংখ্য ওয়াজ, পূঁজা, খতমে শফিনা, খতমে বোখারি, মিটিং, মিছিল, গান ইত্যাদির আয়োজনে মাইক ব্যবহার করে মানুষকে মরণযন্ত্রণা দিচ্ছেন। আর আমরা শাস্ত্রিকদের ফ্যানাটিক ভক্তদের হুংকারে শাস্ত্রের সঠিক কথাটিও বলতে পারছি না। পারছিনা নিজেদের ধর্মীয় কিংবা রাষ্ট্রীয় অধিকারের কথা বলতে।

আমার দেশের সাধারণ জনগণ মনে করি, সরকারী, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের দেশের শব্দদূষণের প্রতি দৃষ্টিপাত অত্যন্ত জরুরী। কারণ, এই বিষয়ের সাথে আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে হৃদয়রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য এই শব্দ দূষনও অনেকটা দায়ী। এই শব্দ দূষণের কারণে গণহারে মানুষের শ্রবণশক্তি দূত লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। লেখাপড়া, অফিস-আদালতের তো তি হচ্ছেই।