সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: আলী ফজল কাওছার



আলহামদুলিল্লাহ, বছর ঘুরে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । এই দিনে পৃথিবীর বুকে তশরীফ এনেছিলেন সাইয়িদুল মুরসালীন, নবীদের সম্রাট, রহমতুল্লীল আলামীন, আমাদের প্রাণের স্পন্দন কলিজার টুকরা হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, উনার জন্মদিন হচ্ছেন মুমিনদের জন্য সবচেয়ে বড় ঈদ ঈদে আযম পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম ।

আমরা মিলাদুন্নবীর মূল আলোচনা লিখার আগে মিলাদুন্নবীর শাব্দিক আলোচনা করবো । মিলাদ + নবী দুটি শব্দ একত্রে মিলে মিলাদুন্নবী বলা হয় । সমাজে ‘মিলাদ’ এর তিনটি শব্দ প্রচলিত আছে মিলাদ, মাওলিদ ও মাওলূদ । ‘মিলাদ’ অর্থ জন্মের সময়, ‘মাওলিদ’ অর্থ জন্মের স্থান, ‘মাওলূদ’ অর্থ সদ্যপ্রসূত সন্তান । আর ‘নবী’ শব্দ দ্বারা বুঝায় হুজুর (সঃ) কে । শাব্দিক অর্থে ‘মিলাদুন নবী’ বলতে হুযুর (সঃ) এর বিলাদত শরীফ বা জন্মবৃত্তান্তকে বুঝানো হয়ে থাকে । মিলাদ তথা স্থান বা কালবাচক বিশেষ্য । যেমন মীছাক, মীকাত, মীয়’আদ ইত্যাদি শব্দগুলো একইভাবে ইসমে যরফ তথা স্থান বা কালবাচক বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় । বিভিন্ন অভিধানে মীলাদ শব্দটির অর্থ কিভাবে লিখা হয়েছে তা নিম্নে উল্লেখ করছি-
আল্লামা ইবনে মানযুর আল আফরীকি (মৃতঃ ৭১১ হিঃ) লিখেছেনঃ
অর্থাৎ লোকটির মিলাদঃ যে সময় সে জন্মগ্রহন করেছে সে সময়ের নাম ।
গিয়াছুল লুগাতে লিখিত আছে
মিলাদ শব্দটির মীম অক্ষর যের বিশিষ্ট যার অর্থঃ জন্মকাল ।
মুন্তাখাব অভিধানে লিখিত আছেঃ
নবজাতক শিশু, জন্মকালীন ঘটনা, জন্মের সময়কাল ।
ইংরেজী ও আরবী ডিকসনারীতে আছে
‘মিলাদ’ অর্থঃ birth (process of being born, coming into the world) অর্থাৎ পৃথিবীতে আগমনের সময় ।
ফায়েদাঃ
আমরা দেখলাম মিলাদুন্নবী অর্থঃ হুজুর (সঃ) এর জন্মের সময় বা জন্মকালীন ঘটনা । আমরা বিভিন্ন অভিধান খুঁজে দেখলাম যে, মিলাদ শব্দটি কে কোন অভিধানবেত্তা ইসমে আ’লাহু তথা যন্ত্রবাচক বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহার করেন নাই । যারা এমনটি বলেন, মূলতঃ তা নবীর সাথে বেয়াদবী বৈ কিছুই নয় ।
মিলাদের পারিভাষিক অর্থ
১) আল্লামা মোল্লা আলী আল ক্বারী (রহঃ) তার বিখ্যাত কিতাব “আল মাওরিদুর রাবী” তে বলেন
মিলাদ বলতে নবীর জন্মবৃত্তান্ত তার মুজিযাসমূহ ও সিরাতের আলোচনার জন্য একত্রিত হওয়া, আর যথাযথ প্রশন্সাসহ তার প্রতি দরুদ ও সালাম পড়া । জীবিত ও মৃতের জন্য দোয়া, অতঃপর তাবাররুক (খাবার) আয়োজন করে মানুষের অন্তরে নবীর জন্মে আনন্দিত হওয়া ।
২) মিলাদুন্নবী অর্থ হচ্ছেঃ
তার জীবনকালের ঘটনাবলী, সানা সিফাত, মাতৃগর্ভে অবস্থানকালীন অলৌকিক ঘটনাবলী, তার বংশ পরিচয়য়, হালিমা (রাঃ) এর ঘরে প্রতিপালিত হওয়ার ঘটনা আলোচনার নামই মিলাদ ।
৩) প্রচলিত মিলাদ বলতেঃ
কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরীফ পাঠ, তাওয়াল্লুদ বা জন্মকালীন ঘটনা মজলিস করে আলোচনা করা, দাঁড়িয়ে সালাম, কাসিদা বা প্রশংসামূলক কবিতা, দোয়া মুনাজাত ও তাবাররুক বিতরণ ইত্যাদির সামষ্টিক রূপ ।
আমরা মিলাদের পরিচয়ে যা বুঝতে পারলাম এখন দেখব তা কতটুকু শরীয়াহ সমর্থিত তা পর্যালোচনা করার প্রয়াস পাব ।
মিলাদ শব্দটির ব্যবহার
মিলাদ শব্দটির মূল অক্ষর হচ্ছে و + ل + د) ولد) । আমরা দেখব কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফে মূল অক্ষরে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে কিনা ।
কোরআন মজীদে
وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدتُّ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا
আর শান্তি বর্ষিত হোক আমার উপরে যে দিন আমার জন্ম হয়েছিল, আর যে দিন আমি মারা যাব । আর যে দিন আমাকে পুররুত্থিত করা হবে জীবিত অবস্থায় ।
ফায়েদাঃ
আমরা দেখলাম কুরআন মাজীদে মূল অক্ষরে وَلَدَتُ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে; যার অর্থ আমি জন্ম গ্রহণ করেছি । এ শব্দটি প্রমাণ করে মিলাদের মূল অস্তিত্ব কুরআন মাজীদে বিদ্যমান ।
হাদীস শরীফে
আমরা এখন দেখব কুরআনের পাশাপাশি হাদীস শরীফে এ শব্দটির ব্যবহার আছে কিনা । আমরা দেখি যে, জামে তিরমিযী শরীফে ميلاد ‘মিলাদ’ (জন্মের সময়) শব্দটি রাসূল (সঃ) নিজেই ব্যবহার করেছেন । যেমনঃ
১) রাসূল (সঃ) এর জন্ম সাল সম্পর্কে হযরত কায়স ইবনে মাখরামা (রাঃ) বলেনঃ
অর্থাৎ আমি ও রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুজনেই “হাতীর বছরে” জন্মগ্রহণ করেছি । হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ) কুবাস বিন আশিয়ামকে প্রশ্ন করেনঃ আপনি বড় না রাসূল (সঃ) বড় ? তিনি উত্তরে বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সঃ) আমার থেকে বড়, আর আমি তার পূর্ব জন্মগ্রহণ করেছি ।
[1]
২) হাদীস শরীফে আমরা আরও দেখতে পাই মহানবী (সঃ) বলেনঃ
ما من مولود الا يولد على الفطرة অর্থাৎ প্রত্যেক শিশু তার স্বভাবের উপর জন্মলাভ করে ।
[2]
আমরা দেখলাম হাদীস শরীফে “মাওলুদ” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ।
হাদিসের ইমামগণ স্ব স্ব কিতাবে মিলাদ শব্দটি ব্যবহার করেছেন
আমরা এখন দেখব কুরআন ও হাদীস শরীফের পাশাপাশি হাদিসের ইমামগণ স্ব স্ব কিতাবে মিলাদ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কিনা । আমরা দেখি যে, আবূ ঈসা মুহাম্মদ ইবনু ঈসা তিরমিজী (রহঃ) (হিঃ ২৭৯) তার বিখ্যাত কিতাব জামে তিরমিযীর ২য় খণ্ডের ২০৩ পৃষ্ঠায় একটি শিরোনামে লিখেন-
باب ما جاء فى ميلاد النبى صلى الله عليه وسلم অর্থাৎ যা রাসূল (সঃ) এর জন্ম সম্পর্কে এসেছে । এখানে তিনি ‘মিলাদ’ শব্দটি রাসূল (সঃ) এর জন্মবৃত্তান্ত বুঝাতে ব্যবহার করেছেন ।
অনুরূপভাবে ইমাম বায়হাকী (রহঃ) (ওফাত ৪৫৮ হিঃ) তার বিখ্যাত সিরাত সংক্রান্ত হাদিসের কিতাব ‘দালায়েলুন নবুওয়ত” নামক কিতাবের ১ম খণ্ডের ৪৯ পৃষ্ঠায় ابواب ميلاد رسول الله শীর্ষক একটি অধ্যায় এনেছেন । যেখানে তিনি রাসূল (সঃ) এর জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করেছেন ।
কোরআনের আলোকে মিলাদ শরীফঃ ১ নং আয়াতঃ
এবং স্মরণ করুন! যখন আল্লাহ নবীগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের নিকট রসূল, যিনি তোমাদের কিতাবগুলোর সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁকে সাহায্য করবে। এরশাদ করলেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এ সম্পর্কে আমার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করলে?’ সবাই আরয করলো, ‘আমরা স্বীকার করলাম।’ এরশাদ করলেন, ‘তবে (তোমরা) একে অপরের উপর সাক্ষী হয়ে যাও এবং আমি নিজেই তোমাদের সাথে সাক্ষীদের মধ্যে রইলাম।’ সুতরাং যে কেউ এর পর ফিরে যাবে তবে সেসব লোক ফাসিক
— সূরা আল ইমরান আয়াত ৮১, ৮২
ফায়েদাঃ
উপরোক্ত আয়াতে বুঝা যায়, আল্লাহ্‌ তায়ালা রুহের জগতে মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবনী আলোচনা ও তাঁকে মানার ব্যাপারে নবী-রাসূলগণের নিকট থেকে অঙ্গিকার গ্রহণ করেছিলেন । তাই রাসূল (সঃ) এর জীবনী দলবদ্ধভবে আলোচনা সুনাতে ইলাহীরই নামান্তর । এছাড়াও এ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বিভিন্ন মুফাসসিরগণের অভিমত নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
তাফসীরে ইবনে কাসীরে বলা হয়েছে- এ আয়াতে নবীদের থেকে এ ইঙ্গিত নেয়া হয়েছে যে, রাসূল (সঃ) যখন আসবেন তখন তার প্রতি ঈমান আনবেন এবং সাহায্য করবেন ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আয়াতে রাসূ দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) কে বুঝানো হয়েছে ।
তাফসীরে কাবিরে ইবনে মুনির বলেন, আল্লাহ্‌ পাক ঐ সমস্ত জাতির লোকদের কাছ থেকে ঐ রাসূল সম্পর্কে অঙ্গীকার নিলেন যাদের নিকট তাঁদের নবীগণ তার তা’জীম বা সম্মানের কথা বর্ননা করতেন । আর এখানে তার মর্যাদা বলতে মুহাম্মদ (সঃ) এর মর্যাদাকে বুঝানো হয়েছে ।
আল্লামা তাকী উদ্দিন সুবুকী (রঃ) لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ এর অর্থের উপরে একটি সুন্দর ও চমৎকার রেসালাহ লিখেছেন, তাতে তিনি বলেন এতে কোন সন্দেহ নাই যে, এই আয়াতটি রাসূল পাক (সঃ) এর উচ্চ প্রশংসা এবং উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে ।
তথ্যসূত্র
↑ তিরমিযি, আবূ ঈসা মুহাম্মদ ইবনু ঈসা (২৭৯ হিঃ), আস সুনান, , (বৈরুত, দারু ইহ্‌য়ায়িত তুরাসিল আরাবী, প্রকাশকাল – ১৯৯৮ খৃঃ) হাদিস নং ৩৬১৯
↑ বুখারী, মুহাম্মদ ইবনুল ঈসমাইল (২৫৬ হিঃ), আস শুনান, (বৈরুত, দারু ইবনি কাসীর, প্রথম প্রকাশকাল ১৪০৭ হিঃ/১৯৮৭ ঈসায়ী), খন্ড-১, পৃষ্টা- ১৪, হাদিস নন্ত ১৩৫৮, মুসলিম শরীফ, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬১ হিঃ) আস সহীহ (বৈরুত, দারুল আফাক আল জাদীদাহ) হাদীস নং ৬৯২৬
শরীয়ার কষ্টিপাথরে মীলাদ ও কিয়াম (লেখকঃ মুফতি মুহাম্মদ ওসমান গনি সালেহী)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামর শুভাগমনের দিন কেবল মুসলমান নয় সৃষ্টিজগতের সকলের জন্য আনন্দের ও রহমতের। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন-আমি আপনাকে জগতসমূহের রহমত করে প্রেরণ করেছি। তাই সৃষ্টির সূচনা কাল থেকে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপিত হয়ে আসছে। যেহেতু ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলো মুসলিম জাতির আনন্দের দিন, সেহেতু সারা বিশ্বের মুসলিমগণ অত্যন্ত ভক্তি ও মর্যাদার সাথে রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করে থাকেন। কিন্তু এক দল লোক এটিকে অবৈধ ও বিদয়াতে সাইয়্যিআহ (মন্দ বিদআত) বলে প্রচার করছে। অথচ এটি একটি শরিয়ত সম্মত পুণ্যময় আমল, যা কুরআন, সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। অত্র প্রবন্ধে আমরা এটি শরিয়ত সম্মত হবার বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দলীল, সাহাবায়ে কিরামের স্বীকৃতি, সালফে সালেহীন, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফিকাহবিদগণের দৃষ্টিভঙ্গি তোলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি।
ঈদে মিলাদুন্নবী পরিচিতি
ক.শাব্দিক পরিচয়
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ শব্দটি যৌগিক শব্দ। যা তিনটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত।
এক, ঈদ
দুই, মিলাদ
তিন, নবী।
প্রথমত
ঈদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ উৎসব, আনন্দ, খুশি।
বিশ্ববিখ্যাত অভিধান প্রণেতা ইবনু মনযুর বলেন-
ﺍﻟﻌﻴﺪ ﻛﻞ ﻳﻮﻡ ﻓﻴﻪ ﲨﻊ
‘সমবেত হবার প্রত্যেকদিনকে ঈদ’ বলা হয়।
— ইবনু মনযুর, লিসানুল আরাব, দারু সাদির, বৈরুত, ১ম সংস্করণ, খ. ৩য়, পৃ.৩১৫
মুফতি আমীমূল ইহসান আলাইহির রাহমাহ বলেন-
ﺍﻟﻌﻴﺪ ﻛﻞ ﻳﻮﻡ ﻓﻴﻪ ﲨﻊ ﺍﻭ ﺗﺬﻛﺎﺭ ﻟﺬﻱ ﻓﻀﻞ
কোন মর্যদাবান ব্যক্তিকে স্মরণের দিন বা সমবেত হবার দিনকে ঈদের দিন বলা হয়।
— মুফতি আমীমূল ইহসান, কাওয়ায়িদুল ফিকহ, আশরাফি বুক ডিপু, ভারত, ১ম সংস্করণ, ১৩৮১ হিজরী, পৃ.৩৯৫
দ্বিতীয়ত
মিলাদ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ: জন্মকাল, জন্মদিন। এ অর্থে মাওলিদ (ﻣﻮﻟﺪ) শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় অত্যোধিক।
তৃতীয়ত
নবী, এখানে নবী বলতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। কারণ মুসলিম জাতি ও পুরো সৃষ্টিজগত তাঁর আগমণের শোকরিয়া আদায় করে। সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ অর্থ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র শুভাগমনের আনন্দ উৎসব।
খ.‘মিলাদুন্নবী’ শব্দের প্রচলন
‘মিলাদুন্নবী’ শব্দের মধ্যে ‘মিলাদ’ শব্দটি কারো জন্ম বা জন্মকাল বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। এ অর্থে শব্দটির ব্যবহার রয়েছে হাদিস শরিফে, অভিধান গ্রন্থে, ইতিহাস গ্রন্থে, এমনকি অনেক কিতাবের নামেও। এটি নতুন কোন শব্দ নয়। এর কয়েকটি ব্যবহার নিম্নে উলেখ করা হল।
১.অভিধান গ্রন্থ
আল্লামা ইবনু মনযুর তার সুপ্রসিদ্ধ আরবি অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এ লিখেছেন-
ﻣﻴﻼﺩ ﺍﻟﺮﺟﻞ: ﺍﺳﻢ ﺍﻟﻮﻗﺖ ﺍﻟﺬﻱ ﻭﻟﺪ ﻓﻴﻪ
লোকটির মিলাদ- “যে সময়ে সে জন্ম গ্রহণ করেছে সে সময়ের নাম”।
— ইবনু মনযূর, প্রাগুক্ত, খ. ৩য়, পৃ.৪৬৮, আল্লামা ইসমাঈল বিন হাম্মদ জাওহারী, আস-সিহাহ, দারুল ইলম, বৈরুত, ১৪০৪ হিজরী, খ.১ম, পৃ.৩০৬
২.হাদিস গ্রন্থ
ইমাম তিরমিযী আলাইহির রাহমাহ তাঁর ‘আল জামেউস সহীহ’ গ্রন্থের একটি শিরোনাম হল-
ﺑﺎﺏ ﻣﺎ ﺟﺎﺀ ﰲ ﻣﻴﻼﺩ ﺍﻟﻨﱯ
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম সম্পর্কে বর্ণিত বিষয়ের অধ্যায়।
— ইমাম তিরমিযী, আল-জামেইস সহীহ, দারুল গারব আল ইসলামী, বৈরুত,লেবানন, ১৯৯৮ইং, খ. ৫ম, পৃ.৫৮৯।
হযরত উসমান বিন আফ্ফান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বনী ইয়ামর বিন লাইসের ভাই কুরাছ বিন উশাইমকে জিজ্ঞেস করলেন-
ﺃﺍﻧﺖ ﺃﻛﱪ ﺃﻡ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﷲ ﺻﻠﻰ ﺍﷲ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻘﺎﻝ : ﺭﺳﻮﻝ ﺍﷲ ﺃﻛﱪ ﻣﲏ ﻭﺃﻧﺎ ﺍﻗﺪﻡ ﻣﻨﻪ ﰲ ﺍﳌﻴﻼﺩ
‘আপনি বড় নাকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার চেয়ে বড়। আর আমি জন্মের মধ্যে তার চেয়ে অগ্রজ।
নোটঃ
ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত;
ইমাম তাবারী, তারিখুল উমাম ওয়াল মূলুক, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন, ১৪০৭ হি. খ. ১ম, পৃ.৪৫৩,
ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন, ১৪১৯ হিজরী, খ.২য়. পৃ.২১৬,
মিয্যী, তাহযীবুল কামাল, মুয়াস সাসাতুর রিসালা, বৈরুত, লেবানন, ১৪০০হিজরী, খ. ২৩, পৃ.৪৬৭,
আহমাদ বিন আমর শায়বানী, আল-আহাদ ওয়াল মাছানী, দারুর রাইয়া, রিয়াদ, সৌদি আরব, ১৪১১হিজরী, খ. ১ম, পৃ.৪০৭।
৩. ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরতের সময় ‘সাওর’ গুহায় আশ্রয় নেন। এদিকে মক্কার কুরাইশরা তাকে খুঁজতে খুঁজতে ‘সাওর’ গুহা মুখে পৌছলে তাদের একজন বলল-
