সোমবার, ২২ জানুয়ারী ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
এই মুহুর্তের খবর
নিসচা মহানগরের সভাপতি ইকবাল’র জন্মদিন পালন  » «   ফলিক খানের অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রীর মিটানো নাম নতুন করে অঙ্কন  » «   গোলাপগঞ্জে যুবদলের ৩৯তম প্রতিষ্টা বার্ষিকী পালন  » «   বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ারের মৃত্যুতে সিলেট সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের শোক  » «   জগন্নাথপুরে টাকা দেয়া হলেও চাল দেয়া হয়নি  » «   জগন্নাথপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ব্যবসায়ী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে  » «   ২৬ নং ওয়ার্ড তালামীযের অভিষেক ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন  » «   সোশ্যাল মিডিয়ায় দুই নায়িকার মেকআপ রুমের ছবি ফাঁস!  » «   কমলগঞ্জে জাতীয় কন্যা শিশু দিবস পালিত  » «   জগন্নাথপুরে নুর আলীর খুনিদের ফাসির দাবিতে সোচ্চার এলাকাবাসী  » «  

একাত্তরের অকুতোভয় এক বীরযোদ্ধার নাম ‘কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী’



আছমা জান্নাত মনি :: কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী ১৯৫১, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তিনি অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদক লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি হবিগঞ্জ মহকুমার গভর্নর হন। এছাড়া বাংলাদেশ চা বোর্ড ও হবিগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করেন। কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জম্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল বশীর চৌধুরী ও মাতা সৈয়দা ফয়জুন্নেসা খাতুন। দেশের অন্যতম এ সাহসী পুরুষ ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কারাবরণ করেন। ১৯৬৬’র ৬ দফা আন্দোলনেও ছিলেন সক্রিয়। সে জন্য কারাবরণ করেন দীর্ঘদিন। ১৯৬৯’র স্বৈরাচার আইয়ুব বিরোধী গণঅভূথানে হবিগঞ্জে নেতৃত্ব দেন। এ জন্যও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৭০-র নির্বাচনে আওয়ামীলীগ হতে বাহুবল, চুনারুঘাট ও শ্রীমংগল নিয়ে গঠিত সংসদীয় এলাকা হতে বিপুল ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। জননেতা মানিক চৌধুরীকে হবিগঞ্জ তথা দেশবাসী যে কারণে মনে রাখবে তা হলো ১৯৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকা। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের টেলিগ্রাম পেয়েই গঠন করেন হবিগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদ। গ্রহণ করেন বৃহত্তর সিলেটের গণমুক্তি বাহিনীর অধিনায়কত্ব। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি হবিগঞ্জের তৎকালীন মহুকুমা প্রশাসক ড. আকবর আলী খানকে (তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা) অস্ত্র ধরেন এবং তাঁর সহযোগিতায় হবিগঞ্জ অস্ত্রাগার লুট করে সেখান থেকে ৭শ ৫০টি রাইফেল নিয়ে তা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। তিনি হবিগঞ্জ মহকুমা কারাগারের তালা জোরপূর্বক খুলে দিয়ে কারাবন্দিদের ছেড়ে দেন। তিনি হবিগঞ্জ ট্রেজারী ও রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকে হামলা করে সেখান থেকে সব অর্থ লুট করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাত্যহিক ব্যয় নির্বাহে ব্যয় করেন এবং বাকী টাকা দিয়ে ভারত হতে অস্ত্র ক্রয় করেন। তিনিই প্রথম ভারতের আগরতলায় ভারতীয় সরকারের সাথে অস্ত্র ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষর করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করেন। সহ সর্বাধিনায়ক কর্ণেল এম. এ. রব, সেক্টর কমান্ডার মেজর সি. আর. দত্ত তাঁকে সিভিলিয়ন সেক্টরে প্রথম কমান্ডেন্ট উপাধীতে ভূষিত করেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনে তিনি মাধবপুর হতে আওয়ামীলীগ প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি মাধবপুর উপজেলা জুড়ে বর্তমানে যে স্বল্প গভীর নলকুপ ব্যবহৃত হয় (গাই প্রকল্প) তার প্রচলন ঘটান। যার উপর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুছ গবেষণা করেন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে এজন্য কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী রাষ্ট্রপতি পদক পান। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি হবিগঞ্জ মহকুমা গভর্ণর হন। তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ড ও হবিগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি কৃষকলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি ও আওয়ামীলীগ হবিগঞ্জ মহকুমা কমিটিরও সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম উপজেলা নির্বাচনে বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে নবীগঞ্জ-বাহুবল আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হন। শেষ জীবনে তিনি ধর্মকর্মের উপর বেশী অনুরক্ত হয়ে পড়েন। তিনি হবিগঞ্জ জিরো পয়েন্ট আব্দুল হাফিজ আফাই মিয়ার অর্থায়নে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ দুর্জয় এর অন্যতম উদ্যোক্তা। এ মহান পুরুষ ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি হবিগঞ্জ শহরের পুরাতন হাসপাতাল রোডস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন এবং শায়েস্তানগর কবরস্থানে চির শায়িত আছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ও জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্য হবিগঞ্জের কৃতিসন্তান কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী এবং প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ দেশের ৭ কৃতি ব্যক্তি বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ তুলে দেয়া হয়েছে। গত ২৫শে মার্চ ২০১৫ইং, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ পদক প্রদান করা হয়। পদক তুলে দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তদের পরিচিতি পাঠ করেন মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর পরিচিতি তুলে ধরা হলো-
কমাণ্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত এ কে লতিফুর রহমান চৌধুরী ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্থানীয় বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মানিক চৌধুরী ১৯৫২ সালে স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় হবিগঞ্জ মহকুমায় ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণি ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনসহ সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর বলিষ্ট ভূমিকা ছিল। ভাষা আন্দোলনসহ ৬৯-এর গণঅভ্যুথানে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি কারাভোগ করেন। তিনি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসাবে চুনারুঘাট-বাহুবল-শ্রীমঙ্গল আসন থেকে তদানীন্তন জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
বাঙ্গালীর মহেন্দ্রক্ষন ১৯৭০ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ওয়ারলেসে প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানিক চৌধুরী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি শব্দ প্রতিটি বাক্যকে বাস্তবায়নের জন্য মানিক চৌধুরী হবিগঞ্জে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এ সময় তার নির্বাচনী এলাকার চা-শ্রমিকদের নিয়ে তিনি গঠন করেন বিশাল ‘তীরন্দাজ বাহিনী’। এ লক্ষ্যে হবিগঞ্জ সরকারি অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র-গোলা বারুদ সংগ্রহ করে সিলেটের প্রথম ও দীর্ঘস্থায়ী শেরপুর-সাদিপুর যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের চার নম্বর সেক্টরে অসামান্য সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, খাদ্য সংগ্রহ এবং ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে মানিক চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার বহুমূখী সাহসী ভূমিকার জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন চীফ-অব-স্টাফ মেজর জেনারেল এম এ রব, বীর উত্তম তাকে ‘কমাণ্ড্যান্ট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
স্বাধীনতার পর কমাণ্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি আওয়ামীলীগের মনোনয়নে ১৯৭৩ সালে হবিগঞ্জের মাধবপুর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর আমলে তিনি বাংলাদেশ চা-বোর্ড এবং বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ও বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। মাধবপুরে কৃষিক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তাকে ১৯৭৪ সালে ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক’ প্রদান করা হয়। তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক হবিগঞ্জের গভর্ণর নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স-পরিবার হত্যার প্রতিবাদে তিনি রাজপথে মিছিল বের করেন। এ কারণে তাকে গ্রেফতার করে চার বছর কারারুদ্ধ রাখা হয়। ব্যক্তি জীবনে কমাণ্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী ছিলেন নির্লোভ ও প্রচারবিমুখ। সাহিত্যচর্চায় তার ছিল গভীর আগ্রহ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘গ্রাম বাংলার রাজনীতি’ এবং স্বাধীন বাংলার শাসনতান্ত্রিক কাঠামো’। এ মহান মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক ১৯৯১ সালের ১০ জানুয়ারি ইন্তেকাল করেন।

কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী কন্যা এডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বর্তমান জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য।

তিনি ও তার পিতার মত করে মাটি ও মানুষের সাথে মিশে গেছেন একীভাবে । সাধারণ মানুষের কাছে আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী’র জনপ্রিয়তা অতুলনীয়। সাধারণ মানুষ মনে করছেন আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী মনোনয়ন ছাড়াই তিনি মন্ত্রী হবার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছেন।