মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

মাছ চাষেই স্বাবলম্বী মঙ্গলকাটার অনেক পরিবার



fishআল আমীন সুনামগঞ্জ থেকে: মাছ চাষের মাধ্যমেই স্বাবলম্বী হয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার অনেক পরিবার। শহরের নিকটবর্তী জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে মঙ্গলকাটা নামে একটি গ্রামে রয়েছে যেকানে দুইশতদিক পুকুর রয়েছে। সবগুলো পুকুরেই মাছের চাষ হয়।

এইসব পুকুরে পাঙাস, তেলাপিয়া, কার্প জাতীয়, রুই. সরপুটি, মৃগেল, কৈসহ নানা জাতির দেশীয় মাছেরও চাষ করা হয়। মঙ্গলকাটার মাছ সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইকারি বিক্রি করা হয়।

জেলার কৃৃষি উৎপাদনে অগ্রগণ্য গ্রাম মঙ্গলকাটা। গ্রামের পাশে রয়েছে ধান্য জমি, সবজি খেত। সুরমা নদীর উত্তরপাড়ে হালুয়ারঘাট থেকে মঙ্গলকাটা হয়ে ডলুরা শহীদ মিনার যেতে সড়কের দু’দিকে তাকালেই দেখা যায়, পুকুর আর পুকুর। ছোট ছোট পুকুর নয়, ৩ কেয়ার, ৪ কেয়ার, ৫ কেয়ার, ৮ কেয়ার আয়তনের পুকুর রয়েছে। বিশাল আকারের আছে আরও কয়েকটি পুকুর।

এখানে একটি ২২ কেয়ারের পুকুরও আছে। সবগুলো পুকুরই পরিচ্ছন্ন। পুকুরের চার পাশে রয়েছে মনোরম পরিবেশ ও প্রতিবেশ। নিরব নিস্তদ্ধ নির্মল বাতাস। স্বচ্ছ পুকুরের পানি। পুকুর পাড়ে সারি সারি বৃরাজি। যেন গ্রকৃতি সবুজে সবুজে ভরে উঠেছে এইসব পুকুরপাড়ে। গ্রামের কোনো স্থান নেই পতিত পড়ে আছে। পানিতে মাছ আছে আর জমিতে চাষ আছে।
সরজমিনে মঙ্গলকাটায় গিয়ে দেখা যায়, মাছ ও চাষ দেখি। এ সময় জাহাঙ্গীরনগর ইউপি সদস্য আব্দুল মোতালিব, সাবেক মেম্বার সিদ্দিক আলী, মাছ চাষী আব্দুল কাদির, মো. কবির হোসেন, শুকুর আলী, আব্দুস ছত্তার, রহিমা খাতুন, ইসমাইল হোসেন, মো. জাকারিয়া, মো. রফিক মিয়া, মো. শফিকুল ইসলামসহ আরও অনেকেই সঙ্গে ছিলেন। চলার পথে আরও ২০-২৫ জন মাছ চাষীর সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
এই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ। তিনি এই গ্রামে সর্বপ্রথম পুকুরের মাছের চাষ শুরু করেন। অন্যের পুকুরে মাছ চাষ দেখে তিনি অনপ্রাণিত হন। পরে তিনি মনে মনে তৈরি হন নিজেই পুকুরে মাছের চাষ করতে। মাছ চাষের উপর তিনি প্রশিণও নেন। প্রায় ২৬ বছর আগে থেকে পুকুরে মাছের চাষ শুরু করেন আব্দুল হামিদ। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে প্রশিণ দিয়েই ব্রাহ্মনবাড়িয়া থেকে প্রতিটি পোনা ৫ টাকা হিসাবে ৩ হাজার মাছের পোনা এনে ছাড়েন তাঁর নিজস্ব পুকুরে। এখন তিনি ৩টি বড় পুকুরে মাছের চাষ করছেন।
পুকুরের পাড়ে লাগিয়েছেন ফলের ও সবজির গাছ। আম, কাঠাঁল, পেয়ারা পেঁপে, লেচু, লেবু, সুপারী ও লাউয়ের গাছ। ফলমুল ছাড়াও প্রতি বছর ৬ লাখ থেকে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত মাছ বিক্রি করেন তিনি। প্রায় ৫ কেয়ার আয়তনের এইসব পুকুরে রয়েছে তেলাপিয়া, পাঙ্গাস মাছসহ অন্যান্য প্রজাতির মাছ। এবারও আব্দুল হামিদ তিন পুকুরে ৪০ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছেন। গত বছর বন্যায় প্রায় ৮০ হাজার টাকার মাছ ভেসে যায়। এবার পুকুরেরপাড় উঁচু করায় কোনো তি হয়নি বলে জানান তিনি।
গ্রামের বিভিন্ন পুকুরে মাছ চাষ দেখে উৎসাহিত হন আব্দুল হামিদ ও হেলাল উদ্দিন। এক সময় তিনি পুকুরে মাছ চাষের প্রশিণে দেন। প্রশিণ দিয়ে শিখে নেন মাছ চাষের সকল কলাকৌশল। দুইজনের অভিজ্ঞতা বিনিময় করে ৪ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাছের পোনা ক্রয় করে পুকুরে মাছের চাষ শুরু করেন তাঁরা। প্রথমে ১টি ভাড়া করা পুকুরে মাছের পোনা ছাড়েন। প্রথম বছর মাছ চাষে অনেকটা লাভের মুখ দেখে আরও বড় চিন্তায় এগিয়ে যান রহিমা। একে একে ৬টি পুকুর ভাড়া নেন। মাছের চাষে মনোযোগী হন দু’জনই। ১০ বছর যাবত পুকুরে মাছের চাষ করে তিনি স্বাবলম্বী হন।
স্থানীয় মাছ চাষী রহিমা খাতুন জানান, ‘এবারের বন্যায় অনেক তি হয়েছে। আমাদের ৬টি পুকুরের প্রায় ৪ লাখ টাকার মাছ তলিয়ে গেছে। এই লোকসান তোলতে গিয়ে দিবারাত্রি শ্রম দিচ্ছি। সেই সাথে পরিবারের ৮ জনের খরচ যোগাচ্ছি। ২ মেয়ে ৮ম শ্রেণীতে, ১ মেয়ে ৫ম শ্রেণীতে, আরও এক মেয়ে ২য় শ্রেণীতে এবং ছোট ছেলে শিশু শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। এখন আর সংসারের খরচ নিয়ে ভাবতে হয় না। সবই হাতের নাগালে। ঘরে বসে কুটির শিল্পের কাজও করছি।’
মাছ চাষী শফিকুল ইসলাম বলেন, ৫ বছর আগে তিনি ৩ শত টাকা দিয়ে পুকুরে মাছের পোনা ছাড়েন। লাভ করেন ৩ হাজার টাকা। ভাল মুনাফা থাকায় এখন তিনি কৃষি কাজের পাশাপাশি মাছের চাষে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তাঁর ৫ কেয়ারের ১টি, ৩ কেয়ারের ১টি ও ২ কেয়ারের ১টি পুকুরসহ ৩টি পুকুর রয়েছে। গত বছর ৩টি পুকুরে ২ লাখ টাকার মাছের পোনা ছেড়ে ৩ লাখ টাকা লাভ করেন তিনি।
এই গ্রামে রয়েছে হেলাল উদ্দিনের ৮টি পুকুর, শুকুর আলীর ২টি, আব্দুস ছত্তারের ২টি, কবির হোসেনের ৩টি, রহিমা খাতুনের ৬টি, আনোয়ার হোসেনের ৪টি, রহমান ক্বারীর ২টি, দুদু মিয়ার ১টি, তালেব মিয়ার ১টি, রফিকুল ইসলামের ২টি, জামাল মিয়ার ১টি, বিলাল মিয়ার ১টি, ফয়েজ উদ্দিনের ১টি, তাজ উদ্দিনের ২টি, আব্দুল মালেকের ১টি, শহীদ মিয়ার ২টি, রফিক মিয়ার ২টি, নয়ন মিয়ার ১টি, জাকির হোসেনের ২টি, ফয়েজ উল্লাহর ১টি, জমির মিয়ার ১টি, তাজ মিয়ার ১টি, রমজান মিয়ার ২টি, আফাজ উদ্দিনের ২টি, সাহাজ উদ্দিনের ১টি, জহুর উদ্দিনের ১টি, দিলোয়ার হোসেনের ১টি, নুরুল হকের ১টি, আব্দুল লতিফের ২টি, আব্দুল হামিদের ৩টি, মঈন উদ্দিনের ২টি, আমির আলীর ২টি, আব্দুল মন্নাফের ১টি, আবুল কাশেমের ১টি, খুর্শেদা বেগমের ১টি। ২২ কেয়ারের পুকুরের মালিক আব্দুস শহীদ। হাবিব মিয়ার ৩টি, মানিক মিয়ার ১টি, তমিজ উদ্দিনের ১টি, জাকির হোসেনের ১টি, শওকত আলীর ১টি, পসর আলীর ১টি, শাহজাহান মিয়ার ১টি, কবির মিয়ার ১টি, লিটন মিয়ার ১টি, মোস্তফা মিয়ার ১টি, আবু হানিফার ১টি, আব্দুস ছত্তারের ১টি, আঙ্গুর মিয়ার ১টি, জাকারিয়ার ১টি, দুলাল মিয়ার ২টি, বাদশা মিয়ার ১টি, ইসরাইল মিয়ার ১টি, গিয়াস উদ্দিনের ১টি, নুর মিয়ার ১টি, আব্দুল জলিলের ১টি, তাহের আলীর ১টি, আব্দুল মনাফের ১টি, আল আমিনের ১টি, নুরুল মিয়ার ১টি, আসিক মিয়ার ২টি, ইসমাইল মিয়ার ১টি, দেলোয়ার মিয়ার ১টি পুকুর, আব্দুল হেকিমের ১টি, শুকুর আলীর ১টি সহ প্রায় দুইশতাধিক পুকুর রয়েছে এই এলাকায়। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেই চাষীরা পুকুরে মাছের চাষ হচ্ছে।
এদিকে, ইসলামপুরে রয়েছে লিটন মিয়ার ২টি পুকুর, ইকবাল হোসেনের ৩টি, শফিক আহমদের ৪টি, হাসান আলীর ১টি, বিলাল হোসেনের ২টি, মাহেজ মিয়ার ২টি, ইসমাইল মিয়ার ১টি, নুরুল ইসলামের ২টি, অয়নের ১টি, আব্দুল কাইয়ুমের ৫টি, শামীম আহমদের ২টি, শুকুর আলীর ১টি, আব্দুল মোতালিবের ১টি, বাতেন মিয়ার ১টি, রমজান মিয়ার ১টি, ফজুল মিয়ার ১টি, সাধু মিয়ার ১টি, মোমেন মিয়ার ১টি, ইসমাইল মিয়ার ১টি, ইমান হোসেনের ১টি, রহমান মিয়ার ১টি, আলী মোস্তফার ১টি, ইসরাইল মিয়ার ১টি, গিয়াস উদ্দিনের ১টি সহ প্রায় ৭০টি পুকুরে মাছের চাষ হচ্ছে।
এসব পুকুরের একাধিক মাছ চাষী জানান, ‘সরকারীভাবে ঋণের ব্যবস্থা করলে তাঁরা এই ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারিত করতে পারবেন বলে আশাবাদী। এরই জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার (সদ্য অবসরপ্রাপ্ত) মৎস্য কর্মকর্তা আবুল এরফান বলেন, ‘শহরের নিকটবর্তী জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে মঙ্গলকাটা নামে একটি এলাকায় দুইশতাধিক পুকুরের খবর পেয়ে আমি কয়েক বছর আগে মঙ্গলকাটা গ্রামে গিয়েছিলাম। এই এলাকাসহ ইসলামপুরে গ্রামের ৩শত পুকুরও রয়েছে। পরে পুকুরে মাছ চাষীদের প্রশিণ দিয়েছি। প্রায় সময় মঙ্গলকাটা গিয়ে তাঁদের মাছ চাষ দেখেছি, তাঁরা পুকুরে মাছের চাষে খুবই আন্তরিক। তাঁদেরকে ঋণ সহায়তা দেয়া হলে ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে এবং অল্প সময়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হতে পারবেন।