ﺃﻥ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﻌﻨﻜﺒﻮﺕ ﻗﺒﻞ ﻣﻴﻼﺩ ﺍﻟﻨﱯ ﺻﻠﻰ ﺍﷲ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﺎﻧﺼﺮﻓﻮﺍ
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মের পূর্ব থেকে এ গুহামুখে মাকড়শার জাল রয়েছে। অতঃপর তারা চলে গেল।
নোটঃ
ইবনে সাদ, আত্ তাবকাতুল কুবরা, দারু বৈরুত লিত্-তাবয়া ওয়ান নশর, বৈরুত, লেবানন, ১৩৯৮ হি. খ.১ম,পৃ.২২৮,
ইমাম সুয়ূতী, আল-খাছায়িছুল ক্বুবরা, মাকতাবাতু নূরিয়্যা রিজকিয়্যা, ফয়সালাবাদ, পাকিস্তান, ১৯৯৮ ইং, খ.১ম, পৃ.৩০৫
ইবনু আউন (রহ.) বলেন-
হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ৯১ বছর বয়সে শহীদ হন। তিনি জন্মের ক্ষেত্রে রাসুলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অগ্রজ ছিলেন।
— ইবনে সাদ, প্রাগুক্ত, খ. ৩য়, পৃ. ৩৫৯
হযরত ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন-
ﻭﻛﺎﻥ ﺑﲔ ﻣﻴﻼﺩ ﻋﻴﺴﻰ ﻭﺍﻟﻨﱯ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ ﲬﺲ ﻣﺎﺋﺔ ﺳﻨﺔ ﻭﺗﺴﻊ ﻭﺳﺘﻮﻥ ﺳﻨﺔ
আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের মাঝখানে ৫৬৯ বছর ব্যবধান ছিল।
নোটঃ
ইবনু সাদ, প্রাগুক্ত, খ. ১ম, পৃ.৫৩,
ইমাম তাবারী, প্রাগুক্ত, খ. ১ম, পৃ.৪৯৫,
ইমাম কুরতুবী, আল-জামেঈ লিআহকামিল কুরআন, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবী, বৈরুত, লেবানন, খ.৬ষ্ঠ, পৃ.১২২।
আল্লামা ইবনু হাজর আসক্বালানী আলাইহির রাহমাহ বলেন-
তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জন্মের কিছুকাল পরে জন্ম গ্রহণ করেছেন।
— আল্লামা ইবনু হাজর আসকালানী, ফতহুল বারী, দারু নশরিল কুতুবিল ইসলামিয়্যাহ, লাহর, পাকিস্তান, ১৪০১হি. খ.৬ষ্ট, পৃ.৫৫৭।
উপরিউক্ত উদ্ধৃতি থেকে বুঝা গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জন্ম বুঝানোর জন্য ‘মিলাদুন্নবী’ শব্দটির ব্যবহার সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে অদ্যাবধি রয়েছে; এ যুগের নবসৃষ্ট কোন শব্দ নয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে যে ‘মিলাদুন্নবী’ একটি ইদানিং সময়ের শব্দ, যা আদৌ সঠিক নয়। আবার কেউ কেউ ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ ‘জন্ম’ না নিয়ে অন্যঅর্থ নেয়ার চেষ্টা করে, যা কোন অভিধান প্রণেতা উলেখ করেননি।
গ. ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’র পরিচয়
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতে বুঝায়-এ ধরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনে আনন্দিত হওয়া এবং এ অদ্বিতীয় নিয়ামত পাবার কারণে সৎকাজ ও ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা।