সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সৃতিতে অমলিন ফকরুল ইসলাম স্যার: আয়শা সিদ্দিকা আশা



ফকরুল ইসলাম। এ নামটার সাথে সিলেটের প্রায় প্রতিটি অঙ্গনের মানুষের একাত্ম সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। সকলের প্রিয়ভাজন, শ্রদ্ধাভাজন সদালাপি বিনয়ী এ মানুষটিকে আর কখনও কোন অনুষ্টানে, রাজপথে ক্যামেরা হাতে দেখা যাবেনা।

গত ১৮ নভেম্বর রাত ১০:৩০ মিনিটে তিনি পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। তার এ অকাল প্রয়ানে সিলেট সহ বাংলাদেশ একজন জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্ব হারিয়েছে। ফকরুল ইসলাম একাধারে জৈন্তিয়া ডিগ্রী কলেজের সিনিয়র প্রফেসর ছিলেন।

এ ছাড়াও তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সহ এশিয়ার একজন নামকরা ফটোগ্রাফী ব্যাক্তিত্ব। তিনবারের নির্বাচিত সেরা রত্মগর্ভা মাতা শাহিদা বেগম এবং এম.সি কলেজের ইংরেজির নামকরা শিক্ষক প্রফেসর মোবারক আলীর সন্তান ফকরুল ইসলাম ছিলেন ৮ ভাই ৪ বোনের মধ্যে ৫ম। স্ত্রী শিক্ষিকা ইলোরা আজিজ আর একমাত্র কন্যা জাহরাহ মেহজাবিন রাইসাকে নিয়ে ফকরুল ইসলাম নগরীর রায়নগর এলাকায় বসবাস করতেন।

বড় ভাই ডাঃ বদরুর ইসলাম, ডাঃ হেলাল, ছোট ভাই ডাঃ নজরুল ইসলাম, ডাঃ নজমুল ইসলাম, সহ সিলেট শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা পিপুল, সিলেট সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম, সর্ব কনিষ্ট ভাই রুমেল সহ ফকরুল ইসলামের জন্ম বেড়ে ওঠা এ সিলেটের বুকেই। ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী আর পরিশ্রমী ফকরুল ইসলাম জীবনে অর্জন করেছেন একের পর এক জাতীয় ও আন্তরর্জাতিক পুরুষ্কার। জীবনের প্রায় শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি নিজের সৃষ্টিকে বিলিয়ে দিয়ে গেছেন সবার জন্য। সিলেটের ফটোগ্রাফী অঙ্গনকে মেধাবী কিঙবদন্তী ফকরুল ইসলাম নিয়ে গেছেন এক উচ্চ অবস্থানে।

তার হাত ধরে সিলেট সহ দেশে ও আন্তজাতিক পর্যায়ে অনেক গুনী ফটোগ্রাফার বেরিয়ে এসেছে। এছাড়াও সিলেটর নাট্য অঙ্গনের প্রিয় মুখ ফকরুল ইসলামের অসামান্য অবদান তাকে এনে দিয়েছে জনপ্রিয়তা। প্রায় ২০ বছর ধরে পরিচালিত তার হাতে গড়া প্রতিষ্টান সিলেট ফটো আর্ট ইন্সটিটিউট সিলেট সহ গোটা বাংলাদেশে সুনাম ছড়িয়ে দিয়েছে। তার উল্লেখ্যযোগ্য আন্তজার্তিক পুরুষ্কার গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো NATIONAL GEOGRAPHOY AWARD. (USA). CANON PHOTO AWARD.( JAPAN). HIPA AWARD. DUBAI. PHOTOS TO SAY- AWARD. SLOVAKIA. SMITH SONAIN AWARD. USA সহ আরো অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতীক পুরুষ্কার ও সম্মাননা। এ ছাড়াও সিলেটে তার দুটি একক ফটো এক্সজিবিশন হয়। ফকরুল ইসলামের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে গোটা সিলেটে এক শোকের ছায়া নেমে আসে। দলে দলে তাকে এক নজর দেখার জন্য তার শুভাকাঙ্খিরা ভীড় করতে থাকেন সোনারপাড়ায় অবস্থিত তার নিজ বাসভাবনে।

তার এ অকাল প্রয়ান যে শুন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা হয়তো কখনই আর পুরণ করার মতো নয়। সদা হাস্যজ্জও আর প্রাণ খুলা বিনয়ী ফকরুল ইসলাম সর্ব মহলেই ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। তার আত্মিয় সজ্বন,সহপাঠি, বন্ধু পাড়া প্রতিবেশির কাছে তিনি ছিলেন বিপদের বন্ধু। যে কারো বিপদে তিনি সবার আগে ছুটে গেছেন। মায়ার বন্ধনে জড়িয়েছেন শহর থেকে গ্রামে, আনাচে কানাচে। সময় পেলেই ছুটে যেতেন প্রকৃতির কাছাকাছি। তার তুলা ছবি গুলোর মধ্যে দুঃখ জরা ক্লান্তি ভালোবাসা আর সংগ্রামী জীবনের চিত্র ফুটে উঠে। তার সৃষ্টিতেই তিনি অমর হয়ে থাকবেন যুগ যুগান্তর। ফকরুল ইসলাম স্যারের সান্যিধ্যে যাবার সৌভাগ্য কিছু দিনের জন্য আমার হয়েছিলো। আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু তার সৃতি আর আদর্শ আগামী দিন গুলোতে পাথেও হয়ে থাকবে।
চোখের কোনে এখন তার হাসি মাখা উজ্জল চেহারাবয় মনে করিয়ে দেয়, ঠিক দেড় বছর আ‌গে তার সাথে পরিচয়ের মুহূর্ত্বটি। তখন হঠাৎ করেই খুব ফ‌টোগ্রা‌ফি শেখার আগ্রহ মন জু‌ড়ে বস‌লো। ২০০৯ সা‌ল থে‌কে টুকটাক ছ‌বি তুলার প্র‌তি আগ্রহ জ‌ন্মে। বাবা‌’র ক্যা‌মেরাটা নাড়া চাড়া করতাম বাবা দেখ‌তেন। বাবা ছ‌বি তুলতেন দেখতাম। তখন রি‌লে ছবি তুল‌তেন বাবা। আ‌মিও তুলতাম। সেই থে‌কে ভা‌লো লাগা আর ভা‌লোবাসার জায়গাটুকু ছি‌লো ক্যা‌মেরা আর ফ‌টোগ্রা‌ফি। বাবা চ‌লে গে‌ছেন ৮ টি বছর। অ‌নেক ক‌ষ্টে নি‌জের পা‌য়ে দা‌ড়া‌তে পেরেছি। পড়া‌লেখা যখন শে‌ষের দি‌কে তখন সেই ছে‌লে বেলার শখ‌টি আবার ম‌নে জে‌কে বস‌লো। বাবার আদ‌রের ছোট ভাই ফটোগ্রাফার জি আর সোহেল আং‌কেল কে লন্ড‌নে ফোন দিলাম, কিভা‌বে ফ‌টোগ্রা‌ফি শিখ‌বো, কে শিখান, আং‌কেল আমা‌কে বল‌লেন ফকরুল স্যার এর কথা। নাম্বার দি‌লেন। সে‌দিনই সন্ধ্যায় স্যার‌কে ফোন করা। স্যার ফ‌টোগ্রা‌ফি শিখা‌বেন কথা দি‌লেন। আম্মা‌কে নি‌য়ে পর‌দিন স্যা‌রের সা‌থে দেখা করলাম। স্যার আমা‌কে ব‌লে‌ছি‌লেন, মে‌য়ে‌দের এ পেশায় ঠি‌কে থাকা অ‌নেক ক‌ষ্টের। তু‌মি য‌দি ধৈর্য্য ধ‌রে প‌রিশ্রমের সা‌থে নি‌জে‌কে মা‌নি‌য়ে নি‌তে পা‌রো তাহ‌লেই পার‌বে সময় আর মেধা‌কে কা‌জে লাগা‌তে। স্যার আমা‌কে ফ‌টোগ্রা‌ফি শিখা‌লেন। মে‌য়ে ব‌লে কখনও তার কা‌ছে অব‌হে‌লিত হয়‌নি। বে‌শির ভাগ ক্ষে‌ত্রেই মে‌য়ে‌দের প্র‌তি যে অসহ‌যোগী মান‌ষিকতা মানু‌ষের ম‌ধ্যে প‌রিল‌ক্ষিত হয় সে রকম কিছু স্যা‌রের ম‌ধ্যে কিংবা ফ‌টোআ‌র্টের কোন সদ‌স্যের ছি‌লোনা। আমরা সবাই ছিলাম প‌রিবা‌রের সদস্য‌দের ম‌তো। স্যার ছি‌লেন অ‌ভিবাবক। কখনও কেউ বল‌তে পার‌বেনা যে স্যার কখনও কা‌রো মন খারা‌পের কারণ হ‌য়ে‌ছেন। যে কোনও সমস্যায় স্যার‌কে জানা‌লে সমাধান আস‌তো। স্যার আমার তুলা ছ‌বি গুলোকে নিয়ে সুন্দও কমেন্ট করতেন। আমার একের পর এক ফটোগ্রাফীতে অর্জিত সম্মাননা আরো অনুপ্রেরনা জুগাতো। স্যার সবসময় বলতেন ফটোগ্রাফী চালিয়ে যাবার। সময় বের ক‌রে আউ‌টিং এ সবাই‌কে নি‌য়ে যাওয়ার ক‌তো ইচ্ছাইনা ছি‌লো তার। কিন্তু কেউ কি জান‌তো জীবন তা‌কে আর সময় দে‌বে না। ক‌তো কম সময় নি‌য়ে খোদা তা‌কে পৃ‌থিবী‌তে পা‌ঠি‌য়ে‌ছি‌লেন। তা‌কে শেষ বিদায় দিতে যখন হাজারো মানুষ ছুটে আসলেন, তখন তি‌নি কা‌রো সা‌থে কথা না ব‌লে শু‌য়ে থাক‌লেন। ভা‌লো মানুষরা এভা‌বেই নিঃশ‌ব্দে চ‌লে যায়। খোদা জান্না‌তের উচ্চ আস‌‌নে তার স্থান যে‌নো হয়। আ‌মিন